আমি তার সামনে দাঁড়াতেই সে চমকে উঠল, তারপর রুগ্ন একটুখানি হেসে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এল। শিশির ভেজা ঘাসের ওপর তার শুভ্র নগ্ন পা, কনকচাঁপার অঞ্জলিতে ভরে দিলুম। তার মাড়িয়ে যাওয়া আঙুলটা মুখে পুরে দিলুম, বললুম—
সেরে যাবে। তারপর বললুম—আমায় ক্ষমা করো। প্রতিমা ধীরে ধীরে আমার বুকে মাথা রাখল। হঠাৎ শেষ রাতের স্বপ্ন দেখে নচিকেতা ঘুমের ঘোরে চেঁচিয়ে উঠল—দিদি না, না।
প্রতিমা চমকে উঠল, গাঢ় গলায় বলল—আসি। তুমি যাও, ওই দেখো ভোর হল। এইবার সবাই জাগবে।
বললুম—জাগুক, আমি ভয় করি না। যারা জাগবে তারা কি জানবে আমরা আজ সারারাত জেগেছি, তারা কি জানবে কী ব্যথা আমাদের সারারাত দগ্ধ করেছে।
নচিকেতা ঘুম ভেঙে, ডাকতে লাগল—দিদি, দিদি। শেষের দিকে তার গলা ধরে এল।
আমি যাই। প্রতিমা মুহূর্তে চলে গেল। ভোরের পাখিরা সমস্বরে ডেকে উঠল। এল নতুন দিন।
দিন কেটে গেল সুখানুভূতির আমেজে। নেমে এল সন্ধ্যা, আর একটি মধুর সন্ধ্যা। বাইরে ঘরের সেই বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকা প্রফেসার। ফরাসের কোণে বই রেখে সেই ভিতরে চলে যাওয়া। সেই গালে হাত দিয়ে বসে থাকা প্রতিমা।
খাটের উপর বসে বসেনচিকেতা পড়ছে। আমাকে দেখেই প্রতিমা উঠে দাঁড়াল। গভীর উত্তেজনায় তার চোখদুটো চকচকে। সে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল—প্রকাশ, আর সহ্য হয় না। আর কতদিন চলবে এ অভিনয়। অভিনয় কবে বাস্তব হবে। তার হাত দুটো চেপে ধরে বললুম— কীসের অভিনয় প্রতিমা। আমার প্রেমকে কি তুমি অভিনয় মনে করো।
না, না তা নয়। এই মাতাল পিতার সৃষ্টিছাড়া সংসারে কর্তব্যনিষ্ঠার অভিনয়।
চুপ করে রইলুম। তার হাতের মুঠোয় আমার হাত দুটো নিষ্পেষিত হতে লাগল।
আমার জীবনে সাধ আছে, আছে স্বপ্ন। চলো প্রকাশ আমরা চলে যাই। পারবে না আমার ভার নিতে?
কেন পারব না প্রতিমা, আমার সুস্থ সবল দেহ আর অন্তরভরা ভালোবাসা সবই তো তোমার পূজার অর্ঘ।
হঠাৎ নচিকেতা খাট থেকে নেমে এল। পড়ে রইল তার ছবির বই।
কোথায় যাবে দিদি। তুমি আর প্রকাশদা? প্রতিমা উত্তর দিল—সে এক জায়গায়। আমাকে নিয়ে যাবে না?
সেখানে তোমাকে যেতে নেই।
আমাকে ফেলে যেও না দিদি। নচিকেতা তার দিদির কোমর জড়িয়ে ধরল।
না যাবে না। তোমার জন্য সারাদিন বসে থাকবে আর তোমার দুরন্তপনা সইবে।
বা-রে তো আজ সারাদিন তোমার সঙ্গে কাজ করেছি। লক্ষ্মী হয়ে থেকেছি।
দিদি তুমি ছাড়া আমায় যে কেউ ভালোবাসে না। নচিকেতা দিদির মুখের পানে সজল চোখ দুটো তুলে ধরল।
আমি বললুম—চলো প্রতিমা ছাতে যাই।
প্রতিমা বলল—চলো। নচিকেতা দৌড়ে গিয়ে তার ছবির বইটা তুলে রেখে এসে আমাদের সঙ্গ নিল।
জিগ্যেস করলুম কোথায় যাবে?
