একে হত্যা বলা মনে হয় ঠিক হবে না। আমাদের ছেলেরা, স্বাধীন দেশের সোনার চাঁদ ছেলেরা, অ্যানাটমি অর্থাৎ দেহবিদ্যা শিখছে, অস্ত্রোপচার শিখছে। কচি কাটছে, বুড়ো কাটছে, জ্ঞান। বাড়ছে। তা ছাড়া যারা পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে, তাদের দিক থেকে যখন কোনও প্রতিবাদ নেই, তখন তাদের মানুষ ভাবাটা ঠিক হবে না। মানুষ হলে প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াত। একজোট হয়ে তেড়ে যেত! রোজই তো শয়ে শয়ে ছাগল কাটা হয়। কই ছাগলরা তো প্রতিবাদ করে না। তাদের বংশৃদ্ধি তো বন্ধ হয় না। শয়ে শয়ে ব্যা ব্যাকরে পৃথিবীতে আসছে আর এক কোপে ভ্যা করে বিদায় নিচ্ছে।
যাক শীত তাহলে চলেই গেল। সোয়েটার-টোয়েটার এইবার ঘুমোতে যাবে। উলবোনা কাঁটা ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে পড়ে থাকবে কিছুকাল। কপি, পালং শাক, শুটি, টোম্যাটো বাজার থেকে যাই যাই করছে। আসছে কচু-ঘেঁচু, কুমড়ো, ভেণ্ডি। কারুর মনেই আর তেমন সুখ নেই। কখন কার ডাক আসবে জানা নেই। অপারেশান টেবিলে তুললেই হল। কাগজ খুললেই সারি সারি মুখ। সব নিরুদ্দেশ। খোঁজ মিলছে না। কে যে কোথায় চলে যাচ্ছে! এত বড় দেশ। নদী, নালা, বনজঙ্গলের অভাব নেই। তার ওপর তন্ত্রপীঠ। কাঁপালিকরা করাত হাতে ঘুরছে। সাধনার কি শেষ আছে রে ভাই। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছিলেন, সখা অর্জুন, ক্ষুদ্র হৃদয় দৌর্বল্যং ত্যক্তোত্তিষ্ঠ পরন্তপ। মারো, মেরে যাও। তুমি মারবে কী, আমি তো সব মেরেই রেখেছি। তুমি তো নিমিত্ত মাত্র। তারপর এতখানি একটা হাঁ করলেন। দ্যাখো সখা, বিশ্বরূপ দ্যাখো। সেই রূপ দেখে ভয়ে
অর্জুনের বুক কাঁপছে। মুখগহ্বরে করাল দন্ত। সেই দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে আটকে আছে ধৃতরাষ্ট্রের। ছেলেরা। তাদের পক্ষে যুদ্ধে সমবেত রাজমণ্ডলী—ভীষ্ম-দ্রোণ, কর্ণ। তাঁদের ধড়, মুণ্ড সব আলাদা আলাদা হয়ে পড়ছে। দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে দেহের অংশ আটকে আছে। অর্জুন তখন। বলছেন, সখা
যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা
বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকস্তবাপি
বকতরাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।
পতঙ্গ যেভাবে আগুনে ঝাঁপ মেরে পুড়ে মরে সেই রকম সমস্ত লোক তোমার ওই মুখে গিয়ে সবেগে ঢুকছে আর মৃত্যু বরণ করছে।
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমস্তাল্লোকান
সমগ্রান বদনৈর্জলদ্ভিঃ।
হে বিষ্ণু! সমস্ত লোককে গ্রাস করার অভিলাষে তুমি তোমার প্রদীপ্ত বদন বিস্তার করে রেখেছ।
এই তো বিশ্বের রূপ, বিশ্বরূপ। ভয় পেলে চলবে না। শীত গেল, গ্রীষ্ম আসছে। বর্ষা নামবে। লোডশেডিংবাড়বে। পথে পথে মিছিল ঘুরবে—চলছে চলবে। প্রশ্ন বৃথা, কী চলছে, কী চলবে? সোজা উত্তর, যা চলছে তাই চলবে। বেশি ভেন্তাড়া করলেই ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।
