শ্ৰীমতী বুবনা এগিয়ে এসে আমার হাত দুটো ধরে আপ্যায়ন করে সভাকক্ষে নিয়ে গেলেন। এ যেন মনে হচ্ছে বুবনার মেয়ের বিয়ে! শ্রীমতীর গা দিয়ে বিলিতি চাঁপা ফুলের গন্ধ বেরোচ্ছে। ফলের রস খেয়ে শরীরটাকে কেমন রেখেছে! ফল, খাঁটি দুধ আর ঘি। মেছোবাজারের রমরমা তো এদের জন্যেই। বাঙালির ফল হল মালদার দামড়া ফজলি আর বারুইপুরের পেয়ারা, কার্বাইডে পাকানো। খাও আর যাও।
আমার আসতে একটু দেরি হয়েছে। আমার বউ লাস্ট মোমেন্টে এক জ্যোতিষী ডেকে এনেছিলেন। আমি আবার ওসব মানিটানি না। তা বললে, এত বড় মোগল সম্রাট আকবরেরও নাকি জ্যোতিষী ছিল। স্টেট অ্যাস্ট্রোলজার। সেই জ্যোতিষীর জন্যে দেরি হয়ে গেল। তিনি ধরে রাখলেন। চেপে বসিয়ে রাখলেন। বারোটা পনেরোর আগে বেরোনো যাবে না। এই মন্ত্রীত্বে। আমার কোনও লোভ নেই। তবে ওই। পাঁচটা বছর টিকে থাকতে পারলে মন্দটা কী? কিছু তো একটা হবে। একেবারেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো তো নয়।
ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে দেখি এক পশলা সব হয়ে গেছে। কোল্ড ড্রিংকসের খালি বোতল টেবিলে। কারুর কারুর মুখে পান। ভালো। পরের পয়সায় এই তো সবে শুরু। এখনও কত রাত পড়ে আছে। শ্রীমতী বুবনা আমার পাশের চেয়ারে বসলেন। ব্যাপারটা ধরতে পারছিনা। শ্রীমতী কি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি হবেন? হলে আমার আপত্তি নেই। স্টেট বিজনেসের বিরক্তিকর একঘেয়েমি খানিকটা কমবে।
আচ্ছা, শুরু করা যাক।
মিস্টার বুবনা, মুখে তার দু-খিলি পান। দরজার কাছ থেকে বললে, আরে ভাই জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু করো। বলেছে ভালো। উঠে দাঁড়িয়ে আমরা সবে শুরু করতে যাচ্ছি। জনগণমন, বুবনা বললে, নো নো। আমাদের সংগীত থোড়া ডিফারেন্ট আছে। টেবিলের ও মাথায় খুঁড়ি ফুলিয়ে দাঁড়াল, তারপর হেঁড়েগলায় ধরল,
রঘুপতি রাঘব রাজারাম
বিপন্ন বাঙালি চাইছে আরাম
ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম
মালটাল পরে পাবে আগে ফেলো দাম।
আমার কলিগরা দেখলুম বেশ খুশি হয়েছে। অনেকেই বুবনার প্রতিভার প্রশংসা করলে। বেশ যুগোপযোগী। বাস্তব মানে আছে। একজন বললে, আজকাল ক্যাসেটে যেসব হাসির গান বেরোয়, এ তার চেয়ে শতগুণ ভালো।
সভা আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি একটা খালি বোতল টেবিলে ঠুকে বললুম, অর্ডার, অর্ডার। কাম টু বিজনেস। শ্রীমতী বুবনাকে বললুম, আপনি আমাদের প্রসিডিংয়ের একটা নোট নিন।
তিনি বললেন, নোট খুচরোর দরকার নেই। সামনেই যন্ত্র বসিয়ে রেখেছি। লেটেস্ট। জাপানি রেকর্ডার, শার্প সিকস চ্যানেল। ফিল্টার লাগানো।
আমার একসময় এই সব জিনিসের খুব ঝোঁক ছিল। ইচ্ছে করছিল হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি একটু খবরাখবর নি। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মুশকিলে পড়ে গেছি। একেই তো তেমন অভিজ্ঞতা নেই বলে পাঁচজনে পাঁচ কথা বলছে। আমার পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রীদের কেউই ফেলনা ছিলেন না। গদি থেকে। ফেলে দিলেও চিকেন লেগস, বসিয়ে দিলেও চিকেন লেগস, ক্যাডিলাক। আভিজাত্য বাড়াবার কোনও রাস্তা নেই। ডিগ্রি বাড়ানো যায়, ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স বাড়ানো যায়। নীল রক্ত কোথায় পাওয়া যায়? হায় পিতা!
