ওস্তাগার লেনকে আর রাস্তা বলা যায় না। বাঁ-দিকে বিশাল একখানা খুঁড়ে রেখেছে। সমস্ত মাটি ডান দিকে তুলে পাহাড়। বাঁ দিকের বাড়ির সামনে সামনে একফালি কাঠ পাতা। সেই কাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে এসে পাহাড়ে উঠে স্লিপ খেতে খেতে বড় রাস্তায় আসতে হবে। আর ডান দিকের বাড়ি থেকে যারা বেরোবে তারা ওই মাটির পাহাড় বাড়ির দেয়াল আর প্রাচীন নর্দমার। মাঝখানে, মহাপ্রস্থানের পথের মতো একফালি সঁড়িপথ পাবে। সেই পথের জায়গায় জায়গায় আবার বাঙালির বড় আদরের আস্তাকুড়। সেই আঁস্তাকুড়ের একটার ওপর কে আবার নির্লজ্জের মতো একটি ব্যবহার করা স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে গেছে।
রাস্তার মুখে টিবিটার মাথায় উঠে আমি সব দেখছি। ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। মেয়েমদ্দা সব মজা দেখছে। পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড সব থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাচ্ছি, অনেক দূরে গর্তের মধ্যে, সাদা মতো কী একটা প্রাণীনড়াচড়া করছে। আমার সামনে দুজন দাঁড়িয়েছিল সভাসমিতিতে যাদের আমরা খুব খাতির করে বলি, বন্ধুগণ। একজন আর। একজনকে দেখাচ্ছে, ওই দ্যাখ মন্ত্রী বটেক। আমার ভীষণ রাগ হল। গত চল্লিশ বছরে মন্ত্রীদের মানসম্মান কোথায় নেমে এসেছে।
আমার পাশে কমিশনার, ওপাশে ফায়ার সার্ভিসের ডিরেক্টার। ডিরেক্টারকে বললুম, দাঁড়িয়ে না থেকে দড়ি ফেলে পাতকো থেকে বালতি তোলার মতো করে ওই ব্যারেলটাকে তুলুন। আমার রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। আমাকে একেবারে বেইজ্জত করে ছেড়ে দিলে। কাতারে কাতারে লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখছে। ঝুল-বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে। আমি দেখছি এই পূর্তমন্ত্রীরা হল। সবচেয়ে গোলমেলে জীব। অনেক আগে এক মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর চিতাভস্ম ভরা হাঁড়ি মাথায় নিয়ে নেচেছিলেন। সাংবাদিকদের বেশ্যা বলেছিলেন। সে এক সাঙ্ঘাতিক এমব্যারাসমেন্ট।
ডিরেক্টার বললেন, পাবলিককে তো ডিল করেননি। তুলতে না দিলে তোলা যাবে না।
কমিশনারকে বললুম, ফোর্স দিয়ে সব হঠান। না সেটাও পারবেন না?
ভদ্রলোক এই সঙ্কটেও এক মুখ হেসে বললেন, না স্যার, পারা যাবে না। ওই গর্তে যিনি পড়ে আছেন তাঁর স্বার্থেই পারা যাবে না। ওই মাটির ডাঁই ভেঙে, ধসে ভেতরে পড়ে গেলে জীবন্ত সমাধি। আপনাদের মশাই আচ্ছা ব্ল্যাকমেল করেছে। এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা। পেছলেও নিবংশের ব্যাটা।
ওসব প্রবাদ ছাড়ুন। কী করা যায় ভাবুন।
আপনি নেতা। আপনি মুখ্যমন্ত্রী। আপনার ভাবমূর্তি দিয়ে জনতাকে শান্ত করুন। একটা মধ্যস্থতায় আসুন।
এই গর্ত কে খুঁড়েছে? কেন খুঁড়েছে? কার হুকুমে খুঁড়েছে?
