মাস্টারমশায় উঠে দাঁড়ালেন। বিচলিত মনে হচ্ছে। অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। অসাধারণ বলিয়ে-কইয়ে ছিলেন। তিনি ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন।
নাপত্রপন্ত পাপানি কুর্বন্তো বৃষ্ণয়স্তদা।
প্রাদ্বিষণ ব্রাহ্মণাংশ্চাপি পিতৃন দেবাংস্তথৈব।
বৃষ্ণিবংশধরগণ সেই সময় পাপকার্য করেও লজ্জিত হত না আর ব্রাহ্মণ দেখলেই জ্বলে উঠত, পিতৃপুরুষ আর দেবতারা ভেসে গেলেন। স্ত্রীলোকেরা স্বামীদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিত আর। স্বামীরা স্ত্রীদের লঙ্ঘন করে ব্যভিচারের স্রোত বইয়ে দিত।
মাস্টারমশাইকে ধরে চেয়ারে বসালুম। আগের চেয়ে অনেক শীর্ণ হয়েছেন। শরীর কাঁপছে।
আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি মাস্টারমশাই? খুলে বলুন না।
তুমি আমার জন্যে কিছুই করতে পারো না।
বৃদ্ধ মানুষটির ওপর এইবার আমার রাগ হচ্ছে। আমার মুখ্যমন্ত্রীত্ব জেগে উঠছে।
তা হলে এলেন কেন?
একটু জোরেই বলে ফেলেছি। অসহায় মানুষটি আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন। সেই তীব্র উজ্জ্বল চোখ আর নেই। সাদা ঘোলাটে মৃত চোখ। তলার পাতা ভিজে ভিজে। আবেগে প্রায় রুদ্ধকণ্ঠ।
আমি যে তোমাকে বলতে পারছিনা বাবা। বড় লজ্জার ব্যাপার। বড় হীন ব্যাপার। তুমি বরং আজকের বাংলা কাগজটা আনাও।
আমার ইন্ডিকেটার ল্যাম্প জ্বেলে পি একে ডেকে কাগজটা আনালুম। মাস্টারমশাই হাতে নিয়ে পাতা উলটে একটা জায়গা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এই জায়গাটা পড়ো।
আমি পড়ছি। তিনি মাথা নীচু করে বসে আছেন।
ঘটনাটা পড়ে আমার শরীরই কেমন যেন করে উঠল। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ির চারপাশে চোলাই আর সাট্টার ডেন গজিয়ে উঠেছে। তিনি প্রায়ই যাবতীয় অসামাজিক কার্যকলাপের প্রতিবাদ করতেন। শিক্ষক-মানুষ চোখের সামনে যুবসমাজের এই অবক্ষয় সহ্য করতে পারতেন না। এই নিয়েই অশান্তি বাড়ছিল। গতকাল একদল দুবৃত্ত মাস্টারমশাইয়ের নাতনি যখন স্কুল থেকে ফিরছিল তখন সবাই মিলে তাকে তুলে নিয়ে যায় ওই পাড়ারই বহুকালের পুরোনো এক
পরিত্যক্ত বাড়িতে। সেখানে পর পর সাতজন তাকে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়। মেয়েটি হাসপাতালে।
থানায় ডায়েরি করেছেন?
নিলে না। আমাকে বোঝালে, আপনি জ্ঞানী-গুণী মানুষ। যত লোক জানাজানি হবে ততই আপনার অপমান। গুয়ের গামলায় ইট মারলে নিজের গায়েই ছিটকে আসে। এরপর আমার আর কী বলার থাকতে পারে, তুমিই বলো।
আমি গুম মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বললুম, মাস্টারমশাই আপনি বাড়ি যান। দেখি আমি কী করতে পারি।
কমিশনারকে আবার ডেকে পাঠালুম, কাগজটা সামনে ফেলে দিয়ে বললুম, দেখেছেন খবরটা?
এক নজরে খবরটা দেখে বললেন, হ্যাঁ, কী হয়েছে? নাথিং নিউ।
কিছু করা যাবে না?
