হ্যাঁ। বাবা আর মা।
দুজনে দুজনকে ভীষণ ভালোবাসতেন। অন্তত আমরা তাই মনে করতুম। আত্মীয়স্বজনরা বলতেন, আহা। সাক্ষাৎ হরগৌরী! মা মারা গেলেন। বছর না ঘুরতেই আমার মাসি মা হয়ে এলেন। বোঝে ব্যাপার! সে আবার কীরকম মা, যাঁর সংসার ভালো লাগে না। দশটা বাজতে না বাজতেই সেজেগুঁজে বেরিয়ে পড়েন। কয়েকশো বন্ধুবান্ধব। আজ এর বাড়ি কাল ওর বাড়ি।
পরশু সিনেমা। দ্বিতীয় পক্ষের বউ। বাবা মিউমিউ করে বলেন, মানু সংসারটা এবার ধরো। মাসি বলেন, ধুর সংসার আমার ভালো লাগেনা। এই তো জীবন! আজ আছি কাল নেই। ফুর্তি করে যাই। আসলে মায়ের পাশাপাশি বাবা মাসির সঙ্গেও একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। সেই সময়ে আদর দিয়ে দিয়ে একটি বাঁদরি তৈরি করেছিলেন। তাকে আর সামলাবেন কী করে? আমার হাফ ব্রাদার ঝিয়ের কোলে মানুষ। আমাদের ছেলেবেলাটা মাসির ড্রেস দেখেই কেটে গেল। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, কী রে ছেলেটা! কী দেখছিস! আমার বাবা যখন মারা যাচ্ছেন, তিনি তখন কাঠমান্ডুতে কেরামতি করতে গেছেন। ফিরে এসে বললেন, মরার আর সময় পেলে না। মন্তব্যটাকে আপ্রাণ চেষ্টা করে আমরা ভুলে গেলুম। ভাবলুম, শোকে মানুষের মাথার ঠিক থাকে না তো! বেড়ালের পায়খানা করা দেখেছ? নরম ভুসভুসে মাটিতে করে, তারপর চাপা দিয়ে দেয়। জীবনের নোংরা সত্যকে আমরা সেইভাবে চাপা দিয়ে দি। তারপর বাগান করার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে হঠাৎ হাতে লেগে যায়। ঘেন্না ঠেকাই এইভাবে, ভালো সার। গাছ ভালো হবে। তারপর এই মাসি আমার বাবার বন্ধু সরোজবাবুর ঘাড়ে গিয়ে চাপলেন। রাধাবাজারে সরোজবাবুর ঘড়ির দোকান ছিল। মহিলার স্বভাব তিনি ভালোই জানতেন, তবু সামলাতে পারলেন না নিজেকে। সংসার ভাসিয়ে ভেসে পড়লেন। যিনি সময়ের ব্যবসা করতেন, তিনি নিজের সময় বুঝতে পারলেন না। মানসিক চাপে সেরিব্রাল অ্যাটাকিংয়ে। ছমাস বিছানায় পড়ে থেকে বিদায় নিলেন। তাঁর সাধের মানুষ একজন নার্সের হাতে তাঁকে তুলে দিয়ে যথারীতি নেচে বেড়ালেন। এইবার আমি তোমার কথায় আসি। তুমি দিনকতক আমার বন্ধু শৈবালের সঙ্গে বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলে। মনে আছে?
