আপনাদের ইমেজ না থাক, কিশোরকুমারের ইমেজ আছে, মিঠুন চক্রবর্তীর ইমেজ আছে, শ্রীদেবীর ইমেজ আছে। তাঁদের ইমেজ আমরা ভাঙব কী করে?
খুব বলেটলে রাজি করিয়ে, বিজয় উৎসবকে যদি একটা স্টার নাইটের চেহারা দেওয়া যায়, ফাটাফাটি ব্যাপার হয়ে যাবে। মারদাঙ্গা। কত রকমের মডার্ন টেকনিক আছে রে ভাই। আমেরিকার কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। একটা বিজয় মিছিল করবেন তো! পথ পরিক্রমা!
আমাদের ফলোয়ারস কোথায়? ক্যাডার কোথায়?
ফলোয়ারস তৈরি করতে হবে। মানুষ ফলো করে, না ফলো করে মানুষের লোভ! আপনারা। একজন সাইকোলজিস্টের সার্ভিস বুক করুন। আধুনিক মানুষের সাইকোলজি না জানলে রাজত্ব চালাবেন কী করে! দমনপীড়নে কাজ হবে না, বক্তৃতাবাজিতে কিছুই হবে না। জৈনদের মতো। খটমল খিলাতে হবে। লোভের ছারপোকা বের করে আনুন মনের খাঁটিয়া থেকে। তারপর একটু একটু খাওয়ান।
মিছিলটা তাহলে কীভাবে হবে?
লটারি।
তার মানে?
মিছিল পথ পরিক্রমা করে ময়দানে মিলবে। সেখানে থাকবে দেড় হাজার সাইকেল, সেলাইকল, হাতঘড়ি, রঙিন টিভি, জামাকাপড়, পাখা, রেডিও, টেপ-রেকর্ডার যাবতীয় সব লোভনীয় জিনিস। লটারি হবে।
মিস্টার সেনশর্মা মারামারি হয়ে যাবে। রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।
যায় যাবে। আরে মশাই, শেষমেশ তো এদেশে একটা গৃহযুদ্ধই হবে। সেইটার পথ এই পাঁচ বছরে তৈরি করে সরে পড়ুন।
কোথায় সরব মশাই, এই এতগুলো লোক।
কেন সুইজারল্যান্ডে। ওই একটাই তো দেশ আছে। পাতকী-তারণ। পাঁচ বছরে বেশকিছু পাচার করে দিন। দেশসেবার কথা ভুলেও মাথায় আনবেন না। আপনারা হেলেন কেলারও নন, নার্স সিসও নন যে, জনে জনে সেবা করে বেড়াতে হবে। সুযোগ যখন এসেছে, বেশ করে। নিজেদের সেবা করুন। টাকা পাচারের অনেক রাস্তা আছে। ওই যে আমাদের ব্যবসায়ী বন্ধু রয়েছেন, ওই ভদ্রলোক সব বলে দেবেন।
তাহলে আপনি আমাদের একজন ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ব্যবস্থা করে দিন।
হবে হবে। আগে মন্ত্রিসভার কাঠামোটা তৈরি করে ফেলুন।
সেনশর্মা বিদায় নিলেন।
কাঞ্চন গুপ্ত, ছাত্রজীবনে কবিতা লিখত। কাঞ্চনকে দেওয়া হল কৃষি। কৃষির সঙ্গে মন্ত্রীসভার যোগ কবিতার মতোই। সার আর কীটনাশক কোম্পানি বিবিধ ভারতীতে তো চাষিভাইদের কবিতাই শোনায়। প্রথমে একটা ঢাক বাজে তারপর শুরু হয় তরজা কবিতা—শোনো শোনো চাষিভাই, মাজরা পোকা, ঝাঁজরা পোকা, ভেঁপু পোকায় ভাবিয়ে যায়। কৃষি দপ্তরকে তো বিশেষ কিছু করতে হবে না। চাষবাসে আলাদার পলিটিকস কাজ করবে। লাঠি, বল্লম, হেঁসো বেরোবে। জোর যার ফসল তার। এর মধ্যে কোনও কবিতা নেই। ফসলে মাঠ ভরে যায় কবিতার মতো। ক্ষুধার মধ্যেও কবিতা। তা না হলে সুকান্ত কি লিখতেন, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
গোবিন্দ জানা মাছের বাজারটা ভালো জানে। কলকাতার কোন বাজারে কেমন মাছ, ওর একেবারে নখদর্পণে। গোবিন্দই আমাকে মানিকতলার বাজার চিনিয়েছিল। অমন মাছের বাজার আর কলকাতায় দুটো নেই। মাছ খেতে ওর আপত্তি নেই। মাছের দপ্তরটা নিতেই ঘোরতর আপত্তি। আমি তোর ক্যাবিনেটের সকলের চেয়ে বেশি ভোটে জিতে এলুম, আমাকে দিলি মাছ। মাছে কী করার আছে?
