এই সব আলোচনা করতে করতে যেই বড় রাস্তায় এসে পড়েছি, চোখের সামনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এক স্কুটার আরোহীকে মেরে বেরিয়ে গেল একটা লরি। স্কুটারটা তালগোল পাকিয়ে গেল। মানুষটা চুরমার। চারপাশ থেকে লোক ছুটে এল। একদল ধাওয়া করল লরিটার পেছনে।
শান্ত, সুন্দর একটা পরিবেশ নিমেষে রক্তাক্ত। একটা ট্যাক্সি থেকে আরোহীদের টেনে টেনে নামিয়ে লোকটিকে তোলা হল। সবাই বললে, অকারণ। শেষ হয়ে গেছে। একেবারে দলা পাকিয়ে গেছে।
আমি হাঁ করে দাঁড়িয়েছিলুম। হাত পা কাঁপছে। চোখের সামনে ভয়াবহ মৃত্যু সহ্য করা যায়! সুন্দর লাল রঙের স্কুটারটাও মারা গেছে। মানুষ নয় বলে পড়ে রইল পথের পাশে। এক সেকেন্ড আগে আর এক সেকেন্ড পরে। সময়ের ওই সাংঘাতিক মুহূর্তটা কোনওরকমে পাশ কাটাতে পারলে স্কুটার আরোহী এতক্ষণে কত দূরে চলে যেত। কোথাও কোনও বাড়িতে তাঁর স্ত্রী হয়তো ঘড়ি দেখছেন আর ভাবছেন স্বামীর আসার সময় হল। মাছের কচুরি বেলছেন। এলেই ভেজে দেবেন। গরম, গরম। কেন আসছে না, কেন আসছে না করে সময় এগোবে। একসময় মৃত্যুদূত এসে দরজার কলিংবেল টিপবে। ছোট মেয়েটি ছুটে আসবে, বাবা, বাবা! বলে। বাবা নয়। এসেছে বাবার মৃত্যুসংবাদ। সব আলো জ্বলছে, অথচ কী ভীষণ অন্ধকার। আমি ভাবছি এইসব, তার মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। আবার সেই রাজপথ। নতুন গাড়ি। নতুন মানুষ। পারে। রেস্তোরাঁয় তিনটে ষণ্ডা মতো লোক, হাতের চেটোর মতো চওড়া কাটলেটে কামড় মারছে। পাশে চায়ের কাপ ধোঁয়া ছাড়ছে। ঠিক ওই জায়গার ওপর দিয়েই দু-চাকা ছুটছে। পেছনে ধাওয়া করে আসছে লরি। মানুষটির চলে যাওয়ার চেয়েও আমি ভাবছি তাঁর পরিবারের কথা। বুড়ি মা বেঁচে নেই তো। অবিবাহিত বোন। তিন দিন পরেই যার বিয়ে। ছেলে হওয়ার জন্যে স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি ছিল না তো!
কে জানে বাবা! আমার ভীষণ ভয় করছে। ঠিক এক সেকেন্ড পরে কী হবে তাই তো জানি না, অথচ কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছি। আজকে দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা করছি বিশ বছর পরের। এই তো আজই ষাট হাজার টাকার ইনসিওরেন্স করেছি। পাকবে সেই বিশবছর পরে, আমার বয়েস তখন হবে ষাট। কোনও মানে হয়। এই সাংঘাতিক ভয়ের পৃথিবীতে এক মিনিট পরে কী হবে কেউ। জানে! না আমি জানি না আমার বউ! সেদিন এক ফার্নিচার-এর দোকানের মালিক বেশ বললেন। একটা খাট কিনতে গেছি। তা বললুম, ভাই এমন একটা খাট দিন, যা সারাজীবন চলে যাবে। ভদ্রলোক আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি কত বছর আছেন, জানতে পারলে আমার সুবিধে হয়। দশবছর, বিশ বছর। আপনার জানা আছে?’
