পাশেই বসে আছে আমার বউ। দশ বছর আগের সেই ঘরোয়ালি চেহারা আর নেই। সাতদিনেই পালটে গেছে। ইন ফ্যাক্ট আমি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারি শুনেই, শরীরটাকে এক্সপার্টদের হাতে ফেলে দিয়েছিল। দে হ্যাভ ডান এ গুড জব। ভালো হাতের কাজ দেখিয়েছে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত
এমন একটা ব্যাপার করে দিয়েছে, আড়চোখে তাকালে মনে হচ্ছে পরস্ত্রী। কেন্দ্রের মতো চেহারা করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে, কেন্দ্রীয় স্ত্রী। এত কাল কোমরে আঁচল জড়িয়ে বলে এসেছে, ভাত দেওয়া হয়েছে, খাবে এসো। পরশু দুপুর থেকে বলতে শুরু করেছে, লাঞ্চ করবে এসো। কুঁচিয়ে পরা শাড়ি। ববকাট চুল। হাতকাটা ব্লাউজ। জিনিসটা দেখার মতোই হয়েছে। সংস্কার করলে সব বস্তুতেই চেকনাই আসে। পেতলের পিলসুজ আর কি!
রাজভবনের মোরাম বিছানো পথে মশমশ শব্দ তুলে আমার কালো অ্যামবাসাডার দরবার হলের সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুধারে দুসার আমার ক্যাবিনেট কোলিগস। শব্দটা ইংরেজি কাগজ পড়ে শিখেছি। সকলকেই আজ কেমন সম্মানিত দেখাচ্ছে! ভেরি রেসপেকটেবল। অথচ বছর দুয়েক আগেও এলাইটস অফ দি সোসাইটি এদের দেখে মুখ বাঁকাত। বলত, স্কামস অফ দি আর্থ। জমানা বদলে গেছে। এর জন্যে আমার পূর্ব পূর্ব পূর্ব নেতাদের ধন্যবাদ। একেবারে সমতল করে দিয়ে গেছেন সব। উঁচু-নীচু বলে আর কিছু নেই। সমাজ এখন ফ্ল্যাট চেস্টেড ওম্যানের মতো।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন আমার স্ত্রী। আগে খুব ইংরেজি সিনেমা দেখতুম। মনে হচ্ছে শিফনের শাড়ি পরা সোফিয়া লোরেন। দোলা লাগিয়ে দেবার মতো যৌবন এখনও আছে। গাড়ি থেকে নেমে কলিগদের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল, কজন মুখ্যমন্ত্রীর এমন স্ত্রী আছে! খুব সামলে নিলুম। প্রতিদিন নদীর জলের মতো আমার স্ট্যাটাস বাড়ছে। কাল যা ছিলুম, আজ আর তা নেই। চিন্তা, ভাবনা, কথা, সবকিছুতেই চেক ভালভ পরাতে হয়েছে।
সারিবদ্ধ মন্ত্রিসভার সদস্যরা আমাকে অভিবাদন জানালেন। কাল রাতে এদের নানাভাবে ট্রেনিং দিয়েছি। ভিডিও আনিয়ে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখিয়েছি। নিজে দেখেছি। আমারও তো তেমন। কিছু জানা নেই। বাপের পয়সা ছিল। ছাত্রজীবনটা কলেজ চেখে চেখে কাটিয়ে দিয়েছি। এক। সুন্দরী অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের সঙ্গ পাব বলে কিছুকাল স্পোকেন ইংলিশ শিখেছিলুম। যে কলেজেই গেছি সেই কলেজেই ছাত্র-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। ছাত্র-আন্দোলনের ইতিহাস লেখা হলে দেখা যাবে, অনেকটা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার মতো। তিনটি পর্ব—আদি, মধ্য, অন্ত। আদিপর্বে গেট বক্তৃতা, পোস্টারিং। মধ্যপর্বে ঘেরাও, ধর্মঘট। তারপর মানুষের অন্তিম দশার মতো। বোম, ছুরি, ভাঙচুর, মাঠময়দান।