এ তো একটা। এইরকম শত শত ঘটনা ঘটছে। কটা রিপোর্টেড হয়? কাগজ এ সব ফলাও করে লেখে লোকে পড়তে মজা পায় বলে। এ আগেও হত। এখনও হয়। ভবিষ্যতেও হবে। এ সব মহাভারতের কাল থেকেই ভারতে হয়ে আসছে।
আবার মহাভারত?
হ্যাঁ মহাভারত। ওইটাই তো আমাদের জেনুইন, অথেন্টিক হিস্ট্রি। যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবার পর মহাতেজা অর্জুন বৃষ্ণিবংশীয় শোকার্ত রমণীদের নিয়ে দ্বারকা থেকে ফিরছেন। অনেকদিন চলার পর তাঁরা এসে হাজির হলেন পঞ্চনদ দেশে। পঞ্চনদের শস্যসমৃদ্ধ একটি অঞ্চলে অর্জুন সেই রমণীকুলকে নিয়ে তাঁবু ফেললেন। বিশ্রাম করবেন। আর ওদিকে কী হল, একদল যুবক মহাভারতকার যাদের দস্যু বলেছেন, তাদের নোলায় জল এসে গেল। গাদা গাদা সুন্দরী বিধবা আর তাদের রক্ষক হল একজনমাত্র পুরুষ। তারা সেই তাঁবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সুন্দরীদের। হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে যে যেদিকে পারল ছুটল। অর্জুন কাকে আটকাবেন। সেই কবে কুরুক্ষেত্র হয়ে গেছে। ধনুর্বিদ্যা ভুলে বসে আছেন। বিশাল গান্ডীবে গুণ পরাতেই দম বেরিয়ে যাবার অবস্থা। যাই হোক গুণ পরাতে পরাতেই তাঁর তর্জনগর্জন চলেছে, রে অধার্মিক পাপিষ্ঠ, যদি বাঁচার সাধ থাকে, তবে ব্যাটারা পালা, তা না হলে এখনই বাণ মেরে সব ছিন্নভিন্ন করে দেব। মুখে বলছেন বটে ওদিকে গুণ পরাতে গিয়েই বুঝতে পেরেছেন যুদ্ধ করার দম আর নেই। অস্ত্রশস্ত্রের কথা চিন্তা করার চেষ্টা করলেন, সব ভুলে মেরে দিয়েছেন। বাণের পর বাণ চালালেন। সবই ভোঁতা। লক্ষ্যেরও ঠিক নেই। অর্জুনের চোখের সামনে দস্যুরা মেয়েদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল। তারপর কী করলে, সে তো আপনি রোজ কাগজেই দেখছেন।
অনেকদিন পরে বীর অর্জুন গেছেন সত্যনিষ্ঠ বেদব্যাসের আশ্রমে, অর্থাৎ মহাভারতকারের কাছে। পঞ্চনদ দেশের সেই ঘটনা তখন দগদগে ঘায়ের মতো হয়ে আছে মনে। ম্লান বিষণ্ণ অর্জুনকে দেখে ব্যাসদেব প্রশ্ন করলেন, হে পৃথানন্দ, তোমার কী হয়েছে বাবা? তোমাকে এমন। শ্রীহীন দেখছি কেন? অর্জুন তখন সব বললেন। আমি কুরুক্ষেত্রের অমিততেজা বীর অর্জুন, আমার চোখের সামনে বিধবা রমণীদের ওপর বলাৎকার। আমার মৃত্যুই এখন শ্রেয়। ব্যাসদেব বললেন, আরে অর্জুন তুমি ভেতরের রহস্যটা জানো না? তোমার বীরত্ব কমেনি। আসল। ব্যাপারটা হল, ওই স্ত্রীগণ পূর্বজন্মে অপ্সরা ছিলেন। অষ্টাবক্র মুনির রূপ দেখে উপহাস। করেছিলেন। মুনি শাপ দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা মানবী হয়ে জন্মাবে, দস্যুদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে উদ্ধার পাবে। ওই শাপের ফলেই তোমার বল কমে গিয়েছিল।
