যদি কেউ জিগ্যেস করে কেমন আছেন?
বলবে, বর্ষা এবার ভালো হল না। না না, দাঁড়াও, ওটা তো বলা যাবে না।
কেন?
রিস্ক আছে। স্বীকারোক্তি হয়ে গেল। বর্ষা ভালো হল না মানে খরা। সঙ্গে সঙ্গে কাগজে ফলাও হয়ে যাবে। দেশব্যাপী খরা। মন্ত্রীরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। সেচের কোনও ব্যবস্থাই করা হয়নি, ত্রাণ বিলম্বিত। ত্রাণের টাকায় পার্টিফিস্টি খেয়েছে। ওদের অনেক স্টক ছবি থাকে। খরার ছবি, বন্যার ছবি। বেহালার মাঠে গরু চরছে, ঠিক দুপুরে সেই ছবিটা ছেপে বললে, বীরভূম বাঁকুড়া জ্বলে গেল। ক্ষান্তপিসির ফাটা ফাটা মুখ, লিখে দিলে অনু দে। এজরা স্ট্রিটের ভিখিরি। অনাহারের অ্যানাটমি।
তা হলে কী বলব?
বলবে? আপাতত মাসতিনেক কিছু না বলাই ভালো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। আমাদের মন্ত্র হবে, শুনেও শুনছি না, দেখেও দেখছি না।
আমি বলব? আমাদের মেয়েদের একটা ভালো শব্দ আছে, তাইই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তা আ আ আই। সবেতেই ওটা ব্যবহার করা যায় এবং করবেও। এখন দেখবে অনেকেই তোমাকে অনেক কিছু বলতে আসবে। আপার সোসাইটির মহিলারা আসবেন। ওঁদের সব নানা ব্যাপার আছে, বুঝলে? ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। ক্র্যাফটস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। স্লাম ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। নিউট্রিশান প্রোগাম। আই ব্যাঙ্ক। কিডনি ব্যাঙ্ক। মেডিসিন ব্যাঙ্ক। বুক ব্যাঙ্ক। প্রিজারভেশান অফ ওম্যান রাইটস। বটল ব্যাঙ্ক।
বটল ব্যাঙ্ক কী জিনিস?
মদ ও বিয়ারের বোতল সংগ্রহ করাই যে সমিতির কাজ। নানারকম জিনিস তৈরি করে, সারা বছর ওঁরা নানা ফেস্ট অর্গনাইজ করেন, সেইখানে বিক্রি করা। ওইরকম একটা ফেস্টে আমি একবার এক মাসের মেয়ের গায়ে হবে এইরকম জামার দাম শুনে ভয়ে পালিয়ে এসেছিলুম।
কত দাম হতে পারে?
তিরিশ, চল্লিশ ম্যাক্সিমাম।
সাদা, জ্যালজেলে একটা কাপড়। দাম, দুশো টাকা! ছোট্ট হাতমোছা একটা তোয়ালের দাম পঁচিশ টাকা! থাক ও প্রসঙ্গ থাক। ওই সব সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক মহিলারা তোমার কাছে প্রায়ই আসবেন। ঠোঁটে জাম রঙের লিপস্টিক। ঘর্মাক্ত মেকআপ। তোমাকে দিয়ে সভাসমিতি করাবেন, উদ্বোধন করাবেন, প্রাইজ দেওয়াবেন, আই অপারেশান ক্যাম্পে চশমা বিতরণ করতে হবে। বিরক্ত হলে চলবে না। ওই মহিলারা এখন বধূহত্যা ও নারী ধর্ষণ দিয়ে খুব মাথা ঘামাচ্ছেন। তোমাকে হয়তো প্রশ্ন করলেন, বধূহত্যা কি খুব বেড়েছে?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলব, তা—আই!
রাইট। সোনা আমার। ওঁরা জিগ্যেস করবেন, গ্রামেগঞ্জে, রাস্তাঘাটে, মহিলারা ধর্ষণকারীর ভয়ে হাঁটতে পারছে না।
আমি সঙ্গে-সঙ্গে বলব, তাআআই!
