বিভাগীয় সেক্রেটারিরা চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে এলেন কর্মচারী সমিতির এক প্রধান। বেশ উদ্ধত ভাব। বসতে বলার আগেই চেয়ার সরিয়ে বসে পড়লেন এবং একটা সিগারেট ধরালেন কায়দা করে। এ ব্যবহারটা আমার পরিচিত। অসম্মান করে ব্যক্তিত্ব বাড়াবার চেষ্টা। আগের। রেজিমে এঁদের খুব দাপট ছিল।
ভদ্রলোককে ভালো করে দেখলুম। তিনিও আমাকে দেখলেন।
প্রথমে আমিই কথা বললুম, আপনার কিছু বলার আছে?
আপনি কিছু বলবেন?
এখন না পরে। বিশেষ কিছু বলার নেই, অনেক কিছু করার আছে।
কী আর করবেন? আমাদের কেউ কিছু করতে পারেনি।
তাহলে শুনুন, কোলিয়ারি দেখেছেন?
ভদ্রলোক বেশ অবাক হলেন। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে সিগারেটে খুব রামটান মারছিলেন আর ফুস করে ধোঁয়া ছুড়ে দিচ্ছিলেন আমার মুখের দিকে। আমার প্রশ্ন শুনে সেই অসভ্যতা থেমে গেল।
কোলিয়ারি? হ্যাঁ, আসানসোলে একবার একটা কোলিয়ারি দেখেছিলুম।
ভালো করে দেখেননি। কয়লা তুলে নেবার পর এক একটা পিট জল আর বালি ভরে সিল করে দেওয়া হয়। একে বলে সিলিং টেকনিক। অনেক সময় বড় রকমের অ্যাকসিডেন্টের পর, যেমন চাসনালায়, ডেডবডিসমেত পিট সিল করে দেয়। এই সচিবালয়টিকে আমরা সবার আগে সিল করে দেবো।
নেতা একটু মুচকি হেসে বললেন, কাজ হবে কী করে?
বাইরে থেকে। আমরা একটা প্যারালাল সচিবালয় তৈরি করব। আপনারা মাইনে পাবেন, কিন্তু কোনও কাজ থাকবে না। গল্প করবেন, চা খাবেন। আরও অনেক চায়ের দোকান করিডরে করিডরে বসিয়ে দেবো। আমাদের মানবিকতাবোধের অভাব হবে না। কেবল সুইট পলিটিকস আর করা যাবে না। অনেক হয়েছে। এবার আপনাদের ছুটি।
ভদ্রলোক হুক করে একটা শব্দ করলেন, যার অর্থ—কত হাতি গেল তল, মশা বলে কত জল। চেয়ার সরিয়ে উঠে গেলেন। আমি ফোন তুলে নিলুম, মিস্টার সেনশর্মা, পাবলিকের পালস আর প্রেশার বোঝার কোনও যন্ত্র আছে শুনেছি আমেরিকায় আছে।
যন্ত্র নেই প্রতিষ্ঠান আছে। আসনে বসতে না বসতেই অমন উতলা কেন? অত ভয়ের কী আছে! তেমন বুঝলে নেমে দাঁড়াবেন। না গদির মোহ ধরে গেছে?
মোহনয় রোখ চেপে গেছে। হেরে যাব কেন! এখন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই দেশসেবা করব।
এই রে ফু ধরেছে। সাত দিনের মতো ভোগাবে। দেশ সেবা করা যায় না। আজ পর্যন্ত কেউ পারেনি। যাক আমি হাইড্রা মার্কেট সার্ভে এজেনসিকে পাঠাচ্ছি।
মার্কেট সার্ভে?
হ্যাঁ মার্কেট সার্ভে। নিজেদের মনে করুন, সার্ফ কি রিমা কি ডেট কি রিন।
সে কী মশাই?
ওই হল। হাইড্রাকে পাঠাচ্ছি।
ফোন ডিসকানেক্ট করে কমিশনার অফ পুলিশকে চাইব, ঘরে ঢুকলেন লম্বা ছিপছিপে এক ভদ্রলোক।
আমি আপনার প্রাইভেট সেক্রেটারি স্যার। আমাকে ব্যবহার করুন। কী লাইন চাই? কার লাইন? রিসিভার ফেলে দিয়ে বললুম, বসুন আপনি। কী নাম আপনার?
