চৌকির ওপর বিছানা। চাদর ঢাকা পিসিমা। মুখটাই শুধু বেরিয়ে আছে। মুখ না বলে কঙ্কাল বলাই ভালো। শুধু পাতলা একটা চামড়ার আস্তরণ। ভীত, সন্ত্রস্ত, করুণ দুটো চোখ। চোখ দেখলেই বন্দি মানুষকে চেনা যায়। বনের পাখি আর খাঁচার পাখি। পিসিমার চোখ মুক্তি খুঁজছে। অনেক দিন এসেছি। ভাগ্যের চাবুক অনেক সহ্য করেছি। অসম্ভব সম্ভব হবে ভেবেছি। ভেবেইছি। আর আমি ভাবতেও পারছি না। পাখি এবার তুমি উড়ে যাও। প্রভু! খাঁচা আমার খুলে দাও।
পিসিমা চাদরের তলা থেকে শীর্ণ হাত বের করে আমাকে স্পর্শ করতে চাইলেন। শক্তি নিঃশেষ। আমি কোনওভাবেই জিগ্যেস করতে পারলুম না, কেমন আছেন? দেখতেই তো পাচ্ছি! বলতেও পারলুম না ভালো থাকুন! সাবধানে থাকুন। ও কথার কোনও মানে হয় না। যার জীবন তিনিই। জানেন কে কতদিন ভালো থাকবে! কে কখন ভালো হয়ে উঠবে। আমার পিতার তরফের শেষ। প্রতিনিধি। যেই চলে যাবেন, বন্ধ হয়ে যাবে বইয়ের মলাট। কেউ কোনও দিন আর খুলবে না। খোলার প্রয়োজনও হবে না। বিছানার পাশে বসে রইলুম বহুক্ষণ। পিসিমার ভেতরে অদৃশ্য এক নৌকা বেয়ে চলেছে কেউ মোহনার দিকে। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি দাঁড়ের শব্দ। জলকল্লোলের শব্দ।
পথে নেমে এলুম। বড় অসহায় লাগছে নিজেকে। মানুষকে একদিন না একদিন যেতে হবে। ঠিকই। কিন্তু এইভাবে কেন? যাবে তো বিস্ফোরণের মতো যাও। ধনুক থেকে ছোড়া তিরের মতো যাও। অথবা যেভাবে মানুষ বেড়াতে যায় সেই ভাবে যাও। রেলগাড়ির জানালার ধারে মুখ বের করে বোসো। হাসতে হাসতে হাত নাড়তে নাড়তে চলে যাও। আমরাও রুমাল নাড়ি তুমিও রুমাল নাড়ো।
একটা হিসেব করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমার ছেলে, শানুর বয়স এখন পাঁচ। তার মানে এখনও কুড়িটা বছর। কুড়ি বছর টেনে যেতে হবে। স্কুল, কলেজ, জীবিকা। তারপর রাখে ভালো টান মেরে ফেলে দেয় সেও ভালো। সে হবে ভয়ংকর ভালো। কোথায় যাব। কোন আস্তানায় থাকব তখন তো অর্থব। লোলচর্ম। বিস্মৃতিপ্রবণ। ঘৃণিত এক বৃদ্ধ। দুটো জিনিস বর্তমান জগতে অতিশয় ঘণার, এক, দারিদ্র, দুই বার্ধক্য। ঘৃণা নিয়েই মরতে হবে। সসম্মানে আর ক-জন যেতে পারে। এই যে আমার পিসিমা। সবাই এখন ফিশফাশ করছে, এই অবস্থায় যাওয়াই ভালো। ভালো হওয়ার যখন আশা নেই তখন যাওয়াই ভালো। হিসেব তো মিলছেনা আমার। কুড়িটা বছর আমাকে টাকার পাইপলাইন ঠিক রাখতে হবে। কল ঘোরালেই যেন টাকা পড়ে। ছেলের নিজের পায়ে দাঁড়ানো। দুটো মেয়ের প্রায় একই সঙ্গে বিয়ে। এর মধ্যে কতবার সব অসুখে। পড়বে। চিত্রার অপারেশান। মেয়েদের একটা না একটা বড় রকমের অপারেশান হবেই হবে। এমন খুব কম বউই আছে যারা অক্ষত জীবন শেষ করেছে। বলা তো যায় না। যদি ব্রেস্ট ক্যানসার হয়। ইউটেরাসে ক্যানসার! হবে না—এ কথা তোতা জোর করে বলা যায় না। আমারও তো ক্যানসার হতে পারে। আজকাল তো প্রতি পাঁচজনে একজনের ক্যানসার।