তুমি পারবে। তোমার সে এলেম আছে। তবে তোমাকেও সেবার কাজে লাগতে হবে। ভয় পেও না। সেবা মানে কোমরে আঁচল জড়িয়ে পঙক্তি পরিবেশন নয়। একটা গাড়ি থাকবে, তোমার। হাতে কিছু ফাইল আর কাগজপত্র থাকবে। তোমার কোথাও একটা অফিস থাকবে। আর। সমাজসেবার এমন এমন দিক সব বেছে নেবে যা ইন্টারন্যাশনাল। তোমার উদ্দেশ্যটা হবে, থেকে থেকে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে নেওয়া। যেমন ধরো বস্তি বা ফুটপাথের শিশুদের পুঁয়ে পাওয়া নিবারণ। চলে গেলে আর্জেন্টিনা কী উরুগুয়ে। যেমন ধরো নিম্নবিত্ত মায়েদের গর্ভকালীন অপুষ্টি। চলে গেলে নিউইয়র্ক। কর্নিয়া গ্র্যাফটিং, চলে গেলে মস্কো। সব সময় মনে রাখবে, মানুষ তোমার গিয়ে বিলেতি কুকুর নয় যে অত সেবা আর তোয়াজ করতে হবে। ভেবে দেখো, পৃথিবীতে যত গোল্ডেন রিট্রিভার, কি গ্রেটডেন, কি বকসার, কি চু হুয়াহুয়া আছে তার চেয়ে। হাজার হাজার গুণ বেশি মানুষ এই কলকাতায় আছে। মানুষ পটল তুলে কিছুই করতে পারবে না। কোনও করুণা, কোনও সহানুভূতিই আদায় করতে পারবে না। দু-হাজার এক সালে অবস্থাটা কীরকম দাঁড়াবে জানো, মরল মরল, বাঁচল বাঁচল। অনেকটা নেড়ি কুকুরের মতো। সারা রাত খেয়োখেয়ি। পথের ধারে পুঁটকিপাঁট। লোকে যেভাবে মরা কুকুরের দিকে তাকিয়ে চলে যায়, সেই উদাসীনতায় চলে যাবে। বড়জোর গা-টা একটু গুলিয়ে উঠবে। যদি আমরা গদিতে কিছুকাল স্টিক করে থাকতে পারি, তা হলে আমাদের যে দুটো কাজ করে যেতে হবে, তা হল। ক্যানিবলিক ক্যানাইন সোসাইটি তৈরি। পুরোপুরি। আংশিক নয়। একজন কসাই গরু কি ছাগল মরে পড়ে আছে দেখলে কী ভাবে? আহা, মরে গেল রে, বলে নাকের জল টানে? না। সে লাফিয়ে ওঠে, চামড়া। কাফ, ক্রোম, কিড লেদার। দুহাজার একে আমরা এমন করে দোব, মানুষ দেখলেই মানুষ কঙ্কালের কথা ভাববে। ছাড়িয়েছুড়িয়ে, ব্লিচ করে এক্সপোর্ট। বিদেশে কঙ্কালের ডিম্যান্ড জানো? সাংঘাতিক ভালো ব্যবসা। তারপর ধরো, মানুষটা জীবিত অবস্থায় ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ভিয়েনা, ভেনেজুয়েলা যেতে পারল না। সেই দুঃখটা মিটল। বিকাশ সামুইয়ের কঙ্কাল ভিয়েনায় ঝুলছে। কে বলতে পারে, হাড়ের খাঁচায় আত্ম-অদৃশ্য পাখি হয়ে উড়ে আসে কি না! আসতেও পারে। বিদেশে ওই লোহালক্কড় আর কিছু জামাকাপড় ছাড়া, আমাদের সব জিনিসই তো সাব স্ট্যান্ডার্ড। ভেজালে ভরতি। কঙ্কালে তো আর ভেজাল চলবে না। তুমি বুক ঠেলে ঠুকে বলতে পারবে, এক্সপোর্টার অফ পিওর, জেনুইন কঙ্কাল।
তুমি সিরিয়াসলি বলছ?
কঠিন সত্য সিরিয়াসলি বললেও ব্যঙ্গের মতো শোনায়। তুমিও জানো, আমিও জানি পৃথিবীটা সত্যই কী? ক্ষিতি, অপ, মরু, তেজ, ব্যোম। আর্থ, ফায়ার, ওয়াটার। মাটি থেকে উঠে মাটিতে ফিরে যাওয়া। চিতায় চাপব, চড়বড় করে পুড়ে যাব। দেয়ালের দিকে তাকাও, ছবিটা নজরে পড়ছে?