বলল—ছাতে।
বললুম–না, তুমি বসে বসে পড়ো। ছাতে যায় না।
না, যায় না! নিশ্চই যাব। আমি আমার দিদির সঙ্গে যাব, তোমার কী।
যাও, পড়োগে যাও, যা বলি শোনো।
তুমি যাও।
প্রতিমা এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে নচিকেতার গালে সজোরে এক চড় মারল।
বাঁদর ছেলে, মুখে মুখে জবাব। যা পড়গে। নচিকেতা হঠাৎ চড় খেয়ে কী রকম হতভম্ব হয়ে গেল। একটুও কাঁদল না। অসহ্য অভিমানে তার চোখ দুটো ছলছল করতে লাগল, নিশ্বাস পড়তে লাগল জোরে জোরে। সে ফিরে গেল। বালিশে মুখ ঢেকে, উপুড় হয়ে রইল। ফুলে ফুলে উঠতে লাগল, রুদ্ধ কান্নায়।
‘চলো’—প্রতিমা এগিয়ে গেল। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে, দুজনে এসে উঠলুম, আলোকোজ্জ্বল ছাতে। চাঁদ হাসছে মাথার উপর। চারিদিকে থমথম করছে শান্ত জনপদের ছবি। দূরে, বহুদূরে, করুণ সুরে বেহালা বাজাচ্ছে, তারি রেশ ভেসে আসছে হাওয়ার ওঠা-পড়ায়।
হঠাৎ ফিরে দেখি প্রতিমা কাঁদছে হু হু করে জল গড়াচ্ছে তার দু-গাল বেয়ে। তার কাঁধে ধীরে ধীরে হাত রেখে জিগ্যেস করলুম—কেন কাঁদছ প্রতিমা। তাকে টেনে নিলুম বুকের মাঝে, কিন্তু সে একটুখানি স্থির থেকেই নিজেকে মুক্ত করে নিল।
বলল—আমি নীচে যাই, আমি যাই। নচিকেতার গভীর স্নেহ তাকে আকর্ষণ করে নিয়ে গেল। প্রকাশের প্রেম তাকে রাখতে পারল না অনুরাগের বাহুবন্ধনে।
এ প্রেমে উত্তাপ আছে কিন্তু নেই আকর্ষণ, নেই সব ভুলিয়ে দেওয়া ক্ষমতা। এক শিষ রজনীগন্ধা, মৃদু বাতাসে মাথা দোলাতে লাগল। যেন বলতে চাইল নেই, সে নেই।
হঠাৎ প্রশ্ন জাগল মনে, আমার প্রেমের কি কোনও গভীরতা নেই। যে প্রেমে প্রতিমা সম্পূর্ণ ডুবে যেতে পারে। পারে সব ভুলে যেতে। এসেছে সেই পরীক্ষার সময়। ক্রুর হৃদয় জেগে উঠল, কোমলতাকে ছাপিয়ে। মুহূর্তে রজনীগন্ধা ফুলগুলোকে তুলে, ছিঁড়ে ছড়িয়ে দিলুম চারপাশে। অনুরাগের সাক্ষীকে, বিরাগের ব্যঙ্গকারী রূপে দেখতে চাই না। এলোমেলো হাওয়ায় পাপড়িগুলো ছড়িয়ে গেল চারপাশে।
নীচে নেমে গেলুম। প্রতিমার বুকে মাথা গুঁজে নচিকেতা দিন ও দীর্ঘদিন তারই কোলে বসে আছে। প্রতিমা তার মাথার চুলের ভিতর ধীরে ধীরে আঙুল চালাচ্ছে।
আমি বললুম-চলো প্রতিমা, গঙ্গার ধারে বেরিয়ে আসি। প্রতিমা করুণ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—কিন্তু নচি।
ও থাক, ও বাড়িতেই থাক না। বসে বসে পড়ুক। নচিকেতাদু-হাত দিয়ে প্রতিমাকে জাপটে ধরল।
চলো।
প্রতিমা আবার চাইল। এ প্রস্তাব যে রাখা সম্ভব নয় তারই লিখন সে-মুখে। বললাম—সত্যই যদি আমাকে ভালোবাসো তাহলে আমার কথা তুমি আজ রাখবে।
