বকরূপী জ্যাঠামশাই প্রশ্ন করলেন–বলো যুধিষ্ঠির, বার্তা কী?
সবাই থমকে আছেন, এইবার সৌরভী কী বলে! সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। সৌরভী হাসতে-হাসতে বললে—শুনুন ধর্মরাজ! পৃথিবীর এই মায়ার কড়াতে, সূর্যের আগুনে দিন আর রাতের কাঠ দিয়ে, মাস আর ঋতুর হাতা দিয়ে ঘেঁটে রাঁধুনী কাল জীবদের পাক করছে। ধর্মরাজ! এই হল বার্তা।
সবাই চটাপট-চটাপট হাততালি দিয়ে বললেন—এ মেয়েটা কে রে! কোথায় শিখলি?
ওই লালাজি। রামায়ণ, মহাভারত পড়েন, আমি বসে-বসে শুনি।
ধর্মরাজ বললেন—সাইলেন্স, সাইলেন্স। শেষ হয়নি এখনও। বলল, আশ্চর্য কী?
রোজ মানুষ মরছে। মানুষ দেখছে, তবু ভাবছে, আমি বোধহয় অমর। এরচেয়ে আশ্চর্য আর কী আছে!
বলো, পথ কী?
‘মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ।’
জ্যাঠামশাই আর পারলেন না। সৌরভীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কী পুরস্কার চাস, বল? জ্যাঠামশাইয়ের বুকে মুখ গুঁজে সৌরভী বললে—একটা রাজকুমার।
রাজকুমার কোথায় পাব মা?
মুখ না তুলে, পেছন দিকে হাত ঘুরিয়ে বললে—ওই যে, ওইখানে একটা বসে আছে। দাদু এতক্ষণ মৌজ করে পান চিবোচ্ছিলেন। দাদুর পান আমার বড়মা ছাড়া কেউ সাজতে পারেন না। বড়মা জমিদারের মেয়ে। বন্দুক চালাতে পারেন। ভীষণ সাহসী। একবার কোথা থেকে ঘোড়ায় চেপে একটা লোক। দুপুরবেলা। পুরুষরা কেউ ছিল না। যেন চম্বলের দস্যু। গুলি-গুলি চোখে। আমার দিকে তাকিয়ে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছিল। বড়মাবন্দুক হাতে বেরিয়ে এলেন। একটা ফাঁকা আওয়াজ করতেই লোকটা দমাস করে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল। পরে জানা গেল, পাইনদের বড় ছেলে ঘোড়ায় চেপে বিয়ে করতে যাবে, তাই তারকেশ্বর থেকে ঘোড়া। আনিয়েছিল। ওদের বাড়ির একজন ডাকাত সেজেছিল।
দাদু বললেন—এই টিকটিকিকে বিয়ে করবি গিরগিটি? তোর কী পছন্দ রে! আমরা বিয়ে করে ফেলেছি।
কবে করলি?
আজ।
কোথায় করলি?
মদনমোহনের মন্দিরে গেলুম কেন? ও কৃষ্ণ আর আমি রাধা। ওই জন্যেই না তোমরা এত খাওয়ালে!
দাদু বললেন—এবারে ডাকাতদের গল্প শোনো। ভয় পাবে না তো? না, ভয় পাবে কেন!
সেকালের ডাকাতদের কোনও তুলনা একালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সকালে জমিদার, রাত্তিরে ডাকাত। আমার মেসোমশাই যথেষ্ট ধনী ছিলেন। হরেকরকম ব্যবসা করে এত টাকা করে ফেললেন যে ডাকাতদের লিস্টে নাম উঠে গেল। মাসিমা অনেকবার সাবধান করেছিলেন, আর যাই করো বিপজ্জনক রকমের বড়োলোক হোয়োনা।
মেসোমশাই করুণ গলায় বলেছিলেন—আমি কী ইচ্ছে করে হচ্ছি! জোয়ারের জলের মতো টাকা এলে আমি কী করব! টাকায় আমার অরুচি ধরে গেছে। যাতে হাত দিচ্ছি সেইটাই লেগে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—ভাই রে! একেই বলে কপাল!
