টাইমের সাংবাদিক। বেশ সমীহ হচ্ছিল। টাইমে যদি ছোট্ট করে যে-কোনও জায়গায় ভদ্রলোক আমাকে একটু স্থান করে দেন। পত্রপত্রিকার শেষকথা নাকি এইটাইম ম্যাগাজিন! আমি শুনেছি। ভদ্রলোক আমাকে জিগ্যেস করলেন, আমেরিকান অ্যাকসেন্টে, হোয়াট ইজ দ্যাঁ বেঁ অঁ ইওর পার্টি?
সবকটা শব্দ একসঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে এমন করে বললেন, প্রথমে ধরতে পারিনি। শেষে বুঝলাম প্রশ্নটা হল, তোমার পার্টির নাম কী? আমি ঝপ করে বললুম ছত্রভঙ্গ পার্টি অফ ইন্ডিয়া।
ওয়াট। ছাত্ৰভ্যাঙ্গ। ওয়াটস দ্যাট?
সায়েব তুমি ছাতা নিশ্চয় দেখেছ? আমব্রেলা। সিকটিক লাগানো। একসময় বিরাট একটা পার্টির বিশাল ছাতা ভারতের মাথার ওপর ধরা ছিল। তার তলায় সব নৃত্য করতেন। সেই ছাতাটা গেছে ফেঁসে। ফর্দাফাঁই। সিক ফিক খুলে ছত্রাকার। এরই নাম ছত্রভঙ্গ। পুরোনো সব দলই প্রায়। ছত্রভঙ্গ। সেই সব সিক ধরে এনে আমার এই পার্টির ছাতা, দেশের মাথায় নয় নিজেদের মাথায় ধরেছি। যে কোনও দিন খুলে যাবে। সেই সম্ভাবনার কথা ভেবেই নাম রেখেছি, ছত্রভঙ্গ পার্টি অফ ইন্ডিয়া। আমাদের দেশের সবকিছুরই শেষ পরিণতি ছত্রভঙ্গ।
সায়েব শুনে মহা খুশি। এইটুকু একটা ক্যামেরা বের করে ফিচিক ফিচিক করে খানকতক ছবি তুলে নিলেন। অপেক্ষায় আছি, কবে টাইম ম্যাগাজিনে আমার ছবি বেরোয়। সায়েবদের আবার বিশ্বাস নেই। তাদের চোখে ভারতবর্ষ! ছত্রভঙ্গ পার্টির একটা অফিস হয়েছে বড়বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কৃপায়। বড় বিজনেস হাউসের কৃপা আমরা এখনও পাইনি। পেয়ে যাব। টাউটরা ঘোরাফেরা করছে। পলিটিকস আর প্রসটিটিউশান আমরা এক করে ফেলব। সে প্ল্যান আমাদের আছে।
আজ আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। দপ্তর বণ্টন করা হবে। সবচেয়ে বড় লাঠালাঠির ব্যাপার। একটা পানীয় জল কোম্পানি গাড়ি বোঝাই বোতল পাঠিয়ে দিয়েছে। সিঁড়ির বাঁপাশে বিশাল এক আইসবক্স। জলের বোতল ঠান্ডা হচ্ছে। লাল, সাদা, হলদে। ঢোকার দরজার মাথার ওপর পাতিলেবু আর শুকনো লঙ্কার মালা ঝুলছে। দরজার দুটো পাল্লায় সদ্য আঁকা স্বস্তিকা চিহ্ন দগদগ করছে। বড় বড় করে লেখা—শুভলাভ। বড়বাজারের ম্যানেজমেন্ট। এ যেন পানমশলার দোকানের উদ্বোধন অনুষ্ঠান! টেস্টে না মিললেও সহ্য করতে হবে। সেই বলেছে না পলিটিকস মেক স্ট্রেঞ্জ বেড ফেলোজ। ওরা আপাতত মাসলম্যান সাপ্লাই করবে। টাকা-পয়সা দেবে। পেপার পাবলিসিটিতে সাহায্য করবে। দুখানা মারুতি, একটা জিপ দিয়েছে নিশান কোম্পানির। আবার কী! দুধ দিলে চাঁট সহ্য করতে হবেই বাবা। আমার আগে যাঁরা দেশসেবা করে গেছেন। তাঁরা কী করেছেন বাবা! কার সেবা? ও সবাই জানে। সদ্যোজাত শিশুটি পর্যন্ত জানে। সেবা মানে গণেশ সেবা। সর্বহারার পার্টি হয়, সর্বহারা পার্টি হয় না। আমি গান্ধীবাদকে সামান্য একটু টুইস্ট করে নিয়েছি। সেটা হল বিগ হাউসের সেবার চেয়ে স্মল হাউসই ভালো। সুলের চাহিদা সুল। বিগের চাহিদা বিগ। বিগ টেক্সটাইল মিল এক কোটি টাকার লাইসেন্স চাইবে। স্মল চাইবে দশ লাখ টাকার জিংক কি লেড। স্পেয়ার পার্টস।
