সূর্য ডুবতে-না-ডুবতেই চারপাশ আলোয় আলো। সবাই উৎসবের সাজে সেজে উঠল। মেয়েদের মাথায় বড়-বড় খোঁপা। গলায় চিকচিকে সোনার হার। রং-বেরং-এর শাড়ি। মেসোমশাই পরেছেন চুনোট করা ফরাসডাঙ্গার ধুতি। গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। হাতে দুলছে মোষের শিঙের স্টিক। গোঁফে আতর।
রাত আটটার সময় রব উঠল, আসছে, আসছে! ঘোড়া আসছে, কৃপা আসছে। এল একটা চিঠি।
‘প্রিয় ব্রজবাবু, আমাদের ভুল হয়েছে। আপনারই গ্রামের স্বরূপ দামোদরবাবু আবেদন করেছেন। তিনি আপনার চেয়ে ঢের বড়লোক। তাঁর কাছে বাদশাহি মোহর আছে, যা আপনার নেই। আমি দুঃখিত।
ইতি’
মেসোমশাই হাত থেকে ছড়ি ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন—আমি মামলা করব।
সব গল্পই যেমন হয়, মধুরেণ সমাপয়েৎ। প্রবীণদের পরামর্শে মেসোর বড় মেয়ে চম্পার সঙ্গে দক্ষিণপাড়ার বিশ্বনাথের বিয়ে হল ওই রাতে। তিনি ডাক্তার, নাম করা। ডাকাতের বদলে ডাকতার এল ঘরে।
গল্পে-গল্পে রাত এগোচ্ছে। সময় খালি হাঁটে। বসতে জানে না। তেপান্তরের মাঠের ও-মাথায়, বোসপাড়ার দিকে শেয়াল ডাকছে। প্রহর ঘোষণা করছে। সেই শজারুটা বেরিয়েছে। রোজ রাতে নাচতে বেরোয়। তেপান্তরের মাঝমাঠে গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে নাচে। ঝমঝম আওয়াজ হচ্ছে।
সৌরভী জ্যাঠামশাইয়ের কোলে মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। বড়মা একটা বালিশ এনেছেন। সৌরভীর মাথাটা আস্তে করে তুলে বালিশে রাখছেন, ঘুমন্ত সৌরভী বলছে,—আমার খোঁপা, খোঁপা, আমার খোঁপা।
বড়মা আস্তে একটা আদরের চাপড় মেরে বললেন—এদিকে ঘুমে ন্যাতা, ওদিকে খোঁপা ভেঙে যাওয়ার চিন্তা।
কপালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেলেন।
দাদু বললেন—’নাঃ, পৃথিবীটা সত্যিই খুব সুন্দর। এখানে বারেবারে আসতে হবে বেড়াতে। এই গ্রুপ। একেবারে পাক্কা। দেখো, সায়েবদের বিয়ের আগে একটা ব্যাপার থাকে—’এনগেজমেন্ট’। সেই কাজটা আমি করে ফেলতে চাই। পরির মতো এই মেয়েটার সঙ্গে দেবদূতের মতো এই ছেলেটার ‘এনগেজমেন্ট’। তোমাদের আপত্তি আছে?’
কী আশ্চর্য! আমরা সবাই তো এই একই কথা ভাবছি।
তাহলে দেবদূত পরির অনামিকায় এই রুবির আংটিটা পরাও।
ঘুমোচ্ছে; কিন্তু আঙুলটা উঁচু করল।
দাদু বললেন—ভীষণ আনন্দ হচ্ছে আমার। বিয়েটা যখন হবে তখন তো আমি থাকব না। পৃথিবীর দিন ফুরিয়ে যাবে।
হালুম করে বাঘ যেমন শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সৌরভী সেইভাবে দাদুর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল
—থাকবে না মানে? থাকবে না মানে?
