ঘোড়ার ডিম হবে। ইতিহাস ভালো করে পড়ুন মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়। কেন্দ্রীয় সেই রেলমন্ত্রীর কথা মনে পড়ে? তিনি তো রিটার্নড় হয়েছিলেন ভাই। ভোটাররা তো বেইমানি করেনি, বেইমানি করেছে তাঁর পার্টি।
কিন্তু পরের বার নির্বাচনে তাঁর নির্বাচন এলাকায় দল গোহারান হেরেছে।
সে ভাই খুব গোলমেলে ইতিহাস। আমরা আমাদের নির্বাচকদের অতটা অকৃতজ্ঞ নাই বা ভাবলুম। থিংক পজেটিভলি। থিংক পজেটিভলি।
আমার মনে হয় ভাবনামন্ত্রীর একটা পদ তৈরি করুন; যিনি আমাদের ভাবতে শেখাবেন।
আমি ডাবিং অ্যাডভাইটাইজিং এজেনসিকে আসতে বলেছি। তাঁদের প্রতিনিধি কি এসেছেন?
বলতে না বলতেই ঘরে ঢুকলেন মিস্টার সেনশর্মা, আসতে পারি?
আসুন, আসুন। আপনি তো মশাই মোস্ট সট আফটার পার্সন।
সেনশর্মা বসলেন। নিজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কৃতী পুরুষ। টাকে চুল গজাবার একটা লোশানের এমন ক্যামপেন করেছিলেন, টাকে যে চুল কস্মিনকালে গজাতে পারে না, তা জেনেও হাজার হাজার। ক্রেতা সেই দামি হেয়ার টনিক কিনে, এক বছরের মধ্যে টনিক কোম্পানিকে লাল করে দিয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠান এখন মাঠে ঘাস গজাবার ওষুধ তৈরি করছে। সেনশর্মার আর একটি কৃতিত্ব, বৃদ্ধকে যুবক করার একটা বড়ি কয়েক কোটি টাকা বিক্রি করিয়ে দিয়েছিলেন স্রেফ প্রচারের জোরে। এখনও বাজারে সেই ওষুধের সাঙ্ঘাতিক রমরমা।
গবেটস, মিট মিস্টার সেনশর্মা। ডার্বি অ্যাডভাটাইজিং এজেনসির ডিরেকটার।
মিস্টার সেনশর্মা আমাদের কী করবেন?
আমাদের এই লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিকের কাছে সেল করবেন।
আমাদের তো কোনও প্রোডাক্ট নেই!
কে বলেছে নেই। মানুষের অবস্থা ফেরাবার প্রতিশ্রুতিই হল আমাদের প্রোডাক্ট। সেনশর্মা একজন নামকরা মার্কেটিং অ্যাডভাইসার। আপনি আমাদের কিছু অ্যাডভাইস করুন।
সেনশর্মার হাসিটি ভারি সুন্দর। ভেরি মাইডিয়ার। একচিলতে হাসি ছেড়ে তিনি বললেন, পুরোনো একটা প্রবাদ আছে আপনারা শুনেছেন, সর্প হয়ে দংশ তুমি ওঝা হয়ে ঝাড়ো। এই টেকনিকটা আপনারা যত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবেন ততই আপনাদের সাকসেস। শিল্পে এই নীতিটা আপনাদের সাম্রতিক পপুলার করবে! যে কটা শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও আছে, লেবার খেপিয়ে সব বন্ধ করে দিন এক ধার থেকে। তারপর শিল্প দপ্তরের মধ্যস্থতায় একে একে খুলতে আসুন। আবার বন্ধ করতে করতে চলে যান। আবার খুলতে খুলতে আসুন। আবার বন্ধ করতে করতে চলে যান।
বুঝেছি, বুঝেছি। কিন্তু শিল্পের বারোটা যে বেজে যাবে!
