ঘরের একপাশে খাট। খাটের ওপর ছোট্ট-নচিকেতা ঘুমোচ্ছে! নচিকেতা প্রতিমার ভাই। মাতৃহারা ছেলেটি দিদির স্নেহে মানুষ হচ্ছে। খাটের একপাশে বসতে যাচ্ছিলুম। প্রতিমা বারণ করল—বোসোনা, ও জেগে উঠবে। তার চেয়ে চলো আমরা ছাতে যাই।
ছোট্ট কাঠের সিঁড়ি বেয়ে খুঁড়ি মেরে আমরা ছাদে উঠতে লাগলুম। প্রতিমা আগে আগে, আমি তার পিছে পিছে। কী সুন্দর লাগছিল। কী একটা সুন্দর মিষ্টি গন্ধ। কী সব পুলকিত স্পর্শ।
ঝাপসা চাঁদের আলোয় আলোয় চারিপাশ ধোঁয়াটে। দূরে দূরে গাছের জটলা নিঃশব্দ প্রহরীর মতো রাতের অভিসার লক্ষ করছে।
জলের ট্যাঙ্কের পাশে, প্রতিমার নিজের হাতে পোতা ছোট্ট রজনীগন্ধার একগুচ্ছ ফুল। তারই পাশে আমাদের বসে থাকা। পরস্পরের নিঃশব্দ অবস্থিতি। বসে বসে ভাবি প্রতিমা আমায়। ভালোবাসে। আমি কৃতজ্ঞ। হঠাৎ কী মনে হল, হেলান দিয়ে বসে থাকা প্রতিমার সুন্দর পা দুখানার ওপর মুখ ঘষতে লাগলুম। প্রতিমা বাধা দিল,—ও কী করো, পাগলামি রাখো।
বললুম—না বাধা দিও না। আমি তোমায় ভালোবাসি। কিন্তু সে ভালোবাসা আমি তোমার কাছে কেমন করে প্রকাশ করব।
শুধু প্রতিশ্রুতি দাও তুমি আমাকে ভালোবাসবে, মনে রাখবে চিরকাল।
প্রতিমা বলল-বলো তুমিও আমায় মনে রাখবে অনন্তকাল।
বললুম-অনন্তকাল কেন, তোমাকে ভালোবেসে আমি তোমার সত্তায় লীন হয়ে যেতে চাই। আশ্বাস দাও, তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসবে না।
হঠাৎ নচিকেতা এসে, ‘দিদি’, বলে পেছন দিক থেকে প্রতিমার গলা জড়িয়ে ধরল।
তারপর আমাকে দেখে প্রশ্ন করল—দিদি, প্রকাশদার কী হয়েছে? তুমি বকেছ? তাই পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছে।
প্রতিমা হেসে বলল—হ্যাঁরে, খুব বকেছি। ভারি দুষ্টু কিনা,–
আমার চে। নচিকেতা একগাল হেসে জিগ্যেস করল।
প্রতিমা বলল—হ্যাঁ তোমার চেয়েও। তুমি প্রকাশদাকে ভালোবাসো না?
হ্যাঁ
আমাকে বাসো না?
