প্রতিমা বসে রইল, কী অসহায় সে ছবি।
প্রফেসর বাইরের ঘরে আর্তনাদ করছেন—যাক সব যাক জ্বলে যাক পুড়ে যাক।
বললাম—পুলিশে খবর দেওয়া উচিত।
আরও কত কথাই বললাম। কিন্তু প্রতিমা আর একটাও কথা বলেনি। জীবনের সেই শেষদিন সেই শেষ কথা।
এরপর কাহিনি হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। আজও প্রতিমা বেঁচে আছে। সে বেঁচে আছে কোনও এক কারার রুদ্ধ প্রাচীরের অন্তরালে। সে সুন্দর প্রতিমা নয়, দগ্ধ বীভৎস প্রতিমা। কাপড়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা তার ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে নিজেকে আইনের চোখে নির্দোষ প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা। পটাসিয়াম সায়ানাইডের খালি বাক্সটা তার হাতব্যাগ থেকে পুলিশ আবিষ্কার। করেছিল।
আমার নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে ভাবি, এই সেই প্রতিমা যাকে আমি ভালোবেসেছিলুম, অন্তর থেকে যাকে ভালোবাসি আজ। যাকে আমি ছাড়া কেউ ভালোবাসেনি, বাসতে পারে না, পারবেও না, আর কোনওদিন। আমার একান্ত প্রেমধন্য প্রতিমা। এই সেই প্রতিমা যাকে আমার একটি মুখের কথা আবার সমাজে ফিরিয়ে আনতে পারে, রক্ষা করতে পারে অসহ্য কারা নির্য্যাতন।
কিন্তু না।
তার জীবনের এই শোচনীয় পরিণতির জন্যে আমিই দায়ী থাকতে চাই। তীব্র অনুশোচনায় আমার অন্তর দগ্ধ হয়ে যাক। প্রতিমার স্লাল মুখখানি সর্বদা ভাসুক আমার চোখের সামনে।
রাতের নিদ্রা আমায় ত্যাগ করে যাক, যৌবন গেছে, যাক, যাক স্বাস্থ্য। মর্মপীড়ার অসহ্য দহনে আমার হৃদয় জ্বলুক সদা সর্বদা। আমার অপরাধ, আমার নৃশংসতা অহরহ আমাকে জর্জরিত। করুক, সেই তো হবে আমার সার্থক প্রেমবিলাস, সেই তো হবে আমার প্রেমের সার্থক রূপায়ণ।
মনে হয় যেন কতযুগ আগে জন্মেছি, বিস্মত কোনও এক শতাব্দীর কোলে। দিনগুলো অতিমন্থর সন্ধ্যার অন্ধকারে বেদনা আর স্মৃতির জগদ্দল পাথর বুক চেপে ধরে, চেতনা আচ্ছন্ন করে প্রতিমার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখশ্রী।
কী সে গভীর বেদনা, কী অসহ্য যন্ত্রণা। জানি স্বীকারে এখনই ঘটে সে যন্ত্রণার অবসান, কিন্তু যন্ত্রণাই প্রেম, যন্ত্রণা।
ভূমিকা-২
কতরকমের চোখ আছে? হরিণের মতো, পেঁচার মতো, গরুর মতো, শেয়ালের মতো। মনুষ্যেতর প্রাণীর চোখের সঙ্গে বুদ্ধিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষের চোখের উপমা। আবার উদ্ভিদ জগতের দুটি বস্তুর সঙ্গেও উপমিত হয়, যেমন পটলচেরা চোখ, আলুচেরা চোখ। সুন্দরীদের দখলে হরিণ এবং পটল। হরিণ নয়না। পটলচেরা চোখে বিপাশা যখন তাকায় ভূমিকম্পের মতো হৃঙ্কম্প সম্রাটের শিথিল হস্ত হইতে তরবারি খসিয়া পড়িল, তিনি বহুমূল্য পারস্যের গালিচার ওপর দিয়া চতুষ্পদ প্রাণীর মতো হামাগুড়ি দিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলেন। সুন্দরী, দেহি পদপল্লবমুদারম। তাঁহার ওইরূপ করুণ পরিণতি দেখিয়া, তাঁহার কুকুর শূন্য মসনদে আরোহণ করিয়া সরোষে চিৎকার জুড়িল। সভাসদবর্গ ছুটিয়া আসিলেন। সম্রাটের হীন অবস্থা দেখিয়া তাঁহারা সমস্বরে, তোবা! তোবা! করিয়া উঠিলেন। তাঁহারা কামই দেখলেন প্রেম দেখিতে পাইলেন না। এই সভাসদদের কারো চোখ পেঁচার মতো কারো চোখ ধূর্ত শেয়ালের মতো, কারো গরুর মতো।
চোখ খুলে দেখা। কী দেখা? চারপাশে যা ঘটছে, সেইসব ঘটনা দেখা। প্রকৃতি দেখা। জীবজগৎ দেখা। পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধবদের দেখা। চোখ দেখায়। মন তার ব্যাখ্যা করায়। মন বিচার করে। এক-একজনের মন এক-একরকম। সেই কারণে একই ঘটনা, একই দৃশ্যের ব্যাখ্যা। বিভিন্নরকম।
একটি সুন্দর গল্প আছে। মাঠের মাঝখানে একটি মাটির ঢিবি। পাশে পড়ে আছে পায়ে-চলা পথ। রাত বারোটা নাগাদ সেই পথে প্রথমে একজন মাতাল এল। সে অন্ধকারে ওই ঢিবিকে। দেখে ভাবলে, তারই মতো এক মাতাল। সে ঢিবিটাকে বললে—বাঃ ভাই! তোমার নেশা ধরে গেল, আর আমি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিছু পরেই এল এক চোর। সে ঢিবিটাকে দেখে বললে —বাঃ ভাই! আমি এখনও বাড়িই খুঁজে পেলুম না, আর তুমি বসে বসে বাক্স ভাঙছ! তারপরেই মাঠের ওই পথে এলেন এক সাধু। তিনি ঢিবিটাকে দেখে বললেন—শাবাশ ভাই! তোমার ধ্যান লেগে গেল, আর আমি এখনও বসতেই পারলুম না! যার যেমন মন, তার তেমন দর্শন! বাবা দেখছেন স্ত্রী, সন্তান দেখছে মা। একজন প্রকৃতিপ্রেমী শালের জঙ্গলে গিয়ে আনন্দে আত্মহারা।
ঋজু ঋজু গাছ সোজা আকাশের দিকে উঠে গেছে। পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ আর আকাশ। ঈশ্বরের শিল্পপ্রতিভা, কবির কবিতা। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এক বেদান্তবাদী সাধু। এসেছিলেন। তিনি মেঘ দেখে নাচতেন, ঝড়-বৃষ্টিতে খুব আনন্দ। হিমালয়ে এক সাধু ছিলেন। গুহাবাসী। দিনে একবার গুহার বাইরে এসে পাহাড় ঝরনা দেখতেন আর আনন্দে নাচতেন—এ কেয়া বানায়া! তাঁর কাছে একটি আয়নার কাচ ছিল। সেইটি তিনি নদী, পাহাড়, তুষার, ঝরনার দিকে ফিরিয়ে বলতেন, দেখো, দেখো। আবার ওই শালের জঙ্গলে কাঠের কারবারি কী। দেখবেন? টনটন কাঠ। লাখ-লাখ টাকা।
বাঘ হরিণ দেখে কবিতা লেখে না। তিরবেগে ছুটে গিয়ে ঘাড় কামড়ে ধরে। তার পৃথিবী সুন্দরের পৃথিবী নয়, মাংসের পৃথিবী। ক্ষুধার পৃথিবী। আবার শিকারির পৃথিবী হল বুলেটের পৃথিবী। খুনীর পৃথিবী ছুরির পৃথিবী। সার্জেনের পুথিবী অপারেশন টেবিলের। রাশি রাশি টিউমার, আলসার, অ্যাপেনডিক্স। ইটে বসে নরসুন্দর চামড়ায় ক্ষুর ঘষছে। তার পৃথিবী হল গাল, দাড়ি, মাথা, চুল। ধরো আর নামাও। পকেটমারের পৃথিবীতে শুধুই পকেট। মানুষ নয়, অজস্র পকেট আর সাইড ব্যাগ।
