মানে? সে আবার কী?
কিছু মনে করবেন না স্যার! আপনার জেনারেল নলেজ থোড়া কম আছে। আমি সব বিদেশি ম্যাগাজিন-উগ্যাজিন পড়ি। জাপানে এক ধরনের ব্যাকটিরিয়া আবিষ্কার হয়েছে, যারা পেট্রোলিয়াম জেলি খায়। পেট্রোলিয়াম জেলিতে খুব প্রোটিন থাকে। সেই প্রোটিন খেয়ে ব্যাকটিরিয়াগুলোও সব মোটামোটা প্রোটিনের দানা হয়ে যায়। প্রথমে জাপান ভেবেছিল ওই প্রেট্রো-প্রোটিন মানুষকে খাওয়াবে। কিন্তু ভীষণ গন্ধ। তখন করলে কি সীলমাছকে খাওয়াতে লাগল। সেই প্রোটিন খেয়ে সীলগুলো সব হয়ে গেল হাতির মতো। এইবার সেই হাতিসীল খেয়ে জাপানি ছেলেমেয়েরা ফুটবল। জানেন তো, নেসাসিটি ইজ দি মাদার অফ ইনভেনশান। আবার, হোয়্যার দেয়ার ইজ এ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে। উইপোকা কাঠ খায়। পঙ্গপাল ফসল খায়। পিপীলিকাভুক পিপীলিকা খায়, ব্যাঙ মশা খায়, সাপে ব্যাঙ খায়, বেজিতে সাপ খায়…
বাঘ, বাঘ, বাঘে মানুষ খায়। বাঘকে কে খায়!
আপনি রেগে যাবেন না। বায়োলজি দিয়ে আজকাল কেলেঙ্কারি করে ছেড়ে দিচ্ছে। আমি বায়োজেনেসিস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করব। তারপর বায়োমের সন্ধান করব। এমন কোনও প্রাণী অবশ্যই আছে যারা হাঁউহাঁউ করে আবর্জনা খায়। শকুন হল পাখি। আমি চাই চতুষ্পদ আর ফাস্ট ইটার। নিমেষে মনুমেন্টের তলার ভাগাড় খেয়ে ফেলবে। দু-ঘণ্টায় কলেজ স্ট্রিট, মেছোবাজার সাফ। বায়োডিগ্রেডেবল খুঁজব। বায়োডেস্ট্রাকটিবল। আমার মাথায় নানা পরিকল্পনা একেবারে সুতলির মতো জট পাকিয়ে আসে। পাঁকের মতো ভ্যাড়-ভ্যাড় করছে। ইয়োরোপের মাটিতে প্লেন যেই টাচডাউন করবে, ছুটে বেরিয়ে যাব। ধর-ধর করে ছুটব। পরিকল্পনা ধরো। বিজ্ঞানী ধরো। আর সেই সঙ্গে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা। পশ্চিমবাংলার ইমেজ তৈরি করব।
দুটো জিনিস ভুল করলেন।
এখন ভুলে গেলেও, ওখানে গিয়ে মনে পড়ে যাবে। জলবায়ুর একটা গুণ আছে তো! এই ভ্যাপসা ভাদ্দরের গরম তো সেখানে নেই।
দুটো জিনিস, এখান থেকেই মনে রেখে যেতে হবে। এক, আপনি সে দেশের ভাষা জানেন না…।
আমি দোভাষী নেব।
দুই, আপনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নন, রাজ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবাংলার বিদেশে কোনও ইমেজ হয় না। ইমেজ হল ভারতের।
ইমেজ তো কারুর মনোপলি হতে পারে না। আমি পশ্চিমবাংলার ইমেজই বাড়িয়ে আসব। কবিতা দিয়ে শুরু করব, ইচ অ্যান্ড এভরি বক্তৃতা, বাম হাতে যার কমলার ফুল, ডাহিনে মধুকমালা, ভালে কাঞ্চন শৃঙ্গমুকুট, কিরণে ভুবন আলা।
আমার মনে হচ্ছে আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে। ডান হাতে যার…।
