অনেক দেরি হয়ে যাবে না?
দেরি কী গো, এই তো একটু আগে সন্ধে হল। শুনছ না, আরতি হচ্ছে!
আমরা দক্ষিণপাড়ার দিকে এগোচ্ছি। চাঁদের আলোয় মন্দিরের সাদা চূড়াটা ধকধক করছে, যেন আকাশের গায়ে কাঞ্চনজঙ্! দাদুর মুখে শুনেছি, একশো বছর আগে এই মাঠটা ছিল। ডাকাতদের, ফাঁসুড়েদের। কত মানুষ যে খুন হয়েছে এই মাঠে! কথাটা মনে হওয়া মাত্রই আমি সৌরভীর গা-ঘেঁষে হাঁটতে লাগলুম।
কী হল, ভয় করছে?
জানো, দাদু বলেছেন, একশো বছর আগে এই মাঠে ডাকাতরা মানুষ মেরে পুঁতে দিত। তারা সব ভূত হয়ে এখানে আছে।
আছে তো আছে। তাতে তোমারই বা কী, আর আমারই বা কী? আমি দুবার দেখেছি। একদিন দুপুরবেলায় দেখেছি।
দুপুরবেলায় ভূত!
ও মা, তুমি সেই কথাটা শোনোনি, ঠিক দুপুরবেলা ভূতে মারে ঢেলা! একটা লোক দড়িতে বাঁধা একটা ছাগল নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে যাচ্ছে। যেই জিগ্যেস করলুম, কাকু! কোন হাট থেকে ছাগলটা কিনলে? ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে ভ্যানিশ। মানুষটা নেই, ছাগলটা আছে। এইবার শুনবে! ছাগলটা আমাদের পাড়ার বিমলাদের ছাগল। ছাগলটা পাগল হয়ে গেল।
ছাগলও পাগল হয়?
হবে না, ভূতে ধরেছিল যে! থেকে-থেকে তার চোখ দুটো সাদা হয়ে যেত। আর ভীষণ-ভীষণ সব কাণ্ড করত। পায়রা, মুরগি এইসব ধরে-ধরে খেত।
শেষে কী হল?
জলে ডুবে মারা গেল।
মন্দির যত এগিয়ে আসছে বাদ্যিবাজনার আওয়াজ তত জোর হচ্ছে। বাড়ির দাওয়া থেকে আমাদের সকলের ‘রাঙা দিদিমা’ জিগ্যেস করলেন—দুটিতে চল্লে কোথায় গো? রাধা আর কৃষ্ণ!
সৌরভী বললে রাধা আর কৃষ্ণ দেখবে দিদিমা? আমাকে বললে—বাঁশি ধরে বাঁ-দিকে বেঁকে যাও। সৌরভী আমার গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দিদার কী হাসি!
নাড়ু খাবি আয়।
আজ নয় গো দিদা। আজ তোমার রাধাকৃষ্ণ ইলিশ খাবে।
মন্দিরে মদনমোহন আজ কী সেজেছেন! কীর্তনীয়া মাথুর গাইছেন ভঙ্গি করে।
প্রচুর খাওয়ার পর প্রচুর গল্প। দাদু জিগ্যেস করলেন—দুটোতে কোথায় গিয়েছিলিস? দাদুর সঙ্গে আমাদের বন্ধুর সম্পর্ক। ইয়ারকি-টিয়ারকি একটু আধটু চলে। সৌরভীটা আজকাল একটু ফাজিল হয়েছে।
সৌরভী বললে—প্রেম দেখতে।
কার প্রেম?
রাধাকৃষ্ণের।
সে ভালো। প্রেম করেছিস?
একটু। তোমার নাতিকে আজ বেশ করে চুমু খেয়েছি।
আগেই খেয়ে ফেললি? বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা সইল না?
ধুর, তার এখনও অনেক দেরি।
মদনমোহনতলায় মন্দিরের পেছনে একটা কুয়ো আছে, দেখেছিস?
না!
ওর কোনও তল নেই।
মানে?
