ছেলেবেলার কল্পনার সঙ্গে যেসব বই জড়িয়ে আছে, তা মন থেকে আজও ঝেড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। যৌবনে মন যখন উড়ু উড়ু, সদা সর্বদাই যখন দখিনা বাতাস বইছে, তখন ধরা পড়লে ‘পথের পাঁচালী’, নয় ‘আরণ্যক’। সেই লবটুলিয়া, বৃক্ষ, বনজ্যোৎস্না। বিভূতিভূষণের প্রেমে পড়ে। গেলুম। তাঁর লেখা সব বই পড়তে হবে। পাই কোথায়! তখনও ছাত্র। টাকাপয়সার বড়ই অভাব। আমাদের এক দাদাস্থানীয় ব্যক্তির বাড়িতে বেশকিছু বই ছিল। ছোটদের, বড়দের। সেই বইয়ের র্যাক থেকে একখণ্ড ‘পথের পাঁচালী’ আবিষ্কার করলুম। মলাট নেই। ছিঁড়ে-খুঁড়ে গেছে। তা। হোক। সেই বয়সে, সে যেন আমার আমেরিকা আবিষ্কার। বইটা বাড়িতে এনে সাবধানে পড়ে ফেললুম। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এক-একটি পরিচ্ছেদের এক-একটি নাম—আম আঁটির ভেঁপু, বল্লালি বালাই। অপুকে যে অনুচ্ছেদটি পণ্ডিতমশাই তিলিখন লিখতে দিচ্ছেন—’এই সেই গিরিস্থান মধ্যবর্তী জনপদ’, সেই অনুচ্ছেদটি আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। দুপুরে চোখ বুজলেই যেন দেখতে পেতুম, নিশ্চিন্দিপুরের মাঠে অপু আর দুর্গা ছুটছে। ইন্দির ঠাকরুন ছেঁড়া মাদুর বগলে গ্রামের হাটতলা দিয়ে চলেছেন। উনুনের ছাইগাদায় বেড়াল বাচ্চা দিয়েছে রাতে। ভোরে অপুর সঙ্গে আমিও যেন শুনতে পাচ্ছি নবজাতকের মিউ মিউ ডাক। বইটাকে মেরে দেবার তালে ছিলুম। ওদিক থেকেও বইটির জন্যে তেমন কোনও তাগিদ ছিল না। ভাবলুম ছেঁড়া-খোঁড়া বই তো, দাদা আমার বেমালুম ভুলে গেছেন। বইটা আমার হয়েই গেছে ভেবে, পয়সা খরচা করে বাঁধিয়ে আনলুম। বাঁধিয়ে আনার পর বইটা পড়তে আরও যেন ভালো লাগল। পাঁচ বছর পর। দাদা একদিন আমার বাড়িতে এলেন বেড়াতে। আমাদের বাড়িতে তাঁর প্রথম পদার্পণের আনন্দে আত্মহারা হয়ে চা-জলখাবারের ব্যবস্থার জন্যে ছোটাছুটি করছি, সেই ফাঁকে দাদা আমার বইয়ের রাক থেকে সযত্নে বাঁধানো ‘পথের পাঁচালী’টি টেনে বের করেছেন। আমি জলখাবারের প্লেট হাতে ঘরে ঢুকতেই বললেন, ‘আরে এই তো আমার সেই বইটা! বাঃ বাঁধিয়ে-টাধিয়ে কী সুন্দর। করেছ! থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ।’
আমার মনে হচ্ছিল খাবারের প্লেটটা নিয়ে চলে যাই। সে অভদ্রতা আর করা গেল না। চামড়ার বাঁধাই ‘পথের পাঁচালী’, স্পাইনে সোনার জলে নাম লেখা। দাদা আমার গরম সিঙাড়া খেতে খেতে বললেন, ‘বই শুধু পড়লেই হয় না, যত্নও করতে হয়। তোমার যত্ন দেখে খুবই ভালো। লাগল। আমার ভেঁড়া-খোঁড়া বইটাকে তুমি কী সুন্দর করেছ। কেবল একটা ভুল তুমি করে। ফেলেছ, নিজের নামটা লিখে ফেলেছ। খেয়াল ছিল না বুঝি? যাক, ও পেট্রল দিয়ে ঘষে দিলেই উঠে যাবে।’ খেয়েদেয়ে, মুখ মুছে, তিনি উঠে গেলেন বইয়ের র্যাকের কাছে। এ বই টানেন, ও বই টানেন। র্যাকের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, আমি মুখ গোঁজ করে বসে আছি আমার জায়গায়। বসে বসে ভাবছি, মলাটটা ছিঁড়ে নিতে পারলে মনে তবু একটু শান্তি পেতুম। ঘরের ও মাথা থেকে দাদা বললেন, ‘বুঝলে, চেনাজানা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখতে হয়। দেখতে দেখতে দু-একটা চোরাই বই এইভাবে বেরিয়ে আসে। জানো তো সব বাড়িতেই ফিফটি পারসেন্ট বই চুরির। তুমি কি আর কোথাও বই রাখো?’
