প্রতিমা নচিকেতাকে নামিয়ে রেখে, আমার কাছে এগিয়ে এল—ভুল বুঝো না প্রকাশ, তুমি কি নচির মতোই ছেলেমানুষ? মুহূর্তে একটা আগুন জ্বলে উঠল ভিতরে—এগিয়ে আসা প্রতিমাকে; সজোরে ঠেলে দিলুম। পুরুষের সেই কঠিন ধাক্কায় প্রতিমা পড়ে গেল। খাটের কোণ লাগল কপালে। লাল রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা পলকে গড়িয়ে পড়ল তার শুভ্র গাল বেয়ে। কিন্তু মুখে লেগে রইল ক্ষীণ একফালি হাসি।
অসহ্য সে হাসির বিদ্যুৎ ধার। ছিটকে চলে গেলুম বাইরে। কানে এল নচিকেতার আর্তনাদ, দিদি, দিদি।
সে রাত কেটে গেল পথে পথে। অনুশোচনা আর আত্মগ্লানির কশাঘাতে কখন মনে এল এ জীবন শেষ করে দিই, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল আত্মপীড়ন আর অনুশোচনার মর্মপীড়ায় দগ্ধ হওয়াই ভালো। সেদিন এক ভিন্ন প্রকাশ, অভিশপ্ত প্রেতাত্মার মতো বারে বারে পাক খেল প্রতিমার বাড়ি ফিরে। শেষ রাতে প্রফেসার চিৎকার করে উঠলেন—জ্বলুক, জ্বলুক। পূর্ব দিগন্তে জ্বলে উঠল বিষুব সূর্য। জানলার ধারে দাঁড়ানো আহত প্রতিমার দিকে তাকানো সে উষার সম্ভব হল না।
অপরাধীর মতো, তার অলক্ষ্যে চলে গেলুম, পালিয়ে গেলুম।
সে দিন এল না ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে দিয়ে কোনও মধুর আত্মতৃপ্তি। সেন্টিমেন্টের সঙ্গে চলল বোঝাপোড়া। উদভ্রান্ত নিদ্রাহীন লাল চোখ মেলে দিবসের দগ্ধ পৃথিবীকে দেখলুম, দেখলুম। রাতের ক্ষণিক স্বপ্নবিলাস সেখানে রূঢ় ভাবে অবহেলিত। এ পৃথিবী সে রঙিন পৃথিবী নয়। এ। পৃথিবীতে আমার স্থান হতে পারে না। কঠিন বাস্তব ছাড়া এখানে কিছু নেই। অনেক দ্বন্দ্বের পর স্থির করলুম আজ আমার জীবনকে শেষ করে দেব, প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকবে প্রতিমার পদপ্রান্তে। সার্থক স্বপ্নবিলাসীর এই হবে অতি সার্থক বিদায় গ্রহণ।
সন্ধ্যা এল বেহুশ প্রফেসারের ফরাস ঘিরে। এ যেন কেমন মরা সন্ধ্যা। শীতের কুয়াশায় চারিপাশ ঝাপসা। পকেটে হাত দিয়ে অনুভব করে নিলুম পটাশিয়াম সায়ানাইডের ছোট্ট মোড়াটা। তারপর এসে দাঁড়ালুম প্রতিমার মুখোমুখি। কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা অসম্ভব উজ্জ্বল, রুগ্ন একখানি মুখ।
ক্ষমা করো।
প্রতিমা হাসল। হাত বাড়িয়ে আমার একখানি হাত চেপে ধরে।–কীসের জন্যে ক্ষমা?