মিস্টার বুবনা আজ সিল্ক টেরিনের পাঞ্জাবি পরেছেন। পায়ে সাদা মোজা, কালো বুট। ভুড়িটা ঠেলে উঠেছে। পাঞ্জাবির আবরণে মনে হচ্ছে স্টেনলেস স্টিলের কুঁড়ি। ভদ্রলোক বড় বিনীত। সফল ব্যবসায়ীরা ওই রকমই হয়। হাত জোড় করে বললেন, সোব বোবোম্বা কোরে রোখিয়েছে। ভী। বিলকুল ঠিক। কোনফারেনস টেবুলে পান ভি আছে, পান মোশালা ভি আছে।
থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার বুবনা।
লোকটির নাম রামঅওতার বুবনা। বুবনারা দু-ভাই। রাজস্থান থেকে লোটাকম্বল নিয়ে এসেছিল। বড়বাজারে প্রথমে শুরু করে কাটা কাপড়ের বিজনেস। ডজন দরে কাটা কাপড় বিক্রি করত, কিনত মুরারীপুকুরের মেয়েরা। তারা জামাপ্যান্ট তৈরি করে বেচত হরিসার হাটে। সেই রকম।
এক মেয়ের সঙ্গে বুবনার প্রেম হল। বাংলার বায়ু, বাংলার জল। বুবনাও প্রেমে পড়ল। বিয়ে হল। মিসেস বুবনা পয়া মেয়ে। ঠমক-ঠামক দেখলে এখনও মাথা ঘুরে যায়। তা না হলে রাজস্থানি কৈলাশকে বগলদাবা করতে পারে! আজ এখানে অস্থায়ী একটা কিচেন হয়েছে সম্মানিত। আমাদের খাওয়াবার জন্যে। শ্রীমতী বুবনা সিল্কের শাড়ি পরে তদারকি করছেন। হাফকাট শ্যাম্পু করা চুল ফরসা তেলা পিঠের উন্মুক্ত অংশে ঝোলাঝুলি করছে। সিল্কের কাঁধকাটা ব্লাউজ। আমি আর বলতে পারছিনা। মুখ্যমন্ত্রীর উচিত নয়, পরস্ত্রীর রূপ বর্ণনা করার। কাটা কাপড়ের বুবনা। আজ মাল্টি মিলিওনিয়ার। সত্যনারায়ণ পার্কটা কিনতে চেয়েছিল। একটুর জন্যে ফসকে গেছে। এখন ইচ্ছে হয়েছে এসপ্ল্যানেডটা কিনবে। কিনবে মানে, একটা কায়দাটায়দা করে দখল করে নেবে। গাড়ির জন্যে একচিলতে রাস্তা রেখে দুটো পাশ ফেরিঅলাদের দাদন দিয়ে দেবে। বাজার বসাবে। ফল, আনাজপাতি, রাজস্থানী চুড়ি, শাড়ি তৈরি জামাকাপড়, চপ্পল, ফুচকা, ভেলপুরি। এসপ্ল্যানেড অঞ্চলের ফুটপাত এতকাল আমার পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভার এক শরিক দলের মৌরসিপাট্টায় ছিল। বুবনা বলছে, দ্যাট ইজ নো বিজনেস। ওতে লাভ কমে যাচ্ছে। থার্ড পার্টি মুফতে টাকা মেরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ও বলছে কলকাতাকে সেল করতেই হবে, আর আমরাই কিনব। ইংরেজ চলে যাবার পর আমরাই সায়েব। সেল যখন করতেই হবে, ভালো ভাবে করো। লোকটা আবার একটু অশ্লীল মতো আছে। ওই রেডিমেড মেয়েটার ইনফ্লুয়েন্স। বলে কী, সঙ্গম যখন করবে নির্ভাবনায় করো, পয়দার কথা ভেবো না। ব্যাটা! হারামজাদা! না না, বলতেই পারে। ইন্টেলেকচ্যুয়াল বাঙালি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেস্কের ওপর তবলা বাজাচ্ছে। সল্টলেকে জমি কিনেছিল লটারি করে। সে জমিও বেহাত। ব্যাট না ধরেই ক্রিকেটার, বলে পা না ঠেকিয়েই। ফুটবলার, তুলি না ধরেই পেন্টার, কলম না ধরেই সাহিত্যিক। যেমন আমি, ত্যাগ না করে, দেশসেবা না করেই মুখ্যমন্ত্রী। আমার শিক্ষকরা বলতেন, ছেলেটা বলিয়ে-কইয়ে আছে, ওকে আটকাবে কে! এ পারে পুঁতে দিলে ওপারে গাছ বেরোবে। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। স্রেফ মনের জোরে পরীক্ষার পর পরীক্ষা কাঁচকলা দেখিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছোকরার এলেম আছে। বুবনা বলে, গরু আমাদের দু-নম্বর, ব্যবসা। আর তোমাদের দু-নম্বর জ্ঞান, মাইরি বলছি, ভারতকে কোন শালা ঠেকায়! আসল টেকশালটাই একদিন নিলাম হয়ে যাবে। প্রায় হয়েই এসেছে। বাজারে নতুন নোট দেখতে পাও? খুচরোর কী টান!