বাঙালিকে সস্তায় র্যান্ডম মাছ খাওয়াবি। আমাদের আসন পাকা হয়ে যাবে।
বিধান রায় থেকে ভক্তিভূষণ মণ্ডল কেউ পেরেছেন বাঙালিকে পাঁচ টাকা কিলো কাটা পোনা খাওয়াতে? ভেড়ি পলিটিকস তুই জানিস না! রোজ রাতে লাশ পড়ে যাচ্ছে। মাছ খেলছে জলে। মানুষ খেলছে ডাঙায়।
ভেড়ির মাছ খাওয়াবি কেন? আমাদের আগের আগের মিনিস্ট্রির হাতে আমেরিকা থেকে ফ্রোজেন মাছ আবার একটা পরিকল্পনা ছিল। টিন খুলে প্লেটে এখানকার রুম টেম্পারেচারে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মাছ আবার নড়েচড়ে উঠবে। দপ্তরে বসে সেই সব পুরোনো ফাইল আবার টেনেটুনে বের কর।
আমেরিকার মাছ আমেরিকান রুই তুই গুলিয়ে ফেলেছিস।
আজ্ঞে না। আমেরিকার বাঙালিরা পশ্চিমবাংলার বাঙালিকে ডলার ফিস খাওয়াতে চায়। আর তুই ভাবছিস কেন, দু-তিন মাস অন্তর অন্তর বিদেশ যা। নানারকম পরিকল্পনা নিয়ে ঘোরাফেরা কর। মাছ খাওয়াতে না পারিস, মাছের পরিকল্পনা খাওয়া। মনে নেই আমাদের আগের মিনিস্ট্রি কলকাতার বাজারে বাজারে কয়েকদিন সরকারি মাছ বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। তিন-চারদিন চলেছিল, তারপর সব ভুট্টা। ডিপ ফ্রিজ লাগানো সেই গাড়িগুলো কোথায় আছে খুঁজে বের কর। কাজে লাগা।
গোবিন্দ গাঁইগুঁই শুরু করল।
খুঁতখুঁত করলে তো চলবে না ভাই। দেশের কাজ করতেই হবে।
মাছ খাইয়ে দেশের কাজ! ওই তোমার বুবনা-টুবনা যাদের হাতে অঢেল পয়সা তারা সব নিরামিষাশী। আর যারা মাছ খায় তাদের ভাঁড়ে মা ভবানী। একশো গ্রাম মাছ কিনে পাঁচ টুকরো করে। বাঙালিকে মাছ না খাইয়ে মাছের জল খাওয়া।
ডিকটেটারের কায়দায় ডেমোক্রেসি চালাতে হবে। তা না হলে সব ভেস্তে যাবে। গোবিন্দকে এক দাবড়ানি লাগালুম। বেশি গাঁইগুই করলে মাছ-দুধ কিছুই পাবি না। যুবকল্যাণে ঠেলে দেব।
শোন, পশ্চিমবাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর রায় কী বলতেন জানিস? বলতেন আমার মন্ত্রীরা সব কচ্ছপ। সকালে বিধানসভায় আসার সঙ্গে সঙ্গে চিৎ করে রেখে দি, আর কাজ শেষ হবার পর। এক এক করে উপুড় করে দি, গুটি গুটি সব বাড়ি চলে যায়। গোবিন্দ। ঘোষ আর রায় জুটির এই ডিসিপ্লিন ছিল বলেই চুটিয়ে রাজত্ব করে যেতে পেরেছেন। মহাজনের পথই পথ। সেই ডিসিপ্লিন আমাদেরও অনুকরণ করতে হবে।