ভীষণ ভয়। এখন চিত্রা যদি আমার আগে চলে যায়, আমি নিঃসঙ্গ! আর আমি যদি আগেই যাই। চিত্রা কী করে সামলাবে। পুরো পরিবার ভেসে যাবে। ছেলেটা বদ সঙ্গে পড়ে বখে যাবে। আজকাল তো দুটো ভবিষ্যৎ মানুষের ছেলের। হয় মানুষ হও, না হয় গুন্ডা হও। গুন্ডারা যেন চৌবাচ্চার কই মাছ। নেতারা এসে বেছে বেছে তুলে নেবেন। মদত দেবেন। শেল্টার দেবেন। নেতারা হলেন রাজনীতির ইস্ক্রপ। গুন্ডারা হল ত্রু-ড্রাইভার। গদির প্লাইউডে ফিট করে দেবে। বাঁচবে না বেশিদিন। অপঘাতেই মরবে। তবু তো জীবিকা। বোম মেরে, ছুরি মেরে বাঁচা অথবা মরা। তাবীরই বলা চলে। মেয়ে দুটোরই বা কী করবে চিত্রা। প্রেম তো করবেই করবে। দেখতে শুনতে কেউ খারাপ নয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা যেমন হবেই হবে প্রেমও হবে। বিয়ে হবে। তারপর। ডির্ভোস। এক নম্বর স্বামী। স্বামী নম্বর দুই। তিন-চার। আজকাল একটা গান কানে আসে, এক, দো, তিন, চারপাঁচ, ছয়, সাত আট নয়, দশ, এগারো বারহ। মনে হয় ওটা বিয়েরই গান। চিত্রা যায় যাক, শিবির আগলে আমাকেই বসে থাকতে হবে। যুগকে ঠেকাতে পারব না, তবু চেষ্টা। বেঁচে থাকাটা কী সাংঘাতিক ভয়ের। আগুন নিয়ে খেলা। অপরেশ এল ম্লান মুখে। সুন্দর চেহারা ছিল। অভিনয় করত এক সময় শখের থিয়েটারে। প্রাইভেট ফার্মে ভালো চাকরি করত। আজ টানা তিন বছর প্রতিষ্ঠান বন্ধ। আজকাল এটা খুব জরুরি। কলকারখানা বন্ধ না হলে মানুষের ভালো হবে না। যেমন অপরেশের হচ্ছে। কাঠের মতো শরীর হয়েছে। লোহার মতো মুখ। কতরকমের চেষ্টা করছে সংসার চালাবার জন্যে। কিছু আর বাকি নেই। কোনওটাই তেমন লাগছে না।
অপরেশচিত্রাকে বলছে—’ছেঁড়াখোঁড়া, ফেলে দিলেই হয় এই রকম দু-একটা শাড়ি আছে? বড় উপকার হয়।’ এই অপরেশ আমার বাল্যবন্ধু। একই সঙ্গে জীবন শুরু করেছি। একই স্কুলে পড়েছি। একই মাঠে খেলেছি। অপরেশের কী প্রাণ ছিল! বন্ধুবান্ধব স্বজন, সবাই তাকে ত্যাগ করেছে। ওই যে বললুম, দারিদ্র বড় ঘৃণার।
চিত্রা দুটো নতুন শাড়ি অপরেশকে দিতে গেল। অপরেশ হাতজোড় করে বললে, ‘নতুন শাড়ি চাইনা বউঠান। ছেঁড়াখোঁড়া থাকে তো দিন। যা আপনি ফেলে দেবেন বা বাসনওলাকে দিয়ে দেবেন।
কিছুতেই নিলে না নতুন শাড়ি। চিত্রা বোঝাতে শেষে কেঁদে ফেললে।
