টিভির ছেলেটি বললে, বেশ একটু নতুন ধরনের হল। খোলামেলা। মুখ্যমন্ত্রীরা সাধারণত এইভাবে বলেন না।
ছেলেটি তার-ফার গুটিয়ে, লটবহর নিয়ে চলে যেতেই হঠাৎ নুতন এক চৈতন্যের উদয় হল। এই যে চেয়ার, যে চেয়ারে আমি বসে আছি, এখানে আমার আগে, তার আগে, তারও আগে যাঁরা। বসে গেছেন সকলেই ছিলেন মহা মহারথী। তাঁদের দল ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল। ওই পথে তো আমার যাবার উপায় নেই। আমি যদি একটা অন্য রাস্তা ধরি। চার্লি চ্যাপলিন, পিটার সেলার, ড্যানি কে? কেমন হয়। ভাঁড়কে লোকে পছন্দ করে। যেমন পছন্দ করে অভিনেতাকে। অমিতাভ বচ্চন, সুনীল ডাট, বৈজয়ন্তীমালা। উত্তমকুমার বেঁচে থাকলে অবশ্যই একালের হিড়িকে মুখ্যমন্ত্রী হতেন।
পি এস কে ডেকে জিগ্যেস করলুম, আমি কি একা একা বাইরে একটু বেড়িয়ে আসতে পারি? মাথাটা জ্যাম হয়ে গেছে।
পাগল হয়েছেন স্যার! কোনওদিন দেখেছেন লোমলা ফুটফুটে বিলিতি কুকুর নেড়ি কুকুরের মতো একা একা রাস্তায় ঘুরছে। এইটুকু স্যাক্রিফাইস আপনাকে করতেই হবে। আপনি হলেন চেনে বাঁধা ভি আই পি।
কর্মীদের প্রতিনিধিরা এইসময় হইহই করে ঢুকে পড়লেন। বেশ একটু রাগ রাগ মুখ। আমি বলার আগেই যে যার চেয়ারে বসে পড়লেন। নেতা কোনও ভূমিকা না করেই বললেন, আমাদের মাইনে বাড়াতে হবে।
মাইনে বাড়াতে হবে মানে? সরকারি কর্মচারীদের মাইনে বাড়ে নাকি? পশ্চিমবঙ্গ সরকারে মাইনে বাড়ে না। সরকারি চাকরি তো ঠিক চাকরি নয়, দেশসেবা।
দেখুন ওসব তাপ্পি আমরা আর শুনছি না। দ্রব্যমূল্য সাঙ্তিক বেড়ে গেছে। আমাদের সংসার চলছে না।
স্বার্থপরের মতো, আপনারা শুধু আপনাদের কথাই ভাবছেন, দেশের সাধারণ মানুষের কথা। ভাবুন, যাদের কোনও স্থায়ী রোজগার নেই। মাসে হয়তো একশো কি দেড়শো টাকা রোজগার করে। দু-বেলা মোটা ডালভাতই জোটাতে পারে না। তাদের কথা ভাবার সময় এসেছে।
বাঃ, আপনি দেখছি বেশ তৈরি হয়ে গেছেন। সেই পুরোনো সুর। পুরোনো কথা।
কই আপনারা তো আগের মিনিস্ট্রিতে একটাও কথা বলেননি। বেশ শান্ত ছিলেন।
সে ছিল আমাদের মিনিস্ট্রি। একটু আগে আপনি আমাদের ভয় দেখিয়েছেন। আমাদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দেবেন না। তাহলে কিন্তু সব অচল হয়ে যাবে।
যায় যাবে। আমার কাঁচকলা।
আপনি তাহলে লড়াইয়ের পথ বেছে নিলেন।
অফকোর্স। আপনারাই তো আমাকে শিখিয়েছেন। আপনাদের মিছিল আমি দেখেছি। চিৎকার করতে করতে চলেছেন, লড়াই, লড়াই, লড়াই। এ লড়াই বাঁচার লড়াই।
