শপথ গ্রহণের পর চায়ের আসর বসল। এইটাই নিয়ম। রাজ্যপাল তাঁর নতুন মন্ত্রিসভাকে চা, পেস্ট্রি খাওয়ান। আমার কোলিগদের একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলুম যে, এই সব জায়গায় অসভ্যের মতো গপগপ করে খেতে নেই। ওরা সেই ভুলটাই করল। যে যা পারল একেবারে। হামলে পড়ে খেতে শুরু করল। বিদেশি অভ্যাগতরা হাঁ করে দেখছেন। কী লজ্জার কথা!
যাক বেশিক্ষণ আর ভাবার অবসর পেলুম না। টিভি, রেডিও, সংবাদপত্রের রিপোর্টাররা একেবারে ছেকে ধরলেন। স্নানগ্লাসের চড়া আলো। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। কোনওদিকে আর মুখ। ঘোরাবার উপায় নেই। যেদিকেই তাকাচ্ছি ফটাফট মারছে। এরই মাঝে রাজ্যপালের সঙ্গে অল্প একটু আলোচনা করে নিলুম। মনে হল তিনি বেশ চিন্তিত। রাজ্যের ভবিষ্যৎ কী হবে!
ভবিষ্যৎ কী হবে মানে? অতীতটা কি খুব ভালো ছিল? যা বলবেন ভেবেচিন্তে বলুন। শুরুতেই কেন্দ্রের কণ্ঠস্বর! হিজ মাস্টারস ভয়েস।
রাজ্যপাল গম্ভীর মুখে বললেন, এই ভয়টাই করেছিলুম। রাজ্যপালের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম আছে। সেইটা আপনাকে শিখতে হবে। কাগজের স্টেটমেন্টে যা খুশি বলুন। ওটা স্টেট বিজনেসের একটা চাল। জনসাধারণের সামনে নানা ইস্যু রাখতেই হয়। ইস্যু হল ললিপপ। ছেলে কাঁদলে মা যেমন মুখে স্তন গুঁজে দেন। কিন্তু এখানে আমার কাছে যখন আসবেন, তখন আমরা হলুম রাজার জাত। আমাদের কথায় কোনও বিষয় থাকবে না। ঝাঁঝ থাকবে না। শ্লেষ থাকবে না। অর্থবোধক অথবা অনর্থবোধক কিছু শব্দ নিয়ে লোফালুফি। আপনি সব সময় মনে রাখবেন, আমরা নিমিত্তমাত্র।
আপনি কি আমাকে শিক্ষা দিচ্ছেন?
দিতে হচ্ছে। কারণ আপনি নভিস। পার্লামেন্টের ডেমোক্রেসির কিছুই জানেন না। ইউ আর টু লার্ন মেনি থিংস।
আমার কী বলা উচিত ছিল?
আপনার খুব থিয়োরেটিক্যাল কথা বলা উচিত ছিল। পরীক্ষার প্রশ্নোত্তরের মতো। যেমন, পাওয়ার আমাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। আনএমপ্লয়মেন্ট নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। ট্রান্সপোর্ট আমরা টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। ডু ইউ ফলো?
আমরা টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিতেই তো আছি।
ফিজিক্যালি, মেটিরিয়ালি পড়ে আছি সেভেনটিনথ কি এইটিনথ সেঞ্চুরিতে। আমাদের গ্রামে এখনও জোনাকিই বিদ্যুৎ। টোটকাই একমাত্র চিকিৎসা। দিল্লি আর বোম্বাই কোনওরকমে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি ক্রস করেছে।
রাজ্যপালের আলাদা একটা আভিজাত্য। বেশ বুঝলুম এই আভিজাত্যে আমার খামতি আছে। মাথা নীচু করে দরবার হল থেকে বেরিয়ে এলুম। আমার স্ত্রী কেবল বলতে লাগল, হ্যাঁ গো, রাজ্যপাল তোমাকে ধমকালেন? ধমকধামক দিলেন!
আমি কথা বলতে পারছিনা। গোটাছয়েক মাইক্রোফোন আমার ঠোঁটের সামনে। আমি চলেছি, মাইক্রোফোনও পাশে পাশে চলেছে। আমার স্ত্রী-র কোমরে এক থাক চর্বি জমেছে। সেটা সুখের না অসুখের বলতে পারব না। বাঁ হাত বাড়িয়ে কটাস করে চিমটি কেটে দিলুম। বোকা, তোমার বুদ্ধি নেই। যা বলছ, সব যে টেপ হয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে!
