কীসে আর কীসে। চাঁদে আর চাঁদমালায়। আমি ওই থেমে থেমে কোঁত পেড়ে পেড়ে কিছুটা বলতে পারি। তাও আবার সব গুলিয়ে যায়। শুরু করলুম দেশ দিয়ে শেষ হল কড়া পাক সন্দেশে।
কী করে পাওয়ারে এলেন স্যার?
কে জানে? কে আমার এই সর্বনাশ করলে?
ভদ্রলোক কী একটা চিবোতে চিবোতে সুখী হংসের মতো চলে গেলেন। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। আমার দপ্তর আমার সঙ্গে তেমন সহযোগিতা করবে না। কেন করবে! আমি যখন সাধারণ মানুষ ছিলুম, মন দিয়ে গোটা কাগজটা পড়তুম। তখন প্রায়ই মুখ্যমন্ত্রীদের আক্ষেপ শুনেছি, পুলিশ সহযোগিতা করছে না, সচিবালয়ের কর্মীরা অগ্রগতির কাছা টেনে। ধরছে। তখন ওই সব বিলাপ চোখ এড়িয়ে চলে যেত। অনেক সময় খুশিই হতুম। নীচের তলার মানুষের ওপরতলার মানুষের ওপর একটা রাগ থেকেই থাকে। ওঁয়া ওঁয়া করে রাস্তা দিয়ে ছুটছে বিলিতি গাড়ি চেপে। তখন আমি ছিলুম নীচের তলার প্রতিনিধি। এখন আমি হঠাৎ ওপর তলার হয়ে গেছি। হলে কী হবে। ভেতরে বসে আছে তো সেই নীচু তলার মন।
আমার পিএ এসে টেবিলে একটা চিরকুট রাখলেন। আমি ভুরু কুঁচকে তাকালুম।
এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।
কী ব্যাপারে?
বলতে চাইছেন না। অনেকবার প্রশ্ন করেছি, বলছেন পার্সোন্যাল। আপনার শিক্ষক ছিলেন।
আমার শিক্ষক ছিলেন! বেশ আসতে দিন।
দরজার দিকে তাকিয়ে রইলুম। মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের অনেক কায়দা। একপাশে কনফারেন্স রুম। আর একপাশে সেক্রেটারির ঘর। আর একপাশে প্যাসেজ। গোটা তিনেক দরজা। কোন দরজা দিয়ে ঢুকবেন কে জানে। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলেন নীলকমলবাবু। নীলকমল বোস। একসময় আমার কলেজে ইংরেজির নামকরা অধ্যাপক ছিলেন। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম, আসুন স্যার।
তোমার কাছে আসা খুব সহজ নয়। জনসাধারণের কাছ থেকে কত দূরে সরে গেছ? অ্যাঁ! এই তোমার ঘর?
আজ্ঞে হ্যাঁ। এইরকম ঘরেই আমাদের বসতে হয়। সেইটাই নাকি নিয়ম।
এক সময় আমি তোমার শিক্ষক ছিলুম। তোমার জীবনের অনেকটা সময় তুমি আমার সঙ্গে কাটিয়েছ। আমার গোটা বাড়ির এরিয়া বোধহয় অ্যাতোটা হবে না। অ্যাাঁ, কী লাক্সারির মধ্যে আছ? এর মধ্যে থেকে জনসেবা করবে? মূখ।
আপনি আগে বসুন।
হ্যাঁ বসব তো বটেই। কাগজে তোমার নাম দেখে আর সামান্য যেটুকু পরিচয় বেরিয়েছিল সেইটুকু পড়ে, মনে হল তুমি কলেজে আমার ছাত্র ছিলে। এই বয়েসে তোমাদের এই অদ্ভুত অমানুষিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ঠেঙিয়ে আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাতে আসিনি। আমি তোমার কাছে কাঁদতে এসেছি।
কেন স্যার। এই আনন্দের দিনে কাঁদতে এলেন কেন? আমি কি তাহলে আরও খারাপ হয়ে গেলুম।
আজকাল তো আর ভালোমন্দের পুরোনো বিচার-পদ্ধতি অচল। যে যত বড় দুশ্চরিত্র সে তত বড় বীর। যে যত বড় চোর সে তত বড় দেশসেবক। যদুবংশের এই শেষ পরিণতিতে তোমার কাছে চোখের জল ফেলতে আসিনি। আমি তোমাকে জানাতে এসেছি আর কতকাল সহ্য করা যায়?