পাতাল পর্যন্ত নেমে গেছে। ভেতর দিকে জলের কিছুটা ওপরে ডান দিকে একটা সুড়ঙ্গ আছে, সেটা সোজা চলে গেছে পাইনদের রাজবাড়িতে। একেবারে গর্ভমন্দিরে। নবাবি আমলে, যখন মন্দির ভাঙাভাঙি হচ্ছে, মূর্তি চুরমার করছে, মদনমোহন তখন ওই সুড়ঙ্গে অনেকদিন ছিলেন। পাইনদের রাজবাড়ির পুরোহিত ওই দিক থেকে রোজ দুবেলা এসে চুপিচুপি পুজো করে যেতেন। ওপরে জঙ্গল। বোঝার উপায় ছিল না, যে, তলা দিয়ে চলে আসছে একটা সুড়ঙ্গ-পথ।
সৌরভী জিগ্যেস করলে—এখনও সেই পথ আছে?
এদিকে, ওদিকে কিছুটা তো আছে। মাঝে-মাঝে নেই। জঙ্গলটাই চলে গেছে। মানুষের বসতি হয়ে গেছে। জঙ্গলের শক্র মানুষ।
এইবার সবাই এসে ঘিরে বসলেন। আমাদের লাইনের গল্প থেমে গেল। জ্যাঠামশাইয়ের প্রিয় বিষয় হল, মাছ। আসরে বসেই বললেন—আহা, এমন চাঁদের আলো, মাছ ধরতে গেলে হত। কবিতার মতো রাত। জলার ধারে এইরকম রাতে অনেক রকমের অভিজ্ঞতা হয়। আমি একবার কথা-বলা মাছ দেখেছিলুম। বিরাট মাছ। জল থেকে রুপোর তৈরি মাথাটা তুলে বললে, আমার নাম সৌরভী, তোমার নাম?
সৌরভী বললে—সৌরভী তো আমার নাম।
জ্যাঠামশাই বললেন—সে আমি কী করব। মাছ বললে, আমার নাম সৌরভী। কী সুন্দর দেখতে। নাকে নোলক। চোখ দুটো টানা-টানা। কপালে টায়রা। আর এক চাঁদের আলোর রাতে দেখি, অপূর্ব সুন্দর, রাজার মতো একজন মানুষ জলের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ওপারে সাদা ধবধবে একটা বক। বেশ বড়। মাথায় রুপোলি একটা ঝুঁটি। চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে। এমন বক কখনও দেখিনি! ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলুম—আপনি কে?
সে কী? আমাকে চিনতে পারছ না? মহাভারত পড়োনি?
সংক্ষিপ্ত মহাভারত পড়েছি।
যুধিষ্ঠিরকে চিনতে পারছ না? ওই দেখো ওপারে বকরূপী ধর্ম। কিছুতেই জল নিতে দিচ্ছে না। মহাভারতের সেই প্রশ্নোত্তরের ‘কুইজ কন্টেস্ট’ শুরু হয়ে গেল, আমি ছিপ হাতে চুপটি করে বসে-বসে শুনছি—
বক। বলো যুধিষ্ঠির, পৃথিবীর চেয়ে গুরুতর কী, আকাশের চেয়ে উঁচুকী, বাতাসের চেয়ে দ্রতগামী কী, ঘাসের চেয়ে বিস্তৃত কী? সৌরভী বললে—আমি জানি। বেশ, তাহলে তুমি হও যুধিষ্ঠির আর আমি বুড়ো বক। উত্তর দাও।
মা পৃথিবীর চেয়ে গুরুতর। মদনমোহন মন্দিরের লালাজি আমাকে শিখিয়েছেন, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’ আকাশের চেয়ে উঁচু পিতা। বাতাসের চেয়ে দ্রুতগামী আমাদের মন। আর আমাদের চিন্তা ঘাসের চেয়ে বিস্তৃত।
বক।। কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ?
সৌরভী।। দয়া।
কোন ধর্ম ভালো ফল দেয়?
শাস্ত্রের ধর্ম।
মানুষ কী করলে দুঃখ পাবে না?
মনকে বশে রাখলে।
কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে মানুষ ঠিক থাকবে, নষ্ট হবে না? এই যে এইটার সঙ্গে।
সবাই গুরুজন, তাঁদের সামনে সৌরভী আমার কাঁধে হাত রেখে বললে—সৎলোক।
কাঁধ থেকে হাতটা নামল না। ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা-ঠান্ডা চুড়ির স্পর্শ। ভীষণ লজ্জা করছে। কেউ কিছু মনে করছেন না। সবাই জানেন, আমরা দুজনে ভীষণ বন্ধু।
