এইবার প্রেজেন্ট কনটেক্সটে চলে আসুন। ওইসব চোলাইখেকো, সাট্টা-প্লেয়াররা হল অষ্টাবক্র মুনি। তাদের উপহাস করেছেন অপ্সরা। ফল এ জন্মেই মিলেছে। ধর্ষিতা। উদ্ধার।
ওদের আপনি অষ্টাবক্র মুনির সঙ্গে তুলনা করছেন?
বাঃ, অ্যাডভান্সড থিওরিটা কী? স্বামীজি বলে গেছেন, বহুরূপে সমুখে তোমার। সবাই ঈশ্বর।
আরে মশাই আমার মাস্টারমশাইয়ের স্কুলে পড়া নাতনি। মহাভারত না আওড়ে কালপ্রিটদের। ধরার ব্যবস্থা করুন। লোকাল থানা ডায়েরি নেয়নি।
নেবে না তো। এসব কেসকে আমরা মনে করি সভ্যতার অগ্রগতি। আমেরিকায় সেকেন্ডে একটা করে রেপ হয়।
আমেরিকার খারাপটা নিলেন। আমেরিকা ভালোটি চোখে পড়ল না? তারা যে চাঁদে চলে গেল!
পয়সা থাকলে হিল্লি-দিল্লি মানুষ অনেক জায়গায় যেতে পারে। দিন না আমাকে একটা রকেটে ভরে। দেখুন না, আমিও চাঁদে চলে গেছি।
এ কেসটার আপনারা কিছু করতে পারবেন না তাহলে?
ব্রাহ্মণের ছেলে কেন মিথ্যে কথা বলব, এসব কেসে কিছু করা যায় না। কেন যায় না শুনবেন? প্রথম হল পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স। দ্বিতীয় হল, সাক্ষী পাওয়া যায় না। কে সাক্ষী দেবে? কেউ দেবে না। সকলেরই প্রাণের ভয় আছে। ওই যে মনে আছে, বেশ কিছুকাল আগে একটা ছেলে অন্ধকারে একটা মেয়ের গায়ে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল, মেয়েটা পুড়ে মারা গেল। কী হল? সাক্ষীর অভাবে দুষ্কৃতকারীরা ছাড়া পেয়ে গেল। ওদিকে দেখুন অত বড় একটা কেসে পুত্রবধূকে মেরে বিছানায় মুড়ে খাটের তলায় রেখে দিয়েছিল। কেস চলে চলে ফাঁসির হুকুম হল। আপিলে সুপ্রিম কোর্ট বললেন, কেউ তো মারতে দেখেনি। যাবজ্জীবন হয়ে গেল। ওই যে আর এক পুত্রবধূ, লস্যির সঙ্গে পারা। কী হল। হয় না, বুঝেছেন, অপরাধ প্রমাণ করা যায় না। অসম্ভব। তবে আপনি এই কেসে ইন্টারেস্টেড। আমরা সাধারণত যা করি, তাই করব। একটা নিরীহ ছেলেকে পাড়া থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে দেব। আধমরা করে সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে দেব।
আপনারা ওই সাট্টা আর চোলাইয়ের ডেনগুলো ভেঙে দিন না। সেটা তো পারেন।
ওসব লাইনে কেন ভাবছেন? ডেস্ট্রাকটিভ লাইনে? কিছু ছেলে করে খাচ্ছে, সহ্য হচ্ছে না। আপনার? পারবেন বেকারদের চাকরি দিতে? পারবেন না। কলকারখানা, মিলফিল সব বন্ধ। জানেন তো দিনকাল খুব খারাপ। বেশি ঠ্যাঙাঠেঙি করতে গেলেই মেহতা কেস। নিশ্চয় ভোলা সম্ভব হয়নি আপনারও। কীভাবে ভদ্রলোককে মেরেছিল! আমি মাঝে মাঝে রাতে ভাবি, আর দুঃস্বপ্নে আঁতকে আঁতকে উঠি। আমি সেই ডেডবডি দেখেছিলুম। উঃ, সে দৃশ্য ভাবা যায় না। চোখ দুটো জ্যান্ত অবস্থায় খাবলে তুলে নিয়েছে। একটা একটা করে হাত কেটে নিয়েছে। শেষ বোধহয় পুরুষাঙ্গ। না আমি উঠি।
উঠি কী? এই কেসটার একটা কিছু করতেই হবে।
কী করব? কিছু করার নেই।
আমি দেখছি, আপনার জন্যেই আমার মন্ত্রিসভা ভেঙে যাবে।
