ধারাবাহিক উপন্যাস চাই।
রাইট। তার মানে সব কিছুই ক্রমশ করে রাখা। আগামী সংখ্যায় দেখুন। কোনও কিছু শেষ করবেন না। শেষ বলে দেবেন না। বানিয়ে বানিয়ে চলুন। মোক্ষম এক একটা ইস্যু ধরে তালগোল পাকিয়ে রাখুন। যেমন কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক। ধারাবাহিক উপন্যাস। আপনারা আসার আগে এক মন্ত্রী ফারাক্কার জল নিয়ে উপন্যাস শুরু করেছিলেন। এদিকে গোর্খাল্যান্ড একসময় ধারাবাহিক উপন্যাস হয়ে উঠেছিল। ওদিকে পঞ্জাব, শ্রীলঙ্কা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি চাই।
অফকোর্স চাই। আমেরিকা এই ব্যাপারে আপনাদের অনবরত সাহায্য করবে। থার্ড ওয়ার্ল্ডে যেই নাক গলাবে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের সামনে বোমা ফাটাবেন। কুশপুত্তলিকা দাহ করবেন। অবশ্য তার আগে ঠিক করে নিন নিজেদের ভেতর, আপনারা রাশিয়ান না আমেরিকান।
রাশিয়ান, আমেরিকান মানে? আমরা তো ভারতীয়।
ধুস, আমরা আবার কবে ভারতীয় হলুম মশাই? ভারতীয় হলে ভারতের এই অবস্থা হয়! থার্ড ওয়ার্ল্ডের ফাদার হয় রাশিয়া না হয় আমেরিকা। রাশিয়া হওয়াই ভালো। পশ্চিমবাংলার মানুষ রাশিয়াটা ভালো খায়। একটা বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ আছে।
এরপর কবিতা চাই।
কবিতা তো চাই-ই। শব্দ থাকবে, মানে থাকবে না। খুব নামি এক মুখ্যমন্ত্রী কোনওদিন সেনটেন্স কমপ্লিট করতেন না। সবচেয়ে বড় কবি হলেন সবচেয়ে বড় স্টেটসম্যান, সবচেয়ে বড় স্টেটসম্যান হলেন সবচেয়ে বড় কবি। তিনি সব কিছু কবিতার মতো, লেজঝোলা করে রাখতেন। যে পারো বুঝে নাও।
একটু সেক্স চাই। একটু ভায়োলেন্স চাই।
অবশ্যই চাই; তবে নর্মাল সেক্স নয়। পারভারসান। পারভারসান কাকে বলে জানেন?
আপনার মুখেই শুনি।
হিন্দি ছবি যে-দেশের এত বড় সম্পদ, সে দেশের মানুষকে পারভারসান আর ভায়োলেন্স বোঝাতে হবে? ধরুন কেউ নেচে নেচে, কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে গান গায়। কোনও মহিলা শিল্পী। খুব হইচই বাঁধিয়ে দিল। অপসংস্কৃতি বলে শোরগোল তুলে দিন। ব্যস! কাজ হয়ে গেল। সমস্ত দেশের দৃষ্টি চলে গেল সেই শিল্পীর দিকে। তাঁর গান নয় তাঁর শরীরটাকে আন্ডারলাইন করে দিলেন। এইবার হঠাৎ বলুন, না না, ওটা অপসংস্কৃতি নয়, ভারতীয় সংস্কৃতি। সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কাতারে কাতারে ছুটল তাঁর অনুষ্ঠান শুনতে। একে বলে চাঁদে কলঙ্কলেপন টেকনিক। মাঝে মাঝে অশ্লীল সিনেমার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবেন; কিন্তু বন্ধ করবেন না। সিনেমার পোস্টারে নায়িকার উন্মোচিত বুকে কালো রঙের পোঁচড়া টেনে দেবেন। অতীতে এক সম্পাদক ছিলেন, তিনি এক ঢিলে দু-পাখি