একজন নেতার চোখে পথিবীটা হল ভোট আর ভোটারের। ভোটব্যাঙ্ক। রাজনীতির প্রোফেশনাল বক্তারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বক্তৃতা দেন—বন্ধুগণ! বিছানায় চিত, মাঝরাত, গভীর ঘুমে, সেই অবস্থাতেই মাঝে মাঝে ডিঙি মেরে উঠছেন, ইনকিলাব। স্ত্রী খুঁড়িতে চাপ মেরে দেহকে সমতল করতে করতে বলছেন—ওগো! এ তোমার কেলাব নয়, বাড়ি, বাড়ি!
চোখ হল ক্যামেরা। প্রতি মুহূর্তে ছবি তুলে পেছনের পর্দায় ফেলছে। সঙ্গে সঙ্গে উলটো ছবি। সোজা হচ্ছে। সাইকেল চেপে পিন্টু যাচ্ছে। মস্তিষ্কের অন্য সমস্ত কোষ থেকে এইবার খবর বা ভাটা আসতে লাগল, সেসব চোখে দেখার তথ্যের বাইরে। কিন্তু সেইসব তথ্য যুক্ত হয়ে পিন্টুর চেহারা বদলাচ্ছে। খুব উদ্যোগী। সঙ্গে সঙ্গে দেহটা ঋজু হয়ে গেল। চোখের দেখা পিন্টুর চোখ দুটো আরও উজ্জ্বল হল, নাকটা হয়ে গেল ধারালো। নিরহঙ্কারী, আলাপী। মুখে ফুটে উঠল অতি সুন্দর ঝলক। মস্তিষ্কের অদৃশ্য কোণ থেকে ক্ষরিত হল ভালোবাসা, আহা! পিন্টুর মতো ছেলেতে দেশটা যদি ভরে যেত!
একটু পরেই সাইকেলরিকশা চেপে রমা চলে গেল। কোলের ওপর লেডিজ ব্যাগ। তার ফিতেটা দু-হাঁটুর মাঝখান দিয়ে সামনে ঝুলে আছে। পেনসিল দিয়ে ভুরু এঁকেছে। ঠোঁটে একটু লিপস্টিক চার্জ করেছে। শাড়িটা দামি। আমার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে এই ছবির একটি সিদ্ধান্তই হত— সুন্দরী! মনোলোভা। কিন্তু এই ছবির পেছনে বসে আছে আমার সূক্ষ্ম মন। আহত মন। সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরী রমা রূপান্তরিত হল রাক্ষসী রমায়। সেজেগুঁজে সাইকেল-রিকশা চেপে কে গেল, একটা। পেতনি।
বিকাশ আমার বন্ধু। যতদিন আমার স্তরে ছিল ততদিন মনে হত, এমন বন্ধু আর হয় না। এমন একজনের জন্যে পৃথিবীতে বারে বারে আসা যায়। কলেজ শেষ করে আমি গেলুম চাকরিতে, বিকাশ গেল ব্যবসায়। কয়েক বছরের মধ্যে বড়লোক। বিকাশ বদলে গেল কি না জানি না। আমি বদলে গেলুম। আমার দেখা, আর সেই দর্শনের ব্যাখ্যা অন্যরকম হয়ে গেল। বিকাশ এখন বেশ মোটা! সঙ্গে সঙ্গে মন সাপ্লাই করলে, হবেই তো! বোতলে ঘটোৎকচই তৈরি হয়। বিকাশ। আগেও হা-হা করে হাসত। এখনও সেইভাবেই হাসে। আমার মন বলে, দু-নম্বরী টাকা থাকলে মানুষ ওই ভাবেই যাত্রার হাসি হাসে। কেউ বিকাশের প্রশংসা করলে আমি জ্বলে যাই। কারণ একটাই। বিকাশ পেরেছে, আমি পারিনি। আমি পারিনি বলেই বিকাশের পারাটাকে ঘৃণার চোখে দেখছি।
কত রকমের চোখ তাহলে আছে? প্রেমের চোখ, ঘৃণার চোখ, জ্ঞানের চোখ, লোভের চোখ, রাগের চোখ, কামের চোখ, অসহায়ের চোখ, আনন্দের চোখ, আত্মবিশ্বাসীর চোখ, খুনীর চোখ, আক্রান্তর চোখ, ভক্তের চোখ, যোগীর চোখ। একই চোখের কত ভাষা!
সবার ওপরে সন্দেহের চোখ। আমরা বাস করছি সন্দেহের যুগে। কেউ কারও মতলব বুঝতে পারছে না। প্রত্যেকের মনে অনুচ্চারিত প্রশ্ন, কী মতলব!