বুবনা বললে, আপনি প্রথমে একটু কিছু বলুন।
বলব? বেশ বলছি। কমরেডস!
হল না বাবুজি! কমরেডস নয়। ওরিজিনাল কিছু ছাড়ুন।
গবেটস!
হাঁ সো বাত ঠিক আছে।
গবেটস, মন্ত্রীসভা কেউ বড় করে, কেউ ছোট করে।
এইটুকু বলতে পেরেছি। বাইরে দুমদাম বুমবাম বোমার শব্দ। নিশ্চয় আমার মুখে ভয়ের ছাপ পড়েছিল। বুবনা বললে,
ঘাবড়াবেন না। আমার অ্যারেঞ্জমেন্ট। যে পুজোর যা নিয়ম। বোমা ছাড়া পলিটিকস হয় না। তাই আমার ছেলেরা ফাটিয়ে গেল। আপনি বলুন।
পিলে চমকে গিয়েছিল। আমি শুরু করলুম,
গবেটস, মন্ত্রীসভা ছোট হবে না বড় হবে নির্ভর করছে, কাজকে আমরা কত ভাগে ভাগ করছি তার ওপর। আমি কাল বসে বসে একটা লিস্ট করেছি। পড়ছি। কারুর কিছু মন্তব্য থাকলে বলবেন। টেপে টেপ হয়ে যাবে। প্রথম হল কৃষি। দেশে চাষবাস তো চাই, তা না হলে তো দুর্ভিক্ষ হবে। তা যার জমি আছে সে চাষ করবে। করবেই করবে। বীজ কিনবে, সার কিনবে, ব্যাঙ্কলোন। দেবে। লোন দেওয়াই ব্যাঙ্কের বিজনেস। তাহলে আমাদের ফোঁপরদালালি করার কি আছে! আমাদের খরা ঠেকাবারও ক্ষমতা নেই, বন্যা ঠেকাবারও ক্ষমতা নেই। আমাদের পূর্বতন মন্ত্রীরা বন্যার সময়ে হেলিকপ্টার চেপে আকাশপথে বন্যাঞ্চল ঘুরে চলে এসেছেন। আর শেষ পর্যন্ত। সেনাবাহিনীকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ওদিকে মানুষ চালে উঠে বসে আছে এদিকে শাসকদল আর বিরোধীদলে কাজিয়া বেঁধে গেছে। ক্ষমতাসীন দল ত্রাণ নিয়ে আর কাউকে এগোতে দিচ্ছে না। গেলেই কামড়াতে আসছে। মেরে লাশ ফেলে দিচ্ছে। মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন— কবিতাটা মনে আছে নিশ্চয়? স্বীয় কীর্তিধ্বজা ধরি আমরাও সেই পথে এগোবো আরও আটঘাট বেঁধে। বন্যা আর খরা আসে শাসকদলের বরাত ফেরাতে। এ এমন এক ওপেন সিক্রেট যা। সকলেই জানে। খরাত্ৰাণ আর বন্যাত্রাণের সেন্ট পারসেন্ট ক্রেডিট আমাদের নিতে হবে। তাহলে কৃষি নয়, চাই ত্রাণবিরোধী দপ্তর। ত্রাণের কাজ আটকাবার জন্যে চাই ত্রাণ পুলিশ। তাহলে কী। দাঁড়াচ্ছে, পুলিশদপ্তরে আর একটি বিভাগ যুক্ত হল। সঙ্গে সঙ্গে এমপ্লয়মেন্ট অপারচুনিটি বেড়ে গেল। আনএমপ্লয়মেন্ট প্রবলেম সলভ করতে হবে তো। যারা চাকরি পাবে, তারা আমাদের। ভোটার হবে।