এমনকী কোনও জায়গা নেই, যেখানে অন্তত দিন কয়েকের জন্যে পালিয়ে যাওয়া যায়? এক সময় শীতের বায়ুপরিবর্তনে যাওয়ার হিড়িক পড়ে যেত। রেলভ্রমণ তখন এত ভীতিপ্রদ ছিল না। মোজার ভেতর বা জুতার সুকতলায় টাকা ভরে, স্টেশানে রেল থামলেই ইষ্টনাম জপতে হত না।
কে উঠছে? ডাকাত নয় তো! বাবু চেঞ্জে গিয়ে ফিরে এলেন সর্বস্বান্ত হয়ে। চল্লিশ বছর আগে ভারত বলতে বুঝতুম এক অখণ্ড একটি দেশ। এখন আর তা নেই। ভাবতে ভালো লাগে না, কিন্তু সত্যকে তো অস্বীকার করা যায় না। যে বাঁধনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশবাঁধা ছিল, সে বাঁধন খুলে গেছে। কী সে বাঁধন? মনে হয় বিদেশি শাসন। পরাধীনতার একটা বন্ধন আছে। যাকে কবিরা বলেছেন, দাসত্বের শৃঙ্খল। স্বাধীনতা মানে মুক্ত মানুষের উল্লাস। আমরা সবাই রাজা। আর কথাতেই আছে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। এক-একটি প্রদেশ এক-একটি স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদা পেতে চায়। এক হওয়ার সাধনা সে ছিল যখন আমরা পরাধীন ছিলাম। এখন আমাদের টুকরো টুকরো খণ্ড খণ্ড হওয়ার ব্যাকুলতা। এক ডজন প্রধানমন্ত্রী, দু-ডজন মন্ত্রী, অজস্র এমএলএ। কেন্দ্রটেন্দ্র সব মুছে দাও, যার যার হিস্যা বুঝে নাও।
বৃদ্ধ বললেন, গুড ওল্ড ডেজ আর গন। সে একটা সময় ছিল যখন রাত একটায় বসন্তের ফুরফুরে বাতাসে আমরা বেড়াতে বেরোতুম। রাতের পর রাত এই শীত আর বসন্তের মিলনক্ষণে রাস্তায় দাঁড়িয়ে উচ্চাঙ্গ সংগীত শুনতুম। বড় বড় ওস্তাদের গান! শেষ রাতে স্ত্রী-পুত্র সহ বিয়ের ভোজ খেয়ে আতরের গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে বাড়ি ফিরতুম। দূরে ছায়ামূর্তি দেখে আঁতকে উঠতুম না, ওই রে আসছে। শীতে বেশিরভাগ বাঙালিই যেত বাইরে, বায়ু পরিবর্তনে। এখন সব জায়গার বায়ুই দূষিত।
ভালোবাসার বিষ
রোজকার মতো সেদিনও গিয়ে দেখলুম, বৈঠকখানা ঘরে প্রফেসার বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন। শূন্য মদের বোতল আর গেলাস গড়াচ্ছে ফরাসের ওপর। বই আর খাতা ফরাসের একপাশে রেখে চলে গেলুম ভিতরে। বাইরের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রইল না।
ভিতরের ঘরে ছোট টেবিলের পাশে গালে হাত রেখে প্রতিমা বসে আছে। সেই ফিকে নীল সুন্দর ছাপা শাড়িখানা পরনে। আমি তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালুম। মুখ তুলে সে তাকাল। গভীর দুটো চোখে স্বপ্নাচ্ছন্ন দৃষ্টি। তার মুখখানা দু-হাত দিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলুমকী ভাবছ?
বললে, তোমার কথা ভাবছি।
জিগ্যেস করলুম—সত্যি?
চোখের পাতা দুটো নাচিয়ে, সে নীরব ভাষায় জানাল, সত্যি।
