মাছ নিয়ে গোবিন্দ চলে গেল। খগেন সামন্তকে শিক্ষার দায়িত্ব দিলুম। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু যত দূরে, খগেন সামন্ত শিক্ষা থেকে ঠিক ততটাই দূরে। খগেন অশিক্ষাটা ভীষণ ভালো জানে বলেই তাকে শিক্ষাটা দিলুম।
বড় বিপদে ফেললে তুমি! আমি তো আমলাদের হাতের পুতুল হয়ে যাব।
তোমার একটু ইনফরমেশন গ্যাপ হয়ে আছে ভাই। গত পনেরো বছরে আমলারা সব আমলকি হয়ে গেছে। অফিসে এসেছেন, চেয়ারে বসেছেন, পা নাচিয়েছেন, ছুটির পর বাড়ি চলে গেছেন।
কেন?
ওই রেজিমে তাঁদের হোলসেল অকেজো করে রাখা হয়েছিল। অফিস চালিয়েছিলেন পার্টির ছেলেরা। আমলাদের ট্যাঁ-ফোঁকরার উপায় ছিল না। আমলাদের দাপট ছিল রায়-সেনের আমলে। আইসিএস, আইএএস, আইপিএস। আমলারা আপাতত চি-চি করছেন। তুমি যা বলবে তাঁরা তাই করবেন।
আমি কী করব?
আমার সঙ্গে কনসাল্ট করবে। আমাদের পূর্বতনরা একটা লেভেল পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দিয়ে
ভীষণ পপুলার হয়েছিলেন। কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। আমাদের সময় ভীষণ একটা ভয়ের পরিবেশ ছিল। অধ্যাপকদের ভয়ে, পরীক্ষার ভয়ে জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টা ছিল সবচেয়ে দুঃখের। কলেজে যাবার আগে বাথরুমে যেতে হত বারকতক। ডক্টর ব্যানার্জির ক্লাসে আমার মনে হত আত্মহত্যা করি। পড়া না পারলে কো-এডুকেশন ক্লাসে মেয়েদের সামনে সে কী মিষ্টি মিষ্টি জুতো। পরীক্ষার আগে পাঁচ কেজি ওজন কমে যেত। এই নেগেটিভ ব্যাপারটা এখন কেমন পজিটিভ হয়ে গেছে। ক্লাস যদি হয়, তাহলে সেই ক্লাসে আসার আগে এখন অধ্যাপকদেরই বাথরুমে ছুটতে হয়। এখনকার কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অত সুন্দর আড্ডা আর লড়াইয়ের জায়গা দ্বিতীয় নেই। রাজনীতির হাতেখড়ি, সংসারের হাতেখড়ি হচ্ছে। ভবিষ্যতের নেতাদের জন্মভূমি।
তা আমরা কি আবার আমাদের কালে ফিরে যাব?
পাগল! যুবকদের সব সময় সন্তুষ্ট রাখতে হবে। তারাই হল আমাদের ভবিষ্যৎ।
দেশের ভবিষ্যৎ?