যাক অতীত এখন থাক। এখন আমার রেলার সময়। পূর্ববর্তী মুখ্যমন্ত্রীর মডেলই আমি অনুসরণ করব। তিনিই আমার গুরু। অমন সফল একজন মুখ্যমন্ত্রী তো এর আগে এ দেশে আসেননি। অদ্ভুত একটা পার্সোনালিটি ছিল তাঁর। হাঁটা-চলা, কথা বলা। তাঁর গুণের কথা বলতে গিয়ে। সাংবাদিকরা একটা কথাই বারে বারে বলতেন, ভদ্রলোকের মুখে কেউ কখনও হাসি দেখেনি। গত তিনদিন আমি একবারও হাসিনি। এখন আমার এমন আত্মবিশ্বাস এসে গেছে, কেউ কাতুকুতু দিলেও হাসব না। আমার স্ত্রী এই যে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে, হাই হিল সামলাতে না পেরে উলটে পড়ে গেলেও হাসব না।
আমার পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রীর মতো, এক হাতে কোঁচা ধরে আমি গটগট করে ওপরে উঠে এলুম। বিলিতি আমলের বাড়ি, তার কেতাই আলাদা। আগে কখনও আসিনি। না এলেও ভয় করছে না একটুও। দুপাশে সার সার পামগাছের টব। লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে সোজা দরবার হলে। ঝাড়লণ্ঠন জ্বলছে। বিশিষ্ট অভ্যাগতরা বসে আছেন। বিদেশি কনস্যুলেটের প্রতিনিধিরা এসেছেন। ব্যাপারটা প্রায় রাজসভারই মতো।
গলিত এক বৃদ্ধ। তিনিই রাজ্যপাল। আমাদের দেশের নিয়ম অনুসারে রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতি এইরকমই হবেন। গেল গেল গেল গেল, রইল রইল করে এক একটা দিন যাবে। কবিরাজি, হেকিমি, অ্যালোপ্যাথি, টোটকা করে ছাগল দুধ, গরুর দুধ করে টিকে থাকা।
মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিলাম ইংরেজিতে। উপায় নেই। এই রাজ্যে, এই রাজ্যের মানুষ রাজ্যপাল হবেন, এমন আশা করাটাই অন্যায়। সেটা হবে প্রাদেশিকতা, বিচ্ছিন্নতা, সঙ্কীর্ণতা, একদেশদর্শিতা, দেশদ্রোহিতা। গোর্খারা গোর্খাল্যান্ড চাইতে পারে, অসমীয়ারা আসাম চাইতে পারে, নাগারা নাগাল্যান্ড চাইতে পারে, তামিলনাড়ু অন্য ভাষার মাতব্বরি না মানতে পারে। অন্য প্রদেশের ব্যবসায়ীদের অর্থনীতি কবজা করতে না-ও দিতে পারে; আমাদের তা চলবে না। আমরা আন্তর্জাতিক। বুক পেতে দাও নেচে যাই।
একে একে আমার মন্ত্রিসভার সদস্যরা সব শপথ নিল। দু-একজন একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এত করে তালিম দিয়ে নিয়ে এলুম, তাও ঠিক শেষ মুহূর্তে নার্ভাস হয়ে গেল। কিছুতেই বোঝাতে পারলুম না, দেশ শাসন করার মধ্যে হাতি-ঘোড়া কিছু নেই। শাসন আবার কী? সে ছিল ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশরা চলে গেছে, শাসনের কালও শেষ হয়ে গেছে। আমরা স্বাধীন, স্বাধীন দেশে শাসন থাকবে কেন? যার যার তার তার ব্যাপার। লড়ে যাও। শাসন নয়, বিজনেস। ইংরেজি কোটেশন দিয়ে বুঝিয়েছিলুম, দি স্টেট ইজ এ বিজনেস। কিছু দাও। কিছু নাও। যাক অনুষ্ঠান শেষ হোক, তখন আর একবার ভালো করে বোঝাতে হবে।
