‘তা কী করে হয়! এখানে অনেককেই দেখছি যাঁরা টেরিটের প্যান্টশার্ট পরে এসেছেন। বড় বড় চুল। দে আর নট গরিব।’
চিৎকার উঠল ‘আমরা মডার্ন গরিব। বেকার বসে আছি বছরের পর বছর।’
‘আমি মডেল গরিব বেছে নেব।’
‘বেছে নেব মানে? এটা কি স্টেট লটারি? কে বেছে নেবে?
বড়মামা খুব অসহায়ের মতো বললেন, ‘সে কী রে বাবা, এরা যে দেখছি তেড়িয়া হয়ে উঠছে বেশ, জোর যার মুলুক তার। আপনারা পঁচিশজন বাকি সকলকে ঠেকিয়ে রাখুন। তাজিয়া
কাজিয়া যা হয় নিজেরাই ফয়সালা করুন।’
মার, মার, হই, হই রই রই। হেরে রে রে করে লোক ঢুকছে। যেন দশ আনার টিকিটের সিনেমার কাউন্টার খোলা হয়েছে। ভজুয়া পালাতে পালাতে বললে, ‘আরও আসছে বাবু। নারায়ণকা জুলুস নিকলেছে আজ।’
শ্যামজেঠা পালাতে পালাতে বললেন, ‘সুধাংশু প্রাণে যদি বাঁচতে চাও পেছনের দরজা দিয়ে পালাও।’
বড়মামা ভয়ে পেছোতে পেছোতে বললেন, ‘য পলায়তি স জীবতি। ব্যাপারটা বুফে লাঞ্চের মতো হয়ে গেল। যে পারে সে নিয়ে খাক।’
চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। বাঁশের খুঁটি উপড়ে ফেলেছে। একপাশের সামিয়ানা কেতরে গেছে। পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় পড়ে বড়মামার লাল মোটরবাইক তিরবেগে পশ্চিমে ছুটছে। মেজোমামা কাঁপতে কাঁপতে টেলিফোন ডায়াল করছেন।
‘হ্যাঁলো থানা। নরনারায়ণে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। বড় বড় থান ইট ছুড়ছে। ও সেভ আস, সেভ আস।’
ছ’টা কুকুর বাগানে নেমে পড়েছে খেপে গিয়ে। মাসিমার কানে অ্যায়সা তুলো ঢুকেছে কিছুতেই বের করতে পারছেন না। মাথার কাঁটা, দেয়াশলাই কাঠি যতই খোঁচাখুঁচি করছেন গ্লিসারিন তুলো ততই ভেতরে চলে যাচ্ছে। কেবল বলছেন, ‘এখনও চণ্ডীপাঠ হচ্ছে! শিলাবৃষ্টি হচ্ছে না কি রে?’
‘আর দাঁড়াতে পারছি না। আমার পা কাঁপছে। প্যান্ডিমোনিয়াম! আরে দুর মশাই, হারমোনিয়াম নয় প্যান্ডিমোনিয়াম।’
ভয়
আমার ভীষণ ভয় করে। কী করে কী হবে! শেষ পর্যন্ত পারব তো!
