তাহলে আমার কাজটা কী হবে?
তোমার কাজ হবে নুন শো।
সে আবার কী?
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে কলেজ কমনরুমে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বারোটা থেকে তিনটে ঢালাও তামিল ছবি। ডাকবাংলোয় মাঝরাত, গরম শরীর!
ছিঃ ছিঃ। সে তো অপসংস্কৃতি। দেশের ভবিষ্যৎটা কী দাঁড়াবে।
বোকা বোকা কথা বোলোনা গোবিন্দ। অনেক আগে, তোমার মনে আছে নিশ্চয়, অপসংস্কৃতির
ঘোরতর বিরোধী এক সরকার লবণ হ্রদের স্টেডিয়ামে ভাল্লুক নাচ করিয়েছিলেন। টিভির। মিডনাইট ফিলমের কথা ভোলোনি নিশ্চয়। আমরা হঠাৎ এসে গদিতে বসেছি। আমাদেরও তো শিখতে হবে। কার কাছে শিখব? আগে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই আমাদের গুরু। পাবলিকের কাছে। সেইটুকুতেই তাঁরা পপুলার হয়েছিলেন। আমরা আরও এক ধাপ এগোতে পারলে আরও পপুলার হব। চোখ-কান খোলা রেখে কাজ করতে হবে। মন্ত্রী হওয়া অত সহজ নয়। সব সময় স্রোতের দিকে যাবে, স্রোতের বিরুদ্ধে নয়। একটা আঙুল রাখবে পাবলিকের পালসে। ভবিষ্যৎ তো একটা আছে রে ভাই। আমাদেরও তো ছেলেপুলে আছে!
ইউ আর এ জ্যাক অ্যাস। আমাদের ছেলেরা মাউন্ট আবুতে যাবে। সেখান থেকে সোজা বিলেতে। পাবলিকের ছেলেদের নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। অত তাড়াতাড়ি সব ভুলে যাও কেন! মনে পড়ে সেই ব্যর্থ আন্দোলনের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রেসিডেন্সির কত চোখা চোখা ছেলে মারা গেল? যাঁরা আন্দোলনের নেতা ছিলেন, আর যাঁরা মারলেন, তাঁদের কারুর কোনও দয়ামায়া ছিল? ছিল না। পাওয়ার ফুটবলের মতো পাওয়ার পলিটিকস।
দপ্তর বণ্টন মোটামুটি একরকম হল। এইবার আমরা সব রাইটার্স বিল্ডিং-এ যাব। কলকাতার পাতাল রেল এখনও শেষ হয়নি। হলেই বা কী! কলকাতার সারফেসের শোচনীয় অবস্থা। এক মাস আগে, আমি তখন কিছুই না, একটা টেম্পোয় শেয়ালদা থেকে ফারনিচার তুলে টালায়
আমার বাড়িতে আসছিলুম। কম সে কম তিন জায়গায় ট্রাফিক পুলিশকে ঘুষ দিতে হয়েছে। সেই সময় আমার রেশান কার্ড হারিয়ে গিয়েছিল। ঘুষ দিয়ে বের করতে হয়েছে। মালদা থেকে মেলোমশাই এসেছিলেন কিডনির অসুখ নিয়ে। কোনও হাসপাতালে সিট না পেয়ে শেষে নার্সিংহোম। আমার দিদির বড় ছেলে পাঁচটা নম্বর কম পেয়েছিল বলে ক্যালকাটা। ইউনিভারসিটিতে ভরতি করাতে পারিনি! আমার কাকা কবে রিটায়ার করেছেন। না পেনশান, না প্রভিডেন্ডফান্ড, গ্র্যাচুইটি। আমি আর আমার স্ত্রী একদিন রাত করে আমাদের আত্মীয়দের বাড়ি থেকে ফিরছি। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের সামনে পাঁচটা ছেলে আমাদের ঘিরে ধরে সব ছিনতাই করে নিলে। থানায় ডায়েরি হল। ফল শূন্য। গলার কাছে ছুরির দাগটা আজও স্মৃতি। যোগেন জুট মিলে ভালো চাকরি করত। বেকার বসে আছে। ছেলেমেয়েরা ফ্যালফ্যাল করে ঘুরছে। যোগেনের স্ত্রী স্কুলমাস্টারি করছিল লিভ ভেকেন্সিতে। মাস্টারিটা গেছে। অনেক চেষ্টা করেও পাকা চাকরি হল না। কায়দা করে বাজার পুড়িয়ে দিলে। নিত্যানন্দের দোকান পুড়ে গেল। নিত্যানন্দ এখন ভিক্ষে করছে। আজ আমি মুখ্যমন্ত্রী। আমার গাড়ির সামনে পুলিশ পাইলট ওঁয়া
ওঁয়া করে চলেছে। কোথায় কলকাতার ট্রাফিক জ্যাম। এক মাস আগের সেই পুলিশ, আজ আমার জন্যে কত তৎপর!