হাঃ হাঃ, সেই ছেলেবেলায় পড়া একটা বইয়ের কথা মনে পড়ছে কে কী কেন কবে কোথায়। কলকাতার গর্ত-পলিটিক্স আপনি জানেন না!
ঠিক আছে, ডাকুন গর্তে মন্ত্রী ফেলার পাণ্ডাদের। বলুন আমি মুখ্যমন্ত্রী।
প্রবীণ, নবীনে একটি দল এগিয়ে এল। তার মধ্যে বেশ তালেবর একটি ছোকরা বললে, নমস্কার স্যার।
তোমরা এমন একটা কাজ করলে কেন? আমরা তোমাদেরই রায়ে সবে এসে ক্ষমতায় বসেছি। তোমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন আমাদের হাতে। তোমরা আমাদের একজন মন্ত্রীকে দুম করে গর্তে ফেলে দিলে!
মা কালী, অন গড আমরা ফেলিনি। নিজেই পড়ে গেলেন। আমরা এটা অন্যায় করেছি, ভদ্রলোককে তুলিনি। যেই বললেন, আমি পূর্তমন্ত্রী, সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললুম, থাক শালা পড়ে।
ছেলেটি জিভ কেটে বলে, সরি স্যার।
পড়ে থাকবে কেন?
আপনি বলুন, ছমাস হয়ে গেল, রাস্তাটা এইভাবে পড়ে আছে। এর মধ্যে পাড়ায় সাত-সাতটা বিয়ে হয়েছে। কোনও গাড়ি ঢুকতে পারে না। মানুষ হাঁটতে পারে না। বরকে চ্যাংদোলা করে আনতে হয়। বরবউ গাঁটছড়া বাঁধা অবস্থায় পাশাপাশি হাঁটতে পারে না। সেদিন একটা বাচ্চা মেয়ে উলটে পড়ে হাসপাতালে গেছে। ডাক্তারবাবুরা আসতে পারে না। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছমাস গৃহবন্দি। আপনিই বলুন, আর আমরা কত সহ্য করব! আমরা আমাদের কাউন্সিলারকে বললুম। বললেন, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে গিয়ে বলো, যিনি কলকাতার পাতাল প্রবেশের ব্যবস্থা করে গেছেন। আপনিই বলুন, কোথায় পাতাল রেল আর কোথায় আমাদের ওস্তাগার লেন। যা-তা। বললে ভালো লাগে!
এখন তাহলে ভদ্রলোককে তোলা যাক।
না স্যার, ফাঁদে বাঘ যখন একবার পড়েছে সহজে আমরা ছাড়ব না। আজ একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক।
জনতা চিৎকার ছাড়ল, হ্যাঁ হ্যাঁ, হেস্তনেস্ত। মামার বাড়ি! আলো নেই, জল নেই, রাস্তা নেই, চাকরি নেই, থাকার মধ্যে আছে নির্বাচন আর অপদার্থ মন্ত্রী। যেটা পড়েছে সেটার সাইজ দেখেছিস মাইরি!
বেসুরো বলছে, বেসুরো।
আপনারা আমাদের কেন তিরস্কার করছেন ভাই? এ তো আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কাজ।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনাদের ওই ছলনায় আর ভুলছি না। যেই আসে সেই পেছনটা দেখায়। আমরা আর। পেছন দেখতে রাজি নই। আমরা সামনেটা দেখতে চাই। বাস, মিনিবাস, লরি, ঠ্যালা, রিকশা, গাজ্ঞা রাস্তায় হাঁটে কার বাপের সাধ্যি! এ ওকে ওভারটেক করছে, ও একে ওভারটেক। মোড়ে মোড়ে পুলিশ বাঁকা-শ্যাম। আর আমরা চাকার তলায় পড়ে মরছি। কেন মশাই! কেন কলকাতার ফুটপাথ দানখয়রাত করে দিয়েছেন? কেন শহরের রাস্তায় সবসময় লরি চলার পারমিশান। দিয়েছেন। কেন কেন কেন?