নচিকেতা চিৎকার করে উঠল—দিদি আবার তুমি ওর সঙ্গে কথা বলছ। ও তোমাকে খুন করতে পারে।
প্রতিমা আমি অনুতপ্ত। আমায় আর একবার ক্ষমা করো। নচিকেতা চিৎকার করে উঠল—বেরিয়ে যাও তুমি। দিদির সঙ্গে তোমার কথা বলতে হবে না।
প্রতিমা থামিয়ে দিল—নচি চুপ কর।
আমাকে বলল—বোসো। সারারাত ঘুমোওনি কেন? পাগল।
আমি বসলুম মুখ নীচু করে। বসলুম প্রতিমার পাশে। আমার একটা হাত প্রতিমার গরম মুঠোয়। আর একটা হাত পকেটের মধ্যে, বিষ পুরিয়া স্পর্শ করে। সময় ঘনিয়ে আসছে। সত্যিই কি আজ জীবনের শেষ মধুর সন্ধ্যা।
নচিকেতা গজগজ করতে লাগল—তোমার কিছু মনে থাকে না দিদি। তুমি আবার প্রকাশদাকে ভালোবাসছ। যে তোমার মাথা ফাটাল কাল, আজই আবার তার সঙ্গে কথা বলছ। ওই লোকটা দেখছি যত নষ্টের গোড়া। ও না থাকলেই ভালো হত। আগে সন্ধ্যাবেলা তোমাতে আমাতে কত গল্প করতুম, কত বেড়াতুম, ও এসে সব মাটি করল।
ভাবলুম, আশ্চর্য, বিধাতার উপহাস, নচিকেতার হলুম আমি প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নচিকেতা। আমি চাই ও সরে যাক, ও চায় আমি যাই।
বিষ পুরিয়াটা জোর করে চেপে ধরলুমকে সরবে, আমি? আমি সরে যাব? বিদায় নেব? এই মধুর পৃথিবীর স্বপ্নবিলাস ছেড়ে।
প্রতিমা বলল কী ভাবছ। ও নিতান্ত ছোট। ও দিদি ছাড়া আর কিছুই জানে না।
ভাবলুম—আমি কিন্তু ওর চেয়ে অনেক কিছু জানি। জানি প্রেম, জানি অনুরাগ, চিনি জীবন।
প্রতিমা বলল—ওর কথায় যে রাগ করে সে পাগল।
নচিকেতা বলল—দিদি খাবে চলো।
প্রতিমা বলল—তুই খাবি চল আমি পরে খাব।
নচিকেতা ছিনিয়ে নিয়ে গেল প্রতিমাকে।
রাত বেড়ে চলল ধীরে ধীরে। আবার প্রতিমা এল, হাতে দুধের বাটিটা টেবিলের উপর রেখে সে চলে গেল। শুনলুম সে বলছে—নচি ঘরে দুধ আছে, লক্ষ্মী ছেলের মতো খাবে, খেয়ে শুয়ে পড়বে। শুনলুম নচি বলছে—তুমি ওকে যেতে বলো দিদি, ওকে আমার ভালো লাগে না।
মুহূর্তে জ্বলে উঠল অন্তর। তোমাকেও আমার ভালো লাগে নানচিকেতা। তুমি সরে দাঁড়াও, ছেড়ে দাও প্রতিমাকে। হঠাৎ খেলে গেল বিদ্যুৎ। দেখলুম সঙ্কল্প, তারই চকিত আলোকে পকেট থেকে হাত বেরিয়ে এল। বিষের পুরিয়া মিশে গেল দুধে। শুনলুম প্রতিমা বলছে, আর জ্বালাস নানচি, আর ভালো লাগে না।
নচিকেতা ঘরে এল ছোট্ট একফোঁটা ছেলে। দিদির মতোই ফুটফুটে সুন্দর। তাকাল আমার দিকে। ওইটুকু ছেলের চোখেও ঘৃণার দৃষ্টি। নচিকেতা দুধের বাটি তুলে ধরল ঠোঁটের আগায়। আমার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে। বিস্ময়ে আর্তনাদ করে উঠলুম—উঁহু—আমার আচ্ছন্ন দৃষ্টির সামনে দেখলুম নচিকেতার চোখ দুটো পাথর হয়ে গেল, তার ক্ষীণ কণ্ঠে শেষ আর্তনাদ উঠল—দিদি রে। আমার চেতনা যখন পরিষ্কার হল, তখন দেখলুম প্রাণহীন নচিকেতার দেহ কোলে নিয়ে প্রতিমা পাথরের মতো বসে আছে।
কী হল নচিকেতার? কী হয়েছে?
প্রতিমা হাসল, আশ্চর্য। স্পষ্ট একফালি হাসি। বলল—তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছে। এখন এসো।
আমি বললাম—আমার ইচ্ছা না তোমার ইচ্ছা। ভাইটাকে সরালে, অমন চাঁপাফুলের মতো ভাই।
