রক্ষী দুজন রকে বসে আছে। জানালা দিয়ে আমার ঝকঝকে গাড়িটা দেখতে পাচ্ছি। একটু পরেই আমাকে বেরোতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী হবার পর আমার জীবনের রুটিন একদম পালটে গেছে। সে আমি আর নেই। যোগব্যায়াম ধরতে হয়েছে। সেইটাই নিয়ম। এ দেশের বড় বড় লোক যোগব্যায়াম করেন, ও দেশের বড় বড় লোক করেন জগিং। আমি জগিংই করব ভেবেছিলাম। সদ্য বিলেত ফেরত এক্সপার্ট বললেন, জগিং তো এ শহরে চলবে না। এয়ার পলিউশান লেভেল এত হাই, এখুনি লাং ক্যানসার ধরে যাবে। ইউরোপ হলে সেফলি জগিং করতে পারতেন। কলকাতাটাকে তো আপনারা প্যারাডাইস লস্ট করে ফেলেছেন। নরককুণ্ড।
আপনারা বলবেন না। আমরা কিছু করিনি। করেছেন যাঁরা চলে গেলেন তাঁরা। আমরা তো জাস্ট এলুম। এইবার করা শুরু হবে।
এয়ার কন্ডিশনড মার্কেট থেকে আমার যোগব্যায়ামের জাপানি পোশাক এসে গেছে। বিলেত ফেরত একজন ডাক্তারবাবু আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। থরো চেকআপ। প্রেশার, পালস, হার্টবিট, সুগার, ব্লাড কোলেস্টরেল পরীক্ষা হয়ে গেছে। নর্মাল। এই চেকআপটা আমাকে মাঝেমাঝেই করাতে হবে। কোনও উপায় নেই। আমি তো আর সাধারণ মানুষ নই। এত বড় একটা স্টেটের মুখ্যমন্ত্রী। আমি এখন সব ব্যাপারেই এক নম্বর। এক নম্বর রোগ, এক নম্বর। রোগী। আমার ডায়েট চার্ট তৈরি। চার্ট মিলিয়ে খেতে হবে। ভোর ছটায় একগেলাস লেবুর রস। সামান্য ওয়াকিং। আসন। বাথরুমে বাথটাব গীজার এসে গেছে। এক টাব জল ভরতি করে। বাথসল্ট ছেড়ে শুয়ে পড়ে খানিক খরবলর। তারপর বাথরোব পরে পোর্টিকোয় বসে অল্প একটু দেশের চিন্তা। দেশই তো ঈশ্বর। তৎপরে ব্রেকফাস্ট। ডিম খাব। রুটি খাব। জ্যাম-জেলি খাব। ফল খাব। চায়ের লিকার খাব। চিনি ছাড়া। তারপর ভিটামিন ক্যাপসুল একটা। ভিটামিনের কনসাইনমেন্ট এসেছে লন্ডন থেকে, দিশি ভিটামিনে ভিটামিন নাও থাকতে পারে। গুঁড়ো হলুদ। এ দেশের ওষুধে ওষুধ থাকবে এমন দেশ শাসন আমরা করি না। আমাদের পূর্বতন শাসকরা একটা জিনিস শিখিয়ে গেছেন—সবকিছুর মধ্যে একটা সারপ্রাইজ ফ্যাক্টর রাখবে। কী আছে! বাঘ আছে না ভালুক আছে! ভুত আছে না প্রেত আছে! পেটে গেলে মরবে না বাঁচবে! তারপর কী হয়! এই আছি। এরপর কী হয়। বোম মারে না ছুরি! মাল বোঝাই লরি ঘাড়ে চড়ে, না মিনি!