সেনশর্মা সোনার চশমা পরে এসেছেন। গায়ে বিলিতি গন্ধ। আমি আছি। আমার ক্যাবিনেটের আরও কয়েকজন আছেন। পুরো ক্যাবিনেটটা নেই। বেশকিছু কিছু সদস্য ক্ষমতার আরকে বেগোড়বাঁই হয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে ফাঁট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্রীড়ামন্ত্রী এসে দুঃখ করছিল, আমার বউ দুম করে লালবাজার থেকে এক টুকরো মার্বেল পাথরে আমার নাম খোদাই করে এনেছে, তলায় লেখা, ক্রীড়ামন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ। যখন ঝোঁকের মাথায় করাতে দিয়েছিল, তখন খেয়াল ছিল না লাগাবে কোথায়। এখন বিপদে পড়ে গেছে। আমার তো নিজের বাড়ি নেই। শেষে মিস্ত্রি ডাকিয়ে আমাদের শোবার ঘরের বাইরের দেয়ালে লাগিয়েছে। ব্যাপারটা একটু হাস্যকরই হয়ে গেল। তা আর কী করা যাবে! আপনি আমাকে এমন এক বিভাগ দিলেন, পাঁচ বছর কেন, পনেরো বছরেও বাড়ি করা যাবে কি না সন্দেহ। আবগারি। বিভাগটা আমাকে দিন না। তবু দুটো পয়সার মুখ দেখা যেত। আমি কথা দিচ্ছি, ওই বিভাগটা আমার হাতে দিলে আমি জনগণের অ্যায়সা সেবা করব যে সকাল-সন্ধে কেউ আর উঠতে পারবে না। সবাই গড়াগড়ি যাবে। ঘরে ঘরে আমি চোলাই যন্ত্র চালু করে দোবো। পাড়ায় পাড়ায়। ভাটিখানা। মোড়ে মোড়ে বিয়ার পাব। একবিংশ শতাব্দীতে চা আমি অচল করে দোবো।
আমি কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়েছিলুম। রোগে ধরেছে। টাকা-ব্যামো। আমাদের অবশ্য ঘরে ঘরে জিমনাসিয়াম করার একটা পরিকল্পনা আছে। প্রত্যেক বাড়িতে ফ্রি একসেট ডাম্বেল, বারবেল আর রোমান রিং দেওয়া হবে। লাফাবার দড়ি। প্রত্যেকে প্রত্যেকের শরীরের দিকে নজর দিলে অন্যের দিকে নজর দেবার আর সময় পাবে না। দেহনেশায় সব কুঁদ হয়ে থাকবে। সংশয়ের একটা প্রশ্নই উঠেছে, বধূনির্যাতন বাড়বে কি না! ডাম্বেল দিয়ে দাঁতের গোড়া ভাঙল, কী রোমান রিং-এ দুটো পা গলিয়ে দিয়ে বউকে ঝুলিয়ে রেখে কীর্তন শুরু করল, ও বউ তোর বাপের কাছ থেকে আরও দশ হাজার নিয়ে আয়। স্বামী গাইবে আখর দিয়ে, সখি গো, তোর এ কষ্ট সয় না প্রাণে, নিয়ে আয় নিয়ে আয়, সোনাদানা যা পারিস নিয়ে আয়, নিয়ে আয়। সেনশর্মা বললেন, মনে করুন, আপনারা একটা ম্যাগাজিন। টকিং ম্যাগাজিন। এটা তো ঠিক, কথা বলা ছাড়া আপনাদের আর কোনও কাজ নেই। পাঁচটা বছর চুটিয়ে কথা বলে যাবেন। তেড়ে বক্তৃতা দিয়ে যাবেন। একটা ম্যাগাজিনের সাকুলেশান বাড়ে কীভাবে? বলুন, সবাই ভেবে ভেবে বলুন।
ভালো গল্প চাই।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। ভালো গল্প শোনান দেশের মানুষকে। এই হবে, সেই হবে। হাতি হবে, ঘোড়া হবে। বেকার চাকরি পাবে। মানুষ ভালো খেতে পাবে। পরতে পাবে। ট্রাম পাবে। বাস পাবে। ইচ্ছাপূরণের গল্প শোনান।