বারোটা তো বেজেই আছে। পাট গেছে। লোহা গেছে। ওষুধ গেছে। হোসিয়ারি গেছে। টেক্সটাইল গেছে। প্রেস গেছে। কেমিকেলস গেছে। প্ল্যান্ট অ্যান্ড মেশিনারি গেছে। আছেটা কী? শিল্প বলতে তো এখন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ। বোকার মতো। পশ্চিমবাংলায় শিল্প করুন বলে শিল্পপতিদের কাছে সচিত্র নিমন্ত্রণপত্র ছাড়বেন না। ঘাড়ে গুরুদায়িত্ব এসে যাবে। পাওয়ার দিতে হবে, র মেটিরিয়াল দিতে হবে, লেবার ফ্রন্টে শান্তি বজায় রাখতে হবে। ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যায়, তবু স্বামী বিবেকানন্দ থেকে বলি, জীবন হল খেলা। কিন্তু হোয়েন প্লে বিকাম এ টাস্ক, তখনই বিপদ। আপনারা মাছের মতো খেলুন, শিল্পে খেলুন, কৃষিতে খেলুন, শিক্ষায় খেলুন, জনস্বাস্থ্যে খেলুন। আর একটা কাজ করতে পারবেন?
বলুন?
মোটামুটি আপনার চেহারা আছে, গলা আছে। কোনওরকমে উত্তমকুমার হতে পারবেন?
উত্তমকুমার?
আমাদের জীবনে টিভি আর ফিলম ছাড়া কিছু নেই। সিনেমার নায়ক পলিটিকসে এলে যত বড় দেশসেবকই হোক নির্বাচনে কাত। তাদের গ্ল্যামারের পাশে কারুর দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। আপনারা তার প্রমাণ পেয়েছেন।
উত্তমকুমার হওয়া কি সহজ! সে প্রতিভা আমার নেই।
দক্ষিণ ভারতের পলিটিকসে দেখুন রুপোলি পর্দার নায়কদের কী দাপট! কেউ কেউ আবার গেরুয়া ধারণ করেছেন। প্রোডাকটের সঙ্গে সঙ্গে প্যাকিংটাও তো দেখতে হবে। আজকাল দেখছেন তো সামান্য ধূপকাঠি, আগে বিক্রি হত তাগড়া বান্ডিল বেঁধে, এখন আটটা কি বড়জোর দশটা কাঠির প্যাকেট দেখলে মাথা ঘুরে যাবে। এখন মালের চেয়ে প্যাকিং বড়। কাজের চেয়ে ঘোষণা বড়। আপনাদের ঘোষণা কোথায়! বিজয় উৎসব, বিজয় মিছিল কোথায়?
ঘোষণা একটা করা যায়; কিন্তু কী ঘোষণা করব?
অ্যায় দেখুন। আরে মশাই কত কী ঘোষণা করার আছে। মানুষকে আশা দিন, ভরসা দিন। টাকে চুল গজাবে বলেই না লাখ লাখ শিশি বিক্রি হয়েছিল! আপনার এই মন্ত্রিসভার সকলকে বলুন। একটা করে আশার বাণী দিতে। এই পার্টি অফিসে একটা বাক্স বসান, সেই বাক্সে প্রত্যেকে একটা করে আশার বাণী ফেলুন। মানুষের আশা। ফুটপাথের মানুষ থেকে রাজপ্রাসাদের মানুষ সকলেই যেন ভরসা পায়। মা, মাসি, দাদা, দিদি, বেকার, সাকার সকলেই যেন দু-হাত তুলে। নাচতে থাকে। সেই বাণী সংবলিত সুদৃশ্য হ্যান্ডআউট রঙিন। পাঁচ রঙে ছাপা, হাতে হাতে। ঘুরবে। তার মধ্যে একটা বাণী থাকবে—অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। অশ্লীলতা বললেই আমি অশ্লীল একটা ছবি ছাপতে পারব, হ্যান্ডআউট নিয়ে তখন কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে। কেউ আর না পড়ে ফেলে দিতে পারবে না। আর একটা বিজয় উৎসব করুন।
বিজয় উৎসবে লোক হবে? আমাদের তো তেমন ইমেজ নেই।