আপনি আমার ফাইলটা, বিদেশ যাবার ফাইলটা সই করে ছেড়ে দিন, হাত-পা আমি সব ঠিক। করে নেব। কতকাল আগের পড়া। সাঙ্ঘাতিক মেমারি বলে এখনও মনে আছে।
আমার গাড়ির পেছনে ঘণ্টা বাজিয়ে দমকল আসছে। আমার গাড়ি চলেছে রাস্তার মাঝখান দিয়ে। সামনে পুলিশ পাইলটের ওয়া ওয়া। ফায়ার বিগ্রেড আসছে ঝড়ের বেগে। চেষ্টা করছে আমাদের ওভারটেক করতে। সাধারণ মানুষের গাড়ি হলে রাস্তার একেবারে বাঁ-ধারে সরে যেতে হত। ফায়ার ব্রিগেড আর অ্যাম্বুলেন্স সবার আগে যাবে। সেইটাই নিয়ম। আমার ড্রাইভারকে বললুম; বাঁ-দিকে পাশ করে, ফায়ার ব্রিগেডকে যেতে দাও।
আপনার কথায় হবে না স্যার। পাইলট আমাকে যেভাবে চালাবে আমি সেইভাবে চলব।
আরে মূখ ওটা দমকল। দমকল সবার আগে যায়।
আমি মূখ হতে পারি স্যার; কিন্তু আপনি হলেন মূখমন্ত্রী।
মূর্খ বললে না মুখ্যই বললে কে জানে! বেশি ঘাঁটাবার সাহস হল না। মুখ্য বলে দমকলের প্রবল ঘণ্টাখানির বিরাম নেই। আসলে দমকলের ঘণ্টা যে বাজায় তার পুরোহিতের মতো অভ্যাস। অক্লেশে, না থেমে নেড়ে যায়। বেশ বুঝতে পারছি, ভীষণ একটা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে—দমকল আগে যাবে, না মুখ্যমন্ত্রী? এখন গাড়ি থামিয়ে ম্যানুয়াল দেখতে পারলে ভালো হয়। সামনে দেখতে পাচ্ছি আমার পুলিশ পাইলট মনের আনন্দে ভরর ভরর চলেছে। তারও ওঁয়া ওঁয়া অভ্যাস। এই হয়তো করে আসছে গত দশ বছর। আমি অসহায়। গাড়িও আমার নয়, ড্রাইভারও আমার নয়। তবু বললুম, বাঁ-দিক করো।
ড্রাইভার বললে, আপনার কথা শুনে এই বাজারে চাকরিটা খোয়াতে চাই না স্যার।
এইরকম পরিস্থিতিতে যে যত দরেরই মানুষ হোক, তার বলা উচিত, লে হালুয়া।
যাক, আমরা ওস্তাগার লেনে এসে গেলুম। বেশ বুঝতে পারছি, এরই মধ্যে আমার ভেতর বেশ একটা অহঙ্কারের ভাব এসে গেছে। গাড়ি থেকে নামতেই ইচ্ছে করছে না। যতই হোক আমি একটা মুখ্যমন্ত্রী। এইসব ছোটখাটো ব্যাপারে আমার কি আসা উচিত।
ব্যাপারটা যত ছোট ভেবেছিলুম তত ছোট নয়। মাইক লাগিয়েছে। কান ফাটানো সুরে গান বাজছে, দিল তোড়োনা।
একটা বাচ্চার কী আনন্দ। সে বলছে, একটা মোটামতো লোককে, গাড়ায় ফেলে মুস্তাফিরা খুব রগড়াচ্ছে। লোকটা না আপন মনে বসে বসে চুরুট খাচ্ছে। একটা ল্যাবা মতো লোক। একালের ছেলে। তার হাবভাব, কথাবার্তাই অন্যরকম। কোথা থেকে একটা ফেরিওলা এসে গেছে। তার। লাঠির মাথায় বাঁধা লাল-হলুদ ফিতে। ঝুলছে সেফটিপিনের পাতা, কাপড় শুকোতে দেবার ক্লিপ। হজমিওলা এসে গেছে। মাঝে মাঝে চেল্লাচ্ছে, হজমাহজম। ওদিকে গান পালটে গেছে, হালুয়াবালা আ গয়া—আমাকে বলছে নাকি! মনে হচ্ছে উৎসব। রামনবমী কি তালনবমী। যা হয় একটা কিছু।