খুব বোকা বনে গেলুম। সারাজীবন বলার সময় আমার কোনও ধারণাই ছিল না সেটা কতটা? কত দূর! ভদ্রলোক তখন ভগবানের মতো হেসে বললেন, ‘মশাই জীবন বড়ই অনিশ্চিত। পদ্মপাতায় জলের মতো। এই আছে, এই নেই। একটা খাট দিচ্ছি। নিয়ে যান। তারপর দেখা যাক, খাট আগে যায় না মানুষ আগে যায়। আমার অভিজ্ঞতায় বলে, যেমনই হোক, মানুষই আগে যায়।’
একটু বেশঝালে ঝালে মেখে তরিবত করে খাওয়াদাওয়া সারা হল। ঢেউ শব্দে বেশ জমাটি ঢেকুর উঠল। ছুটির দিন, ভাবছি একটু গড়িয়ে নিলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। দিবানিদ্রার মহাসুখ। যখন যেমন পারা যায় জীবন থেকে সুখ বের করে নিতে হয় নিংড়ে।
বউ বললে, ‘এখন আর গড়িয়ে পোড়োনা। পিসিমাকে একবার দেখে এসো। অবস্থা খুব খারাপ।’ তাই তো! পিসিমাকে তো একবার দেখতে যাওয়া দরকার! কী থেকে কী হয়ে গেল! মুহূর্তের ব্যাপার। অমন এক সাধিকার মতো মহিলা। সারাজীবন যাঁর দুঃখের সঙ্গে লড়াই করে কেটেছে। কত কাণ্ড করে বিধবা মহিলা ছেলেটিকে মানুষ করলেন। ভালো চাকরি হল। ভালো মাইনে হল। বিয়ে হল ছেলের। দুই নাতি। জীবনের একেবারে শেষকালে সুখ ছোঁব, ছোঁব করছে। প্রায় ছোঁয় আর কি! ভগবান পায়ের তলায় জমিটা সামান্য একটু টেনে দিলেন খুচ করে। ভোরবেলা মহিলা জপে বসবেন বলে ঠাকুরঘরে যাবেন। চৌকাঠের ওপর দিয়ে পা বাড়ালেন। এঘর থেকে ওঘরে। কিছুই না, টাল খেয়ে পড়ে গেলেন। কোমরের হাড়ে একটু চোট লাগল। যা হয়। কেউ বললে, জল দাও, কেউ বললে মলম দাও, আনিকা। সামান্য চোট। আরে বাবা, বৃদ্ধ। বয়সের হাড়। একেবারে পাঠকাঠির মতো। সেই হল। হিপজয়েন্টে ফ্রাকচার। তিন মাস পড়ে থাকো বিছানায়। যে মানুষ রাতে ঘণ্টা চারেকের জন্যে বিছানা নিতেন তাঁর এ কী শাস্তি! বিছানা তাঁকে ভালোবেসে বললে—কিছু মানুষ আসে সেবা করার জন্যে কিছু আসে সেবা নেওয়ার। জন্যে। তুমি এসেছিল সেবা করার জন্যে। এইবার তুমি আমার সেবা নাও। চোট লাগা পা-টা ভুল সেটিং-এর জন্যে বিকল হয়ে গেল। শরীরের যেখানে যত গোলোযোগ ছিল, ব্যাধিশত্রু, সব তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে এল। রণক্লান্ত সৈনিক এইবার ঘরে ফেরার ডাক পেয়েছেন। চেতন, অচেতন, অর্ধচেতন স্তরে মন ভাসছে। অলৌকিক দৃশ্য দেখছেন মাঝে মাঝে। আজ অথবা কাল, যে কোনও দিন বীণানীরব হবে।
ভীষণ ভয় করে। ভগবানকে বিশ্বাস করে তো তাহলে কোনও লাভ নেই। তিনি তো কোনও রক্ষাকবচ নন। আমার পিসিমার চেয়ে ধার্মিক ক-জন আছেন! আর জীবনে অত কষ্টই বা কে করেছেন। সুখের পেয়ালাটি সবে এগিয়ে এসে ঠোঁট স্পর্শ করব করব করছে। ভাগ্যের হাত থেকে হাতলটি খুলে গেল। হাতলের জোড় খুলে কাপ পড়ে গেল। হল না। এবারটাও হল না। সব দৌড়ে সবাই কি ফিতে ছুঁতে পারে। পরের বার। পিসিমা পরের বার। নেকস্ট টাইম বেটার লাক।