শুনুন এই রাজ্যে কী কী আপনি বন্ধ করতে পারবেন না বলুন তো, চোলাই, সাট্টা, জুয়া, ছিনতাই, রেপ, ডাকাতি, ওয়াগন ব্রেকিং, মাল পাচার, কয়লা চুরি, ভেজাল, ছাত্রবিক্ষোভ, শিক্ষক। ধর্মঘট, কলকারখানা বন্ধ, মিছিল, টিকেটলেস ট্রাভেলিং, দেহব্যবসা, মদ্যপান, দলীয় সঙ্ঘর্ষ,। ফুটপাথ দখল, যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি। আরও সব আছে, আমার মনে পড়ছেনা। এই কয়েকটা ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে দেশ সেবা চালিয়ে যান।
আমি হাঁ করে বসে রইলুম। ভদ্রলোক চলে গেলেন। পি এ এসে বললেন, টেলিভিশান এসেছে।
টেলিভিশান কী করব আমি! এই ঘরে টেলিভিশান ঢোকাবেন না।
টেলিভিশান নয়, টেলিভিশনের লোকজন। সামনে বিশাল এক পরব আসছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্যে ছোট্ট একটা ভাষণ দিতে হবে স্যার।
লটবহর ঘরে ঢুকে পড়ল। টপাটপ চড়া চড়া আলো ফিট করে ফেলল। গলায় একটা স্পিকার ফিট করে দিল। বেশ স্মার্ট একটি ছেলে এদিকে-ওদিকে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। ক্যামেরায় আর একজন। লম্বা লম্বা চুল। মনে হচ্ছে ক্যামেরার দাড়ি বেরিয়েছে। স্মার্ট ছেলেটি বললে, দু একটা কথা বলুন স্যার, আমি-একটু অডিওটা টেস্ট করে নি।
আমি বললুম, আজ শুক্রবার। আমার নাম হযবরল। হারাধনের দশটি ছেলে।
ব্যস ব্যস। অল রাইট। আমি স্যার হাতের ইশারা করলেই শুরু করবেন।
চড়া আলোয় আমার চোখ ছোট হয়ে আসছে। অথচ দর্শকদের দিকে বড় বড় চোখে তাকাতে হবে। সেইটাই নিয়ম। ছেলেটি হাত নাড়ল। কয়েক সেকেন্ড আমি কিছু বলতে পারলুম না। ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেছি। কী বলতে হয়! শেষে বললুম, পশ্চিমবাংলার জনগণ, আপনাদের কাছে নিবেদন, বড় একটি উৎসব আসছে। উৎসব মানেই আতঙ্ক, যেমন আপনাদের ফুটবল আমাদের কাছে এক আতঙ্ক, পরীক্ষা এক আতঙ্ক। আসন্ন উৎসবে আপনারা দয়া করে শান্ত। থাকবেন, কেমন লক্ষ্মী ভাই আমার। সকলকে বুকে টেনে নিন, কাছে টেনে নিন। আমরা এক। সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছি। কবেই বা আমাদের সঙ্কট ছিল না? ছেচল্লিশ থেকেই শুরু হয়েছে। এক যায় তো আর এক আসে। যেই জয়বাংলা কমল তো এসে গেল আন্ত্রিক। তেলের দাম কমে তো চিনির দাম বাড়ে। বাস বাড়ে তো রাস্তা কমে। রাস্তা বড় হয় তো পথচলার নিরাপত্তা কমে। যেমন ধরুন বি টি রোড। যেই বিশাল চওড়া হল রোজ অ্যাকসিডেন্ট। আমরা, মানে মন্ত্রীরা বেশ অস্থির হয়ে আছি। কোনওভাবেই কিছু সামলাতে পারছি না। আপনারা ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকে ছুরি বসাবেন না। আমাদের এই দেশ রামমোহন রায়ের দেশ, রামকৃষ্ণের দেশ, বিবেকানন্দের দেশ, রবীন্দ্রনাথের দেশ। আমাদের বুঝেসুঝে চলতে হবে ভাই। দয়া করে শান্তি বজায় রাখুন। বেশ আনন্দে সংসারযাত্রা নির্বাহ করুন। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের বেশি বাড়াবাড়ি মানায় । ভগবানের নাম নিয়ে, আল্লার নাম নিয়ে, যিশুর নাম নিয়ে সব ছেলেমেয়ে মানুষ করুন। আমরা মানুষ চাই। মোষের খাটাল চাই না। জয় হিন্দ।