ভদ্রলোক বসলেন না। নাম বললেন, বিকাশ ভট্টাচার্য। আমাকে খানিকটা অতীত শুনিয়ে দিলেন। এই ঘর। এই চেয়ার। সব ইতিহাস। ভদ্রলোকের পান খাওয়া অভ্যাস। তখনও অল্প একটু মুখে আছে। নাড়াচাড়া করছিলেন। তবে কোনও চ্যাকর-চাকর শব্দ হচ্ছিল না। এই ঘরে কত বড় বড় নাটক হয়ে গেছে। প্রফুল্ল ঘোষ, বিধানচন্দ্র, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখার্জি, সিদ্ধার্থশঙ্কর, জ্যোতি বসু। সব বলে বললেন, আপনাদের অবশ্য কোনও অতীত নেই। পড়ে পাওয়া সাতগন্ডা! আমার মুখের স্যার তেমন আগঢ়াক নেই। যা আসে তাই বলে ফেলি। তবে সত্য বলি।
আমি হাঁ হয়ে বসে রইলুম। তিনি দরজা ঠেলে চলে গেলেন।
কমিশনার এলেন। পুলিশ দপ্তরটা আমার। মুখ্যমন্ত্রীরা এই দপ্তরটা সাধারণত নিজের হাতেই রাখেন। আমি বেশ একটু রেগেই ছিলাম, আপনাকে ডাকতে হল? আপনার উচিত ছিল না নিজে আসার।
আমি জানি এস পি আসছেন। আমি নিজে একটা ঝামেলায় আটকে ছিলুম। কলেজ স্ট্রিটে খুব ঝামেলা হয়ে গেছে। এখনও বাসট্রাম বন্ধ।
কলেজ স্ট্রিটে আবার কী ঝামেলা হল?
ও কিছু নয়, রুটিন ব্যাপার। দুই ছাত্র সংসদে মারামারি। আজ ব্যাপারটাকে একটু গুরুপাক করে ফেলেছে। দু-তিন রাউন্ড গুলি চালাতে হয়েছে। দু-একটা মরেছে মনে হয়।
এ আপনি কীভাবে কথা বলছেন। এলিয়ে এলিয়ে। দু-একটা মরেছে। সঠিক সংখ্যা বলুন।
ও আপনি নতুন তাই বোধহয় জানেন না, ইউনিভারসিটি পাড়ায় আমরা মৃত্যুর হিসেব রাখি না। ইন সেভেনটিজ আমরা এত ছাত্র মেরেছি যে ছাত্র আর ছারপোকা এক হয়ে গেছে।
চেয়ারে বিশাল চেহারা এলিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বসেছেন। অসভ্যতাই বলা চলে। একটু কড়কে দেওয়া যায় কি না জানি না। অভিজ্ঞতা এত কম আমার।
প্রশ্ন করলুম, শহরের অবস্থা কী?
থমথমে।
থমথমে কেন?
বুঝতেই পারছেন। পলিটিক্যাল ঘুঘুরা নির্বাচনের রায়ে খুব একটা খুশিনয়। হিট ব্যাক একটা হবেই। পিডিএফ প্রথম ইউএফ-এর কথা মনে পড়ে। কাল আবার ময়দানে দুটো বড় দলের খেলা আছে। কমিউনাল ভায়োলেন্সের সম্ভাবনায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। তারপরেই। আসছে পরব। ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন?
আপনি কলকাতার সমস্ত ওয়ার্ডের মাস্তানদের মিসায় অ্যারেস্ট করুন। দ্যাট ইউ ক্যান।
না, আই ক্যান নট। এখন যা অবস্থা, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। আপনার জেলখানায় জায়গা নেই। তা ছাড়া কোনও মাস্তানই ফ্রি নেই। সবাই লিঙ্কড আপ। অন দি পে রোল অফ পলিটিক্যাল পার্টিজ, বিজনেস হাউসেস অ্যান্ড আদারস।