চেয়ারে বসলুম। চারপাশে একবার তাকালুম। প্যানেলিংকরা ঝকঝকে দেয়াল। একটা মাত্র ছবি এ ঘরে থাকবে। কার ছবি? পরে ঠিক হবে। পাবলিকের চোখে কোন মহাপুরুষ এখন সবচেয়ে। শ্রদ্ধেয়। ওই সেনশর্মা যে ফার্মকে দেবেন তাঁদের দিয়েই একটা রেটিং করাতে হবে। সেই অনুসারে ছবি হবে।
চিফ সেক্রেটারি, ডিপার্টমেন্টাল সেক্রেটারিরা একে একে এলেন। হিউম্যান সাইকোলজি আমি কিছুটা বুঝি। সেই সঙ্গে খানিকটা সিকসথ সেনসও আছে। সকলেরই চোখে-মুখে একটা ব্যঙ্গের দৃষ্টি। যেন অর্বাচীন কোনও প্রাণী দেখতে এসেছে। পোড় খাওয়া, ঝানু পলিটিশিয়ান আমি নই। সাতপুরুষে বড়লোক আর লটারি পাওয়া বড়লোকে যা তফাত—সেই তফাত আর কি। কীভাবে এদের হ্যান্ডেল করব ভাবছি। আমার টেবিলটা বিশাল। সামনে, পাশে অনেক চেয়ার। প্রত্যেকেই বসেছেন। সেই একইভাবে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। এর আগে পশ্চিমবাংলায় কয়েকমাসের জন্যে একটি মন্ত্রিসভা হয়েছিল। এরা ভাবছেন সেইরকমই একটা কিছু হয়েছে। ভাবছেন, ওই তোমার চেয়ার। বসেছ, বোসো। হেসে নাও দুদিন বই-তো নয়, কার যে কখন সন্ধ্যা হয়।
আমি বললুম, কী দেখছেন অমন করে?
সকলেই একটু অপ্রস্তুত হলেন। চিফ সেক্রেটারি বললেন, না দেখছি, বয়েসে আপনি খুবই তরুণ। এ রাজ্যের তরুণতম মুখ্যমন্ত্রী।
আপনি কিন্তু বেশ প্রবীণ। প্রোমোশন পেতে পেতে উঠেছেন তাই না?
হ্যাঁ, সেইটাই তো নিয়ম।
আর ক-বছর?
হয়ে এল। বছরতিনেক আছে।
প্রেসিডেন্টস রুল করে না দিলে আপনার পর আমরাও আরও দু-বছর আছি।
হ্যাঁ, আপনার আশঙ্কা অমূলক নয়। প্রেসিডেন্টস রুল হয়ে যেতে পারে।
অনেকদিন হয়নি। হলে আপনাদের দাপট অনেকটা বাড়ে। অচল হয়ে আছেন অনেক দিন।
আপনি তো সবই জানেন।
শিগগির একটা কম্যুনাল রায়ট বাঁধাবার চেষ্টা হবে। ব্যাঙ্ক ডাকাতি আর খুনখারাপি বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম অস্থির হবে। কী কী হবে আমি জানি। ব্যাপক লোডশেডিং হবে। লেবার ট্রাবল বাড়বে। এই রাজ্য কিছুদিনের মধ্যেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়বে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু, টাইফয়েড সবই একসঙ্গে হবে। আমরা সেইভাবেই প্রস্তুত হব। দেখা যাক কী হয়! এতে আপনাদের কোনও ভূমিকা নেই। জনসাধারণেরও বিশেষ কিছু করার নেই। স্বার্থের লড়াই।