১। অনেকদিন পরে মনে হল যাই একবার দেখে আসি তোমরা সব কে কেমন আছ?
কী মতবল? (মনে মনে)
২। আমি আমার এত বছরের জীবনে অনেক মানুষ দেখলুম তোমার মতো একজনকেও দেখলুম না।
কী মতবল? (মনে মনে)
৩। কী, কেমন আছেন? সব ভালো তো! বউদি? সুগারের কী খবর?
সুগার রেশনের বাইরে। খোলাবাজারে মিলবে। বউদির বাত…।
না না, আপনার সুগার, বাজারের সুগার নয়।
আমার শরীরে সুগার নেই, সবটাই বিটার। কী চাই বলো তো!
ছেলেটা অনেকদিন বসে আছে, যা হয় একটা চাকরি করে দিন না!
মইয়ের বদলে বই
বাঘ যেমন মানুষ দেখলে খেপে যায়, যাঁরা বইয়ের নেশায় পড়েছেন, তাঁরা সেই রকম বই দেখলে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারেন না, হামলে পড়েন। ছেলের লেখাপড়া, মেয়ের বিয়ে, বউয়ের অপারেশন সব মাথায় উঠে যায়। বইয়ের এমন আকর্ষণ! মনে পড়ে প্রথম যখন অক্ষর। পরিচয় হল, সে কী আনন্দ! অ-এ অজগর আসছে তেড়ে। বানান করে করে যখন পড়তে শিখলুম, তখন মনে হল চারপাশ বন্ধ ঘরের জানলা খুলে গেল! এখন ভাবি পড়তে না শিখলে কী হত! মন জলাশয়ে পচে, দুর্গন্ধ হয়ে, জীবনেই মৃত করে দিত। এখনও মনে আছে ঈশপস ফেবলসের কথা। আমাদের ক্লাস সেভেনের পাঠ্য ছিল। জানুয়ারির এক শীতের রাতে, অন্যান্য পাঠ্য পুস্তকের সঙ্গে আমার বাবা ওই বইটি কিনে আনলেন। প্রকাশক-ম্যাকলিন। চকচকে পাতা, গোটা গোটা কালো অক্ষর, পাতায় পাতায় রঙিন ছবি। ঝুঁকে পড়ে, শুয়ে, বসে নানাভাবে দেখেও আশ আর মেটে না। হি হি করছে শীত। ঘরের ঠান্ডা লাল মেঝে যেন কামড়াতে আসছে। কোনও দৃকপাত নেই। আমি দেখছি সেই বুদ্ধিমান কাককে। ঠোঁটে করে পাথর তুলে তুলে কলসির মধ্যে ফেলছে। দেখছি সেই ধূর্ত শৃগালকে! দ্রাক্ষাফল অতিশয় টক বলে সে সরে পড়ছে। প্রথম দিনের প্রথম দেখা সেই ফেবলসের স্মৃতি আজও লেগে আছে মনে। এখন তো স্কুল থেকে। ইংরেজি বিদায় নিয়েছে। থাকলেও বইপত্র বদলে গেছে। ফেবলস আর পড়ানো হয় না। একালের পাঠ্যপুস্তক মানেই রদ্দি কাগজ, নিকৃষ্ট বাঁধাই, ভাঙা টাইপ, লাইনে লাইনে ছাপার ভুল।
আর একটু উঁচু ক্লাসে আর একটি বইও মনে গেঁথে আছে, ডিকেনসের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’। অক্সফোর্ডের বই। কোনও চাকচিক্য নেই, কিন্তু সুন্দর ইংরেজি, অপূর্ব কাহিনি। ভালো-মন্দ অসংখ্য চরিত্র। একটি কিশোরের জীবনকাহিনি। ‘উই আর রাফ বাট রেডি’ উক্তিটি আজও ভুলিনি। আমার সহপাঠী কেষ্ট অসাধারণ ছবি আঁকতে পারত। আমাদের স্কুলটা ছিল একেবারে গঙ্গার ধারে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। গঙ্গার ধারে একটা সুন্দর জেটি ছিল। সেই জেটির গায়ে বাঁধা থাকত ফেলে রেখে যাওয়া কিছু ফ্রিগেট আর ডেস্ট্রয়ার। বিকেলে জেটিতে। আমাদের জমায়েত হত। কেষ্ট লাফ মেরে চলে যেত ফ্রিগেটে। হাতে তার রংবেরং-এর চকখড়ি। সেই খড়ি দিয়ে কেবিনের গায়ে কেষ্ট আঁকত কপারফিল্ডের চরিত্র, মিস্টার ক্রিকল, লুসি পেগট।