দুজনে জড়াজড়ি করে মাটিতে গড়াগড়ি।
আলো-অন্ধকার
এক-একটা দিন ভোলা যায় না। জীবনে সেই সব দিন যেন নোঙর করা নৌকোর মতো স্মৃতির ভারে দুলতে থাকে। একটু দেরি হল অফিসে পৌঁছোতে। আজকাল আর সময়কে কোনও কিছুতেই মাপা যায় না। সময়ের হিসেবে স্থানের দূরত্ব যেন বেড়েই চলেছে। একই যানবাহনে এই একই জায়গা থেকে আগে যে সময়ে ডালহৌসি পৌঁছোতুম এখন তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। এর একাধিক কারণ। আমরা যে অঞ্চলে রয়েছি সেখান থেকে অনিবার্য কারণে অনেক সুযোগ-সুবিধেই ক্রমশ অন্তর্হিত হচ্ছে। একটা বড় বা প্রধান বাসরুট উঠে গেছে। অন্যান্য বাসের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। দুধ পাওয়া যায় না। পোস্টঅফিস নেই। বাজারের অবস্থাও খারাপ। জিনিসপত্রের চালান নেই। স্কুল, কলেজ অনিয়মিত। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ নেই বললেই চলে, সকলেই গৃহের গণ্ডিতে অন্তরিন। আজকাল দেরিতে অফিস পৌঁছেলে কেউ কিছু মনে করে না। কারণ সব কিছুই অনিশ্চিত! সকলেরই এক অবস্থা। বলতে গেলে—ফাদার উই আর অন দি সেম বোট।
অফিসে পৌঁছে আজকাল আর প্রস্তুতির সময় পাওয়া যায় না। ঢুকেই কাজ নিয়ে বসতে হয়। কোনও কোনওদিন এক ঘর ভিজিটার নানা সমস্যা নিয়ে মুখিয়ে বসে থাকে। পোর্টফোলিও এক কোণে ফেলেই কাজের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দিতে হয়। এর মাঝে একমাত্র রিলিফ— মলয় এক কাপ চা যখন দিয়ে যায়। চুমুকে চুমুকে চা খেতে খেতে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকানো—পনেরো-কুড়ি মিনিটের জন্যে অন্য জগতে, কল্পনার জগতে মুক্তি। টেলিফোন বেজে উঠল। চায়ের সময় ফোন বড় বিরক্তিকর। তবুও রিসিভার তুলতে হল। ও প্রান্তে কাবেরী। কী হল! এই তো মাত্র দু-ঘণ্টা আগে তাকে ছেড়ে এলাম। কী হল কাবেরী? একটু তাড়াতাড়ি চলে আসব! আচ্ছা, তুমি যদি এইরকম করো, কাজকর্ম কী করে করব! লোকে আমাকে স্ত্রৈণ বলবে যে। আচ্ছা আজকের দিনটা। বেশ তাই হবে। কিন্তু নট বিফোর ফোর।
একটা জরুরি ডেসপ্যাঁচ ছিল। তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেললুম। দুটো নোট পাঠিয়ে দিলুম বড়কর্তার ঘরে। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এলেন তাঁর মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটির বয়স বেশিনয়। এমন করুণ চেহারা যে দেখলেই মায়া হয়। ভদ্রলোক বছরখানেক আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর বিপর্যয়। এখন মেয়েকে কোনও হাতের কাজ শিখিয়ে স্বাবলম্বী করতে চান। মনে যে ঝড় বইছে তা তো আর কমানো যাবে না, এখন দেহটাকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু আন্তরিক ব্যবস্থাপত্র দিলেও, কাজ কী হবে বলা শক্ত। কিন্তু বৃদ্ধ খুশি হয়ে চলে গেলেন। আশা এমন জিনিস, কিছু একটা হতে পারে এই চিন্তায় তিনি হয়তো কয়েক দিন স্বপ্ন দেখে কাটিয়ে দেবেন।
কাবেরীকে কথা দিয়েছি—একটু আগে বেরোব। সুতরাং, কাজ সারতে হবে চটপট। এর পর সামান্য কিছু কেনাকাটাও আছে। আমার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের আকর্ষণ প্রকৃতই অসাধারণ। সাজানো-গোছানো, ছিমছাম। কাবেরীর শিল্পীমনের ছাপ সর্বত্র। পরদা থেকে শুরু করে বিছানার চাদর, টেবলক্লথ, সোফাসেটের ঢাকা এক রঙের। পালিশ করা অল্পসল্প ফার্নিচার। জাপানি। কায়দায় ফুল সাজানো। দেওয়ালে কয়েকটি নির্বাচিত জায়গায় কাবেরীর নিজের আঁকা, জল এবং তেল রঙের বিভিন্ন স্টাডি। আমার নিজের সংগ্রহশালার কিছু কিছু ছবি। শিল্পসমালোচক হিসেবে আমার নিজের সংগ্রহও বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। এই ছবি দিয়েই আমাদের পরিচয়ের শুরু। অ্যাকাডেমিতে কাবেরীর একক চিত্রপ্রদর্শনীতে আমাদের প্রথম আলাপ। শেষ আমার ফ্ল্যাটে। নিঝঞ্চাট, নির্বিবাদী মানুষ না হলেও শিল্পসত্তা একটা আছে, স্ত্রী একজন রুচিসম্পন্না প্রকৃতই যশস্বী শিল্পী। যোগাযোগ অদ্ভুত। ভাগ্য দেখে হিংসে করলে কিছু করার নেই। সবই ভবিতব্য। তবে আমি এইটুকুই জেনেছি, জীবন থেকে এই পাঠই নিতে পেরেছি সুখ আর দুঃখ চাকায় বাঁধা, জীবনে ঘুরে ঘুরে আসে। উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। একটা মুক্ত অনাসক্ত মন নিয়ে চলতে হবে।