কী সহ্য?
অসহ্য অবস্থা।
আপনি আমাকে বলুন। টাকা-পয়সার কোনও অসুবিধে থাকলে বলুন। আমার অনেক ফান্ড আছে। আপনাকে আমি না হয় একটা অ্যাডভাইসারের চাকরি করে দিচ্ছি, এডুকেশান। সেক্রেটারির সঙ্গে আলোচনা করে।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ, আমি তোমার কাছে ভিক্ষে চাইতে আসিনি বাবা। আমি সেই জেনারেশানের যে সময় শিক্ষকরা শিক্ষকই ছিলেন, ডাক্তাররা ডাক্তারই ছিলেন, ছাত্ররা ছাত্রই ছিল। অভাব আমাদের কী করবে। তুমি? তুমি কি মহাভারত পড়েছিলে? না, সময় হয়নি।
অল্প অল্প খামচা খামচা পড়া আছে।
যাক না পড়ে ভালোই করেছ। এক একটা লক্ষণ মিলে যেত, আর ভয়ে আঁতকে উঠতে। সময়
পেলে তুমি শুধু ওই জায়গাটা পড়ে নিও, মুষলপর্ব। বিশ্বামিত্র, কশ্ব আর নারদ দ্বারকাধামে এসেছেন। অনেকদিন শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পাননি। তাই এসেছেন দেখা করতে। সারণ আর অন্যান্য বীরেরা তাঁদের দর্শন করে গেলেন। তাঁরা করলেন কি, শাম্বকে স্ত্রীলোক সাজিয়ে সেই মানী মুনিদের সামনে হাজির করে বললেন, ইনি অমিত বলশালী বর পত্নী। আপনারা ত্রিকালজ্ঞ ঋষি, এখন বলুন এর গর্ভে কী জন্মাবে, পুত্র না কন্যা?
ব্যাপারটা একবার বোঝে। জানে ঋষিরা ত্রিকালজ্ঞ। মুখে বলছে, আপনারা ত্রিকালজ্ঞ। আবার শাম্বকে মেয়ে সাজিয়ে এই অশ্লীল প্রশ্ন। শাম্ব কে? না স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের পুত্র। অপমানিত মুনিরা। তখন বললেন, রে বক্রস্বভাব, ক্রোধী, দুরাচার যাদবকুমার। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই পুত্র শাম্ব এক ভয়ংকর লৌহঘটিত মুষল প্রসব করবে, যার দ্বারা সমগ্র বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশবিনষ্ট হবে। কেবল। বলরাম আর শ্রীকৃষ্ণ সেই সর্বনাশ থেকে রেহাই পাবেন। শ্রীমান বলরাম দেহত্যাগ করে সমুদ্রে প্রবেশ করবেন আর জরা নামক জনৈক ব্যাধ ভূতলে শায়িত মহাত্মা কৃষ্ণকে বাণ মেরে নিহত করবে।
তুমি ওই মুষল পর্বটা দয়া করে পড়ে নিও।
কেন বলুন তো?
শোনো, স্বাধীনতা আন্দোলনের পিরিয়ডটা যদি কুরুক্ষেত্র পর্ব হয় তাহলে তোমাদের এই কালটা হল মুষল পর্ব।
ব্যজায়ন্ত খরা গোষু করোদশ্বরীষু চ।
শুনীষ্বপি বিড়ালাশ্চ মূষিকা নকুলীষু চ।
স্যার আমি তো তেমন সংস্কৃত জানি না।
না জানাই ভালো। ডেড ল্যাঙ্গোয়েজ। অক্সফোর্ডের সায়েবরা জানুক, জার্মানরা জানুক। জানুক আমেরিকানরা। মানেটা বড় সুন্দর। ঠিক এখনকার মতো, গাভীর গর্ভে গর্দভ, অশ্বতরীর গর্ভে হস্তিশাবক, কুক্কুরীর গর্ভে বিড়াল ও নকুলীর গর্ভে মূষিক জন্মাবে। এখন যা হচ্ছে। মানুষের গর্ভে মানুষ আর জন্মাচ্ছে না।