সাংবাদিকদের হাত থেকে সহজে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। আজকাল আবার মেয়েরা। সাংবাদিকতায় এসেছেন। তাঁদের আবার ঠেলে সরানো যাবে না। ইংরেজি কাগজের এইরকম একজন সাংবাদিক প্রশ্ন নিয়ে ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, আপনি কি এই মিনিস্ট্রি রাখতে পারবেন?
চান করে রক্ত উঠে গেল মাথায়! জিনস পরা ছুকরি বলে কী! বেশ একটু রেগেই বললুম, পারব না কেন?
বড় বেশি জোড়াতালি তো। আর সবাই আনকোরা নতুন। একেবারে নভিস।
কম্পিউটার কি বলেছে জানেন? এইটাই এ রাজ্যের শেষ মিনিস্ট্রি। শেষ কথা। লাস্ট ওয়ার্ডস।
কম্পিউটার তো আর দেশ চালাবে না।
দেশ আমরাই চালাব। লেটেস্ট ম্যানেজমেন্ট টেকনিকে।
একটু এক্সপ্লেন করবেন?
আমার নিজের ধারণা খুব একটা পরিষ্কার নয়। মডেলটা দিল্লি থেকে ধার করব। প্রয়োজন হলে আমেরিকা চলে যাব। তবে আমার নিজস্ব প্ল্যান হল দেশটাকে বিভিন্ন ফ্যাকালটির হাতে তুলে দেব। ব্যবসা বড়বাজার দেখবে। শিল্প শিল্পীরা দেখবেন। শিক্ষা শিক্ষকরা দেখবেন। কৃষি কৃষকরা দেখবেন। পুরো দেখাশোনার ব্যাপারটা কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেব। মাসে মাসে আমরা একটা মাসোহারা পাব। আমরা আমাদের বখরাটা বুঝে নেব। আমাদের স্লেট আমরা। পরিষ্কার রাখব। কাউকে বলতে দেব না যে, তোমরা এই করলে না, ওই করলে না। যার হ্যাপা সে সামলাক, আমাদের কাঁচকলা।
নির্বাচন জিতলেন কী করে?
নেগেটিভ ভোটে।
পরের বার ফিরে আসছেন কি?
পরের কথা পরে। পাঁচ বছরে আমরা সবাই সমানভাবে গুছিয়ে নেব। গাড়িতে উঠে পড়লুম। পরের দিন কাগজের হেডলাইন দেখে স্তম্ভিত। ব্যানার হেডলাইন, নতুন মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ। মুখ্যমন্ত্রীকে রাজ্যপালের তিরস্কার।
শ্যামলীকে ডেকে দেখালুম, তোমার কাণ্ড দেখে যাও। তোমার জন্যে প্রথম দিনেই বিশাল হোঁচট। অক্ষরের সাইজ দেখেছ। বিয়াল্লিশ কি বাহাত্তর পয়েন্টের এক একটা ঢ্যালা ছুড়ে। মেরেছে। এখন থেকে জেনে রাখো, আমরা সাধারণ ভাত-ডাল খাওয়া মানুষ নই। আমি মুখা, তুমি স্ত্রী মুখা। এক নম্বর নাগরিক আমরা। ফিলমস্টার আর পলিটিক্যাল স্টারে কোনও তফাত নেই। আমরা যা বলব, যা করব সবই সংবাদ হয়ে কাগজে বেরিয়ে যাবে। জানবে, দেয়াল আর দেয়াল নয়। বিশাল চারটে কান। রাস্তা আর রাস্তা নয়, ক্যামেরার লম্বা চোখ। সেই কারণে কথা বলবে না। কোনও কিছু করবে না। এখন থেকে আমাদের আদর্শ হবেন শ্রীজগন্নাথ। এ বাড়ি, ও বাড়ি ওই আগের মতো, দিদি কী রান্না হল, দিদি কী সিনেমা দেখা হল, ছেলের রেজাল্ট বেরোবে করে—এইসব একদম করবে না। এই অভ্যাসটা তোমার চিরকালের। লাটাইয়ের সুতোর মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখবে সব সময়। সব কথার এমন উত্তর দেবে, যেন দু-রকম মানে হয়, কি কোনও মানেই হয় না।