ধুর পাগল! দেশের ভবিষ্যৎ নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ। এই তোমার-আমার ভবিষ্যৎ। আমাদের গদির ভবিষ্যৎ। বুড়োহাবড়াদের ভোটে আমরা কোনও দিনই পাওয়ারে আসতে পারব না। আমাদের নির্ভর করতে হবে যুবকদের ভোটের ওপর। নিউ ভোটারস। তরুণ সূর্য সব। শতকরা পঁচাত্তর ভাগ হল যুবক। টাটকা প্রাণ, টগবগ করে ফুটছে, দিকে দিকে গ্রামে-গঞ্জে, নট ইওর ওলড ফসিলস। তাদের ভবিষ্যৎ কী হল তোমার-আমার জানার দরকার নেই। তাদের ভবিষ্যৎ মেরামত করতে গেলে আমরা অপ্রিয় হয়ে যাব। নিউ জেনারেশান আমাদের ঘৃণা করুক, এইটাই কি তুমি চাও! ঘৃণা! না না, সে আমার সহ্য হবে না।
আমার বাবা বলতেন।
তোমার বাবা গুষ্টির পিণ্ডি কী বলতেন আমার জানার দরকার নেই। বাবাদের কাল শেষ। এখন ছেলেদের কাল।
আমার বাবা বলতেন।
আবার সেই আমার বাবা। আরে আমার বাবা আর তোমার বাবা একই কথা বলবেন, ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ।
আর বলতেন ব্রহ্মচর্য। ব্রহ্মচর্যের অভাবে আমার নাকি লেখাপড়া হল না। আকাট মূখ হয়েই রইলাম।
তুমি যে মন্ত্রী হলে, সেটা নিশ্চয় তিনি এখন ওপর থেকে দেখতে পাচ্ছেন। ওসব পুরোনো থিওরি এখন অচল। ওই করে আমাদের ধর্মটা শেষ হয়ে গেল। যত সব নেগেটিভ অনুশাসন। কাম কাম করেই সব গেল। নারী নরকস্য দ্বার। এদিকে সব বিশাল বিশাল মুনি-ঋষি, কেউ যোগবলে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে নৌকোর ওপর মৈথুন করছেন। কেউ বনবালাকে জাপটে ধরেছেন। ধর্ম গেছে যাক। শিক্ষাকে আমরা যুগোপযোগী করব। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে আনন্দের জায়গা,। ফুর্তির জায়গা। ফ্রি-স্টাইল কুস্তি, ক্যারাটে, কুংফুর জায়গা। হিরো, হিরোইনের জায়গা। হিরোইনের দুটো মানে। নায়িকা আর নেশা। পরীক্ষাটাও আমরা তুলে দোবো। পরীক্ষা মানে টোকাটুকি। টোকাটুকি বন্ধ করতে গেলেই ভাঙচুর। পরীক্ষা মানে খাতা দেখা। বছর ঘুরে যায় রেজাল্ট বেরোয় না। কাগজওয়ালাদের লেখার খোরাক মেলে। ক্লাসেরও কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম থাকবে না। যত খুশি ভরতি হও। ভরতি করা নিয়ে অধ্যক্ষদের আর ঘেরাও হতে হবে না। ছাত্র সংগঠনের পান্ডারাও আর হামলা করার সুযোগ পাবে না। একটা বড় আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে। যত খুশি ছাত্র ভরতি করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আয় বাড়াতে পারবে। টার্ম শেষ হয়ে যাবার পর ছাত্রছাত্রীরা কী করবে! ইউএসআইএস লাইব্রেরিতে দেখেছ, লেখা থাকে টেক ওয়ান। প্যামফ্লেট থাকে, বই থাকে, সেইরকম, কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কাউন্টারে লেখা থাকবে, টেক ওয়ান। যার যার ডিগ্রি, ডিপ্লোমা তুলে নাও। নিজেই সুন্দর করে নামটা কালো কালিতে লিখে নাও। বুফে লাঞ্চের কায়দা। কেমন আইডিয়াটা?
জিনিসটার মধ্যে তেমন আঁট রইল না যে।
আ মোলো, স্বাধীনতার পর পঞ্চাশটা বছর চলে গেল, এখনও শৃঙ্খল। বিশৃঙ্খলার জন্যেই তো স্বাধীনতা! অভিভাবকরা চান ছেলেমেয়ের নাম যে কোনও একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খাতায়। লেখানো থাক। আর সব শেষে যেন একটা কাজ পায়। ছাপ চাই ছাপ। সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিলুম। কোনও বাড়িতে লেখাপড়ার পরিবেশ আর আছে? দিবারাত্র টিভি চলছে। ভিডিয়ো চলছে। শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের এই মুক্ত চিন্তা, যুবমহলে কিরকম সাড়া তোলে দেখবে! একে বলে হাই ডাইনামিক মিনিস্ট্রি।