শ্যামলীর মুখটা বেশ করুণ দেখাল। আমি ইচ্ছে করেই একটু ধাক্কা মারলুম। আজ আমার। সুযোগ এসেছে। আমি অবশ্য খুব সাবধানে প্রতিভার কথাটা চেপে গেলুম। আমার এই ব্যক্তিগত কাদা খোঁচাতে গিয়ে হঠাৎ একটা সত্য পেয়ে গেলুম। ল্যাক অফ ইনটেলিজেন্স মানুষকে যেমন অসহায় করে, দুর্বল করে, স্টেটের ক্ষেত্রেও ইনটেলিজেন্স ল্যাপস সাংঘাতিক একটা উইকনেস। উইক পয়েন্ট। শ্যামলী যদি প্রতিভার ব্যাপারটা জানত, সহজেই আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে পারত। আমি অমন আপারহ্যান্ড নিতে পারতুম না। আমার ক্যাবিনেটে একটা দপ্তর রাখব, উইকনেস ডিপার্টমেন্ট। ফুল ফ্লেজেড একজন মন্ত্রী থাকবে—উইকনেস মন্ত্রী। তার কাজ হবে আমাদের দুর্বলতা খোঁজা। দুর্বলতা হল নাইলন কর্ড। হোলি অ্যালায়েন্স টেকে না। ধর্মের কথা— যত মত তত পথ। আনহোলি অ্যালায়েন্স স্থায়ী হবে। হালফিল কেন্দ্রেকী হয়ে গেল! ভালো। মানুষের ছেলেরা সৎ সরকার গড়তে চেয়ে কী কেলেঙ্কারি! কোথা থেকে এক বোফর্স এসে ঢুকল। কার যেন সুইশব্যাঙ্কে টাকা বেরোল। কে নিয়ে এল জার্মান সাবমেরিন। সব তালগোল পাকিয়ে গেল। এ বলে আমি সৎ, ও বলে আমি আরও সৎ। সতে সতে বুদ্ধির লড়াই। কাদা ছোড়াছুড়ি। পদত্যাগ। বহিষ্কার। দপ্তর বদল। আমি একজন প্রলোভন মন্ত্রী নিয়োগ করব। সেই দপ্তরের কাজ হবে সৎকে প্রলোভনের মডার্ন টেকনিক দিয়ে অসৎ করে তোলা। সতের অহঙ্কার সাঙ্ঘাতিক অহঙ্কার। পাগলামি। আই অ্যাম অনেস্ট বলে ঠোঁট ফুলিয়ে, মুখ ভেটকে বসে রইল। যত সব কুসংস্কার। সোনার যেমন পাথরবাটি হয় না, মানুষের সংগঠনও তেমনি সৎ হতে পারে না। একজন মানুষ অতি কষ্টে হর্তুকি-ত্রিফলা খেয়ে, চোখে গ্লুকোমা ধরিয়ে, সর্ব অঙ্গে বাত লাগিয়ে বাবা রে মা রে করে এক ধরনের জড়দগব সৎ হতে পারে। একসঙ্গে একশোটা মানুষের একটা দল সৎ হতে পারে না। তাই যদি হবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এ অবস্থা হবে কেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোলনলচে খুলে পড়ে যাবে কেন? হেলদি মানুষ মাত্রেই এদিক-সেদিক করবে। কোনও নিস্তার নেই। ইতিহাসেরও মাথায় তারকেশ্বরের মোহন্ত। এলোকেশীকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। এ মাথায় রজনীশ।
হোঁদকা দুজন বডিগার্ড পাঠিয়েছে। আজকাল এই এক জ্বালা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বুকে স্টিলপ্লেট বেঁধে ট্যাঙা হয়ে ঘুরছেন। হাত দুটো বগলের পাশে টাঁশ হয়ে পড়ে না। চেতিয়ে থাকে। কোটের হাতা দুটো ট্যাঙটেঙি লাগে। হাম হিন্দুস্তানি বলে বুকে ঘুসি মারার উপায় নেই। জেনুইন বুকের শব্দ বেরোবে না। কৃত্রিম ক্যানেস্তারা পেটা শব্দ বেরোবে। টেলিস্কোপিক রাইফেল দিয়ে। কেনেডিকে মেরেছিল। সেই থেকে রেওয়াজ হয়ে গেছে কিছু শিকারির—যাই একটা প্রধানমন্ত্রী। মেরে আসি। ভারতে গন্ডা গন্ডা মুখ্যমন্ত্রী। রোজ একটা করে মারা যায়। মারে না, কে আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে চায়। তবু রেওয়াজ হয়েছে, দুজন রক্ষী থাকবে। রক্ষীরা যে কত বাঁচাতে পারে, তা সে তো দেখা গেছে। সেই শ্রীলঙ্কায় প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে বন্দুকের কুঁদো লড়িয়ে দিলে। যে মেরেছিল তার হাত ফসকে বন্দুকটা পড়ে না গেলে কী হত? আনোয়ার সাদাতের কী হল!