হ্যাঁ।
কাকে বেশি বাসো, ছোদ্দি।
প্রতিমা হেসে পালটা প্রশ্ন করল—তুই বল না।
আমাকে। নচিকেতা বুক চাপড়ে জানাল।
আমি এতক্ষণ প্রতিমার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলুম। নচিকেতা আমায় ঠেলা দিয়ে জিগ্যেস করল, প্রকাশদা তোমার ঘুম পেয়েছে। চলোনীচে শোবে চলো। দিদির কাপড়ে তোমার মাথার তেল লেগে যাবে। দিদির কষ্ট হবে।
আমি বললুম—তুমি নীচে যাও। তোমার ঠান্ডা লাগবে। আমি আর তোমার দিদি পরে যাব।
নচিকেতা প্রতিমার আর একপাশে ঘন হয়ে বসে বলল—তুমি নীচে যাও। আমি ছোদ্দির কাছে থাকব।
প্রতিমার নরম কোলে মাথা রেখে ভাবছিলুম:নচিকেতা আজ যদি না থাকত। যদি এই পৃথিবীর মাটিতে ওর পদস্পর্শ না পড়ত, তা হলে আজকের এই রাত আরও কত সুন্দর হয়ে উঠত। এই নিভৃত অবসরে গোপন হৃদয়ের দ্বার খুলে দিতুম প্রতিমার সামনে, কত ভাব আর কত ভাষায়। ভরে দিতুম তার হৃদয়।
নচিকেতা আমায় খোঁচাতে লাগল—ওঠো না, তোমার কি কোনও কাজ নেই।
তুমি খালি শুয়ে থাকো। দিদির যে লাগছে। তুমি নীচে আমার বিছানায় শোওগে যাও।
প্রতিমা বলল—প্রকাশচলোনীচে যাই। নচিকে খেতে দিতে হবে।
উঠে দাঁড়ালুম। দাঁড়ানো মাত্রই নচিকেতা, প্রতিমার কোলে শুয়ে পড়ল।
তুমি নীচে যাও, ঠান্ডা লাগবে তোমার। আমি আর দিদি পরে যাব।
নচিকেতা গম্ভীর গলায় বলল। প্রতিমা হেসে আদর করে বলল—দুষ্টু ছেলে কোথাকার।
আমি দাঁড়িয়ে রইলুম, নীরবে। এই প্রতিমার তো নীচে নামবার কোনও চেষ্টাই নেই।
জিগ্যেস করলুম শঙ্কিত গলায়—প্রতিমা তুমি কি আমায় ভুলে গেলে? তুমি কি আমায় ভালবাসো না।
প্রতিমা হেসে বলল—আচ্ছা পাগল। তুমি কিনচিকে হিংসে করো। ও ছোটো ছেলে, ও কী বোঝে বলো।
নচিকেতা বলল—দিদি ওকে যেতে বলো, আমরা পরে যাব।
না নচি নীচে চলো। প্রতিমা উঠে দাঁড়াল। ওরা নীচে চলে গেল। আমি ইচ্ছে করেই গেলুম না। আধোলোকিত ছাদে পদচারণা শুরু করলুম। হৃদয়ের রুদ্ধ আবেগ ঘোলাতে লাগল, প্রকাশের পথ না পেয়ে।
কতক্ষণ একা ঘুরলুম। তারপর একসময় অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলুম। সিঁড়ির শেষ ধাপে, হাঁটুর ওপর মাথা রেখে অন্ধকারে প্রতিমা বসেছিল। আনন্দে হৃদয় উছলে উঠল। সত্যি প্রতিমা ভালোবাসে আমায়। আমার পথ আটকে তাই বসে আছে। কিন্তু কী হল তাকে ঠেলে তার। হাত মাড়িয়ে দিয়ে, আমি চলে গেলুম হনহন করে বাইরের ঘরে। প্রতিমা আর্তনাদ করে উঠল, ওঃ প্রকাশ তুমি আমায় দেখতে পেলে না। আমি যে তোমারই জন্যে এখানে বসে আছি।
আমার গতিবেগ মুহূর্তের জন্যে স্তম্ভিত হল, কিন্তু ক্রুর হৃদয়ের কাছে আমার কোমল বৃত্তি পরাজয় স্বীকার করল। বই আর খাতাখানা তুলে নিয়ে হনহন করে চলে গেলুম।
প্রফেসর মদের নেশায় বিকৃত কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন—জ্বলে গেল, জ্বলে গেল। তারপর হাসতে হাসতে বললেন—জ্বলুক, জ্বলুক।
সেদিন রাত্রি এল, কিন্তু নিদ্রা এল না। একরাশ তারার ভেতর দিয়ে প্রতিমার লক্ষ লক্ষ সজল চোখ চিকচিক করতে লাগল। অনুশোচনা ধীরে ধীরে দগ্ধ করতে লাগল অন্তর, অতন্দ্র চোখের সামনে নেমে এল শেষ রাতের ফ্যাকাসে চাঁদ। প্রথম রাতের অনুরাগের মূক সাক্ষী শেষ রাতে বিচ্ছেদের বেদনায় যেন পাণ্ডুর।
তাড়াতাড়ি উঠে পড়লুম। বাগানের গাছে তখন শেষ রাতের কনকচাঁপা প্রস্ফুটিত হয়েছে। একরাশ ফুল নিয়ে হাজির হলুম প্রতিমার শোবার ঘরের জানালায়। গিয়ে দেখলুম জানালার গরাদে মাথা রেখে ক্লান্ত প্রতিমা দাঁড়িয়ে রয়েছে, কোমল একফালি অনুভূতির মতো।