ডাকাতের চিঠি এল:
প্রিয় ব্রজবাবু, আগামী বুধবার আমরা আপনার অতিথি হব। তা জন পঞ্চাশ। মায়ের পুজো সেরে বেরোতে-বেরোতে মধ্যরাত হবে। এর আগে সাধারণত আমরা কোথাও যাই না। ফুলকো ফুলকো লুচি আর পাঁঠার মাংসর ব্যবস্থা রাখবেন। চার-পাঁচ রকমের ভালো মিষ্টি অবশ্যই। মঙ্গলবার যে-কোনও সময় আমাদের একজন যাবে একটা সাইনবোর্ড নিয়ে। সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ির বাইরে ঝুলিয়ে দেবেন। আপনার সম্মান বাড়বে। আমরা যেখানে-সেখানে ডাকাতি করি না। আমাদের দল, এক নম্বর বনেদি দল। আমরা তিন পুরুষে ডাকাত। কোনও ভেজাল নেই। মায়ের দিকে তিন পুরুষ, বাপের দিকেও তিন পুরুষ। একমাত্র আমাদের দলেই সাতটা ‘মসার’ পিস্তল। দশটা গাদা বন্দুক আছে। আমরা অন্যদলের মতো মরচে ধরা তরোয়াল, টিনের পাতপ্যাতে। খাঁড়া, পাকা বাঁশের লাঠি, এ-সব ব্যবহার করি না। রণপা-র প্রয়োজন হয় না। ও-সব ভড়ং। সার্কাস। নিকৃষ্ট ডাকাতরা ব্যবহার করে। আমরা রেজিস্টার্ড। পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা দি। কমসে কম দুশো মেয়ের ভালো পাত্রে বিয়ে দিয়েছি নিজে বসে থেকে। হাজার বিধবাকে কাশী, বৃন্দাবনে পাঠিয়েছি। নিয়মিত মাসোহারা পায়। আমার পূর্বপুরুষরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিত। হিংসা আমি সহ্য করতে পারি না, তাই কুমড়ো বলি দি। আমার স্ত্রী পরে ছক্কা বেঁধে, মহাপ্রসাদ হিসেবে বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে।
আমাদের বাড়িতে দোল, দুর্গোৎসব সবই হয়। নিত্য দরিদ্র নারায়ণ সেবা।
ইতি,
বিনীত, বিশ্বনাথবাবু
চিঠিটা পাওয়ার পর পাড়াসুদ্ধ লোকের সে কী আনন্দব্রজ, এতদিন তুমি একটা বড়লোকই ছিলে, আজ, তুমি জাতে উঠলে। ব্রাহ্মণ সন্তানের যেমন পৈতে হয়।
প্রায় তিন বিঘে জমির ওপর চকমেলানো বাড়ি। দু-খানা পুকুর। আম, জাম, লিচু, সবেদা, কাঁঠাল গাছ। অনেকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে ম্যারাপ বাঁধা হল। বিশ্বনাথবাবু বসবেন। কার্পেট ঢাকা। মঞ্চ। রুপোর নল লাগান ফর্সি। অম্বুরি তামাক। সাদা পাগড়ি মাথায় মেলোমশাইয়ের কর্মচারীর দল। গোরা ব্যান্ড এসেছে। ভিয়েন বসেছে। বিরাট-বিরাট সাইজের ডাকাতে লাড়ু তৈরি হচ্ছে। যেন মেসোমশাইয়ের মেয়ের বিয়ে।
সকাল থেকেই উদবেগ। বিশ্বনাথ ডাকাতবাবুর সাইনবোর্ড তো এল না। সাইনবোর্ডে লেখা। থাকবে, ‘বিশ্বানাথবাবু কৃপা করেছেন।’ এল না কেন! ‘কৃপাবোর্ড’ এল না কেন? সকলের মুখে মুখে একই উদবেগ। ডাকাতরা যে আসছে, তার আবার সিগন্যাল ছিল। দূরে রাতের আকাশ। কুঁড়ে পরপর তিনটে তারাবাজি উঠে ফুল ছড়াবে। তিনখানা আগুনে-মালা আকাশ পথে দুলতে দুলতে যে বাড়িতে ডাকাতি হবে, সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসবে।