মারতেন। তাঁর কাগজে আলাদা একটা বিভাগ ছিল, সাহিত্যে অশ্লীলতা। বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত গল্প, উপন্যাসের অশ্লীল অংশ তুলে তুলে দিয়ে মন্তব্য লিখতেন, বাংলা সাহিত্যে আজকাল এইসব অপকর্ম চলেছে। ওই বিভাগটি পড়ার জন্যেই। কাগজের কাটতি বেড়ে যেত। খুঁজে খুঁজে হরেকরকম সমস্যা বের করুন। আসল সমস্যা নয়, নকল সমস্যা। সেইসব সমস্যা নিয়ে বিশাল শোরগোল তুলে দিন। দেশকে সবসময় একটা আন্দোলনের অবস্থায় ফেলে রাখুন। মানুষ সুস্থির হলেই মাথা ঘামাবার অবকাশ পেয়ে যাবে। তখনই হিসাব মেলাতে বসে যাবে, কী দেবার কথা ছিল, কী দিলেন, কী দিলেন না। সব ব্যাপারে মানুষকে একেবারে জেরবার করে রাখুন। কারুকে মাথা তুলতে দেবেন না। জানেন তো ইংরেজিতে একটা কথা আছে, গিভ দেম অ্যান ইঞ্চ, দে উইল আস্ক ফর অ্যান এল। যেই এক ইঞ্চি দিলেন, অমনি পরমুহূর্তে চেয়ে বসবে এক বিঘত। মানুষকে প্রথমে একেবারে ল্যাঙটা করে দিন; তারপর এগিয়ে দিন একটা বাঁদিপোতার গামছা। আমার এক রিলেটিভের একবার। পকেটমার হয়ে গেল। প্রায় হাজারখানেক টাকা চোট। ভীষণ মন খারাপ। পকেটমারকে। গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিলে। হঠাৎ একদিন ডাকে একটা রেলের মান্থলি এল। পকেটমার মান্থলিটি ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই পকেটমারের প্রশংসায়, সততায় আমার আত্মীয়টি একেবার পঞ্চমুখ। উচ্ছাসের বশে ভদ্রলোক এমন কথাও বললেন, এইসব মানুষ আছে বলেই দেশটা এখনও তলিয়ে যায়নি।
মানুষকে কীভাবে, কতভাবে জেরবার করা যায়?
অনেক উপায় আছে। সপ্তাহে একদিন, দেড়দিন পানীয় জল বন্ধ করে দিন। মানুষকে প্রচণ্ড গরমে শুটকি মাছ হতে দিন। থেকে থেকে লোডশেডিং করে দিন; বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের। পরীক্ষার সময়। যানবাহনের সংখ্যা আরও কমিয়ে দিন। চারপাশে ভ্যাট ভ্যাট নর্দমা আর পচা কাদার কেয়ারি করে দিন। মানুষ এক পা এগোতে যেন বাপের নাম ভুলে যায়। রাতে রাস্তায় একবিন্দু আলো যেন না থাকে। রাস্তার চতুর্দিকে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে রাখুন। পাবলিক সার্ভিস শব্দটা ডিকশনারি থেকে মুছে দিন। রাজপথে বিশাল বিশাল জ্যাম তৈরি করুন। পুলিশ আর হোমগার্ডকে এমন ট্রেনিং দিন, একজন বলবে আয়, আর একজন বলবে আসিস না।
হঠাৎ আমার পি-এ ঘরে ঢুকে পড়ল, স্যার ফিনান্সের একজন পিওন আপনাদের কী বলতে এসেছে।
আমাদের এখন জরুরি মিটিং হচ্ছে। আপনার বুদ্ধিশুদ্ধি কি লোপ পেয়ে গেল?
ব্যাপারটা খুব সাঙ্ঘাতিক।
নিয়ে আসুন।
বোকাবোকা চেহারার একটি লোক ঘরে ঢুকে বললে, আপনাদের এক মন্ত্রী একটা গর্তে পড়ে আছে।
গর্তে পড়ে আছে? মন্ত্রী কি ইঁদুর! বাজে কথা বলার জায়গা পাওনি?