‘কেন বলুন তো?’
‘আমার আর একটা বই, যোগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সোনার পাহাড়’, সেই বইটা কে মেরে দিয়েছে!
‘পথের পাঁচালী’ পুনরুদ্ধার করে আমার সেই দাদা চলে গেলেন। ভাগ্যিস, ‘সোনার পাহাড়’ বইটা চিলেকোঠায় রেখে এসেছিলুম।
একবার এক ভদ্রলোকের বসার ঘরের আলমারিতে অনেক ভালো ভালো বই সাজানো দেখে গৃহস্বামীকে অনুরোধ করলাম, ‘আলমারিটা একবার খুলবেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আজ তো খোলা যাবে না। চাবি আমার স্ত্রীর কাছে। তিনি দুর্গাপুরে চাকরি করেন। সপ্তাহে একবার আসেন, তখন খুলে ঝাড়-পোঁছ করা হয়।’ জিগ্যেস করলুম, ‘পড়েন কখন?’ বললেন, ‘ওগুলো ঠিক পড়ার বই নয়।’
এমনও দেখেছি, মাপ মিলিয়ে বই কেনা হচ্ছে। স্বামী স্ত্রীকে বলছেন, ‘আমার মনে হয়, খুকুর এই বইটা ফিট করবে।’ আমি পাশে ছিলুম। ভীষণ কৌতূহল হল। ফিট করবে মানে? বই কি জুতো? থাকতে না পেরে জিগ্যেস করলুম, ‘কোথায় ফিট করবেন?’ তখন জানা গেল, অর্ডার দিয়ে বুককেস তৈরি করিয়েছেন। ‘ফাস্ট তাকে, বুঝলেন, এই ইঞ্চি তিনেক ফাঁক আছে। মানে ভালো ভালো যাস্টকে ছিল ঢুকিয়েছি, জাস্ট তিন ইঞ্চি মাপের একটা পেলেই টাইট!’
আমি বললুম, ‘ইঞ্চি তিন মোটা মিনিমাম ষাট টাকা পড়ে যাবে। এখন বইয়ের দাম ইঞ্চি প্রতি কুড়ি টাকা যাচ্ছে। আপনি তার চেয়ে একটা গেঞ্জির বাক্স কিনে ঢুকিয়ে দিন। কম খরচে হয়ে যাবে।’
ব্যাপার তো ওইরকমই দাঁড়িয়েছে। বিয়ের উপহারের বই কিনতে ঢুকেছেন তিন বান্ধবী। কথা হচ্ছে, ‘কুড়ি টাকার মধ্যে একটা বই দিন তো!’ কুড়ির মধ্যে, পনেরোর মধ্যে, দশের মধ্যে। আজকাল আবার উপহার দেওয়া হয় ব্লকে। চল্লিশজনের ব্লক। পার হেড দশ। মোট চারশো। দে একটা টেবিল ফ্যান অথবা মিক্সার। বইয়ের কপাল পুড়েছে!
বিদেশে কেউ আর বই পড়বে না অদূর ভবিষ্যতে। টিভি দেখবে। আর ক্যাসেটে ক্লাসিক
সাহিত্যের পাঠ শুনবে। আমাদের দেশেও সেই দিন আসছে। বইয়ের ‘বুম’ চলছে, পাল্লা দিয়ে মানুষের অবসর সময় কমছে। এখন বই দিয়ে টেবিল ল্যাম্প উঁচু করা হয়। এর পর খাটের পায়ার তলায় বই দেওয়া হবে। যাক, পিতৃপুরুষের বই তবু একটা কাজে লাগল।
মসনদ
আমার কালো অ্যামবাসাডার গাড়ি রাজভবনে ঢুকছে। যখন গেটে প্রায় ঢুকে পড়েছি, তখন বুকটা ধক করে উঠল। ধরা যাক আর আধঘণ্টা। আর আধঘণ্টা পরে এই এতবড় একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাব আমি। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বার করে, আধখানা সরবিট্রেট জিভের তলায় ঢুকিয়ে দিলুম। দুম করে মরে না যাই! আজ থেকে দশ কি বিশ বছর আগে এই ভবিষ্যৎটা তো আমি দেখতে পাইনি! দেখতে পেলে তেলেভাজা একটু কম খেতুম। হার্টটা ভালো থাকত। কোলেস্টেরল এত বাড়ত না। তখন তো মনে হত, কবে নিবি মা! এখন মনে হয়, সহজে নিস নে মা। দেশের কাজ করতে দে মা। শুধু এলুম, আর হ্যা হ্যা করে চলে গেলুম সেটা কি ঠিক হবে! মহাপুরুষরা বলে গেছেন, দাগ রেখে যা, দাগ।