ব্রেকফাস্টের পর রাইটার্সে গিয়ে রাজচিন্তা। এগারোটায় এক কাপ ব্ল্যাক কফি। দেড়টায় লাঞ্চ। স্যুপ। চার চামচে দেরাদুন রাইস। প্লেন্টি অফ ভেজিটেবলস। বেকড ফিস। একটা মিষ্টি। পনেরো মিনিট হালকা ঘুম। একটা ডানহিল সিগারেট। বেশ পরিবর্তন। দিনে চারবার বেশ পরিবর্তন। সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্টর। পরিধেয়র সঙ্গে মনের যোগ। রাইটার্স। মিটিং। ফাইল ধরে টানাটানি। ছটায় মিট দ্য প্রেস। কর্মময় একটি দিনের অবসান। আটটার সময় মেপে মেপে ঠিক তিন পেগ স্কচ-হুইস্কি। তারপর একটা মুরগির ঠ্যাং। বেক করা। দুটো ফুলকো রুটি। একটু পুডিং। মানে যৎসামান্য ক্ষুন্নিবৃত্তি।
আমি আমার পার্সোনাল ফিজিশিয়ানকে বলেছিলুম, মশাই তিনটে মধ্যবিত্ত বাঙালি ব্যায়রাম আমি ঘৃণা করি, কোনও বড় মানুষের যা কখনও হয় না, পেটের অসুখ, সর্দিজ্বর আর কথায় কথায় মাথাধরা।
ডাক্তার বললেন, ধরেছেন ঠিক। কেরানি আর মাস্টারদের হয়। ডিফেকটিভ ইটিং হ্যাবিটস। আপনি বেগড়া চালের ভাত, পুঁইশাকের ঘ্যাঁট, পোস্ত, বাড়ির চালে যেসব আনাজপাতি হয় যেমন লাউ-কুমড়ো ছোঁবেন না। ঢ্যাঁড়স ঝিঙে চিচিঙ্গে এসব জনগণের দিকে ঠেলে দিন। স্রেফ প্রোটিনের ওপর থাকুন, আর দু-তিন পেগ বিলিত ঢালুন, দেখবেন কনস্টিটিউশান চেঞ্জ করে গেছে। আর আপনার তো কোনও টেনশান নেই।
টেনশন নেই! বলেন কী? এত বড় একটা দেশ, তার এই মিলিয়নস অফ প্রবলেম।
ও সব বলবেন না। মুখে একশোবার কেন, হাজার বার বলবেন, কিন্তু ভুলেও মনে বাসা বাঁধতে দেবেন না। সেই রবীন্দ্রসংগীতটাকে একটু এদিক-সেদিক করে গাইবেন, হবার যাহা হবে তাহা। মরার যাহা মরে। দুটো জিনিস আপ্তবাক্য নিজে মনে রাখবেন, সভা-সমিতিতে প্রত্যেকের মনে গেঁথে দেবার চেষ্টা করবেন। ডেভেলপিং কান্ট্রি। চল্লিশ বছর ধরে ডেভেলপিং। চারশো বছর পরেও ডেভেলপিং। কান্ট্রি হল কান্ট্রিলিকার, হাজার চেষ্টা করলেও স্কচ-হুইস্কি হবে না। দু-নম্বর হল সেন্টার। স্টেট থাকলেই সেন্টার থাকবে। সেন্টারের বিমাতাসুলভ ব্যবহার। সাতখুন মাপ। আপনার আবার টেনশান কীসের। চাবুক মারার মতো দুটো ঘোড়া সবসময় রেডি। আর সবশেষে সুইট ডিশের মতো মিষ্টি হেসে পরিবেশ করবেন, বন্ধুগণ, প্রবলেম ইজ লাইফ। এই করে চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আপনার পূর্ববর্তীরা তো বেশ ভালোই চালিয়ে গেলেন।
সব পার্টিরই একটা পার্টি-অফিস থাকে। প্রেসিডেন্ট থাকে। চেয়ারম্যান থাকে। আমাদের তো আগে কোনও অর্গানাইজেশানই ছিল না। অন্তত আমার ছিল না। আমি হলুম গিয়ে রাজনৈতিক জেলে। খ্যাপলা জাল ফেলে পার্টিভাঙা এক একটা চেলাকে ধরেছি। রামপ্রসাদ বেঁচে থাকলে আমাকে দেখেই লিখতেন জাল ফেলে জেলে বসে আছে জলে। বড় বড় পার্টি সব ভাঙতে ভাঙতে টুকরো হতে হতে পার্টি আর নেই—মিছরির চাক নয় চিনির দানা। ইলেকশান জেতার পর টাইম। পত্রিকার একজন সাংবাদিক কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন ভারতে এখন যা অবস্থা, একটা লোক একটা পাটি। ভদ্রলোক বয়সে প্রবীণ। ইতিহাস বেশ জানেন। অতুল্য ঘোষ, কংগ্রেসের ভাঙন থেকে। রাজীবের অ্যামপুটেশান পর্যন্ত গড়গড় বলে গেলেন। ধরলেন জনসকে। চলে এলেন। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ায়। ভাঙছে, শুধু ভাঙছে।