সমরেশকে দেখে এলুম। প্যারালিসিস হয়ে পড়ে আছে। ছেলে আর মেয়ে দুটো শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনও বড় হতে অনেক দেরি। ছেলেটা সবার ছোট। মাথায় মাথায় দুটো মেয়ে। স্কুল শেষ করে কলেজে। কলেজ শেষ করে হয় বিয়ে, না হয় চাকরির চেষ্টা। এই গোলাকার। পৃথিবীর ঘোর-প্যাঁচ তো অনেক। হায়না, নেকড়ে, শেয়াল, ষাঁড়ে ভর্তি। কেউ গুতোবে, কেউ খাবলাবে, কেউ আঁচড়াবে কামড়াবে। সবই সহ্য করতে হবে, কায়দা করে পাশ কাটাতে হবে। নিজের জীবন যেন, নিজেরই পায়ে ফুটবল। পেলের মতো পায়ে পায়ে কাটিয়ে এধার-ওধার করে গোলের জালে জড়িয়ে দিতে হবে। গোলাকারের গোলেমালে গোলের খেলা। খেলতেই হবে। যতদিন বাঁচা ততদিন খেলা। মাঠেই আমাদের জন্ম, মাঠ থেকেই চিতায়। দর্শক হওয়ার উপায় নেই। সবাই খেলোয়াড়। এ খেলার আইনে ফাউল নেই, পেনাল্টি নেই।
সমরেশের বিছানার মাথার দিকে তার স্ত্রী সুপ্রিয়া বসেছিল। বেশ রূপসি। সমরেশের বিয়ের দিন আমরা কম হইচই করেছি! একটু হিংসে যে হয়নি তা-ও নয়। সুন্দরী বউ। নিখুঁত সুন্দরী। বন্ধুবান্ধবের ভালো চাকরি হলে, সুন্দরী বউ হলে, প্রোমোশান হলে হিংসে হবে না! তাহলে আর বাঙালি হয়ে জন্মালুম কী করতে। সুপ্রিয়া খুব খোলামেলা, হাসিখুশি, হুল্লোড়ে মেয়ে ছিল। বিছানার মাথার দিকে বসে আছে। সুপ্রিয়ার ধ্বংসাবশেষ। সমরেশের কেউ কোথাও নেই। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল সুপ্রিয়ার ওপর। লেখাপড়া জানে। সমরেশের অফিসেই একটা চাকরিও পেতে পারে। মধ্যবয়সি, সুন্দরী মেয়েও কি খুব নিরাপদ। মনে হয় না। দেখছি তো চারপাশে। মানুষের খিদে বেড়েই চলেছে।
কী হবে, কে জানে! আমার ভীষণ ভয় করছে।
সুপ্রিয়া বলেছিল, ‘কেমন আছেন?’
ভদ্রতার প্রশ্ন। ভালো আছি, বলতে সংকোচ হল। কেউ অসুস্থ থাকলে নিজে ভালো আছি বলতে লজ্জা করে। অপরাধী বলে মনে হয়। তাই বানিয়ে, বানিয়ে নিজের কিছু অসুখের কথা বললুম। হার্ট দোল খাচ্ছে। রক্ত মিঠে হয়েছে। চাপ বেড়েছে।
সুপ্রিয়া বলেছিল, ‘সাবধান, এই লোকটাকে আমি বলে বলে পারিনি। স্বামীরা যদি স্ত্রী-র কথা একটুও শুনত।’
আমি আর বেশিক্ষণ বসিনি। ওই অবস্থায় যে কথাই বলি বোকা বোকা মনে হয়। একটা চলমান সংসার ব্রেকডাউন হয়ে মাঝপথে গোঁত্তা খেয়ে পড়ছে। এ এমন গাড়ি, ঠেলে স্টার্ট করানো যাবে না। মিস্ত্রি এনে মেরামত করানো যাবে না। গাড়ি পড়েই থাকবে। আরোহীরা এইবার যে যার ব্যবস্থা দেখে নাও।
রাস্তায় নেমে লোকজনের ভিড়ে নিজেকে বেশ হারিয়ে ফেলেছিলুম। সবাই চলছে। সবই চলমান। দোকানপাট, কেনাবেচা। মনে হল, এইভাবেই যখন সব চলে, চলে যাবে ঠিকই। কোথায় কোন ঘরে কে কাত হয়ে পড়ল, তা নিয়ে অত ভাবার কী আছে! মানুষের বরাত বলে তো একটা কথা আছে। যার যেমন বরাত। এইভাবেই আজ কাল হবে, কাল পরশু হবে। মনে মোটামুটি একটা বল এসে গেল। প্রবীণরা বলেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখো। তাই না হয় রাখব। একটা মাদুলি, কি পাথর পরব। মাসে একবার মন্দিরে যাব। পাপ-টাপ আর তেমন না-ই বা করলাম। আর আমার পাপ তো একটাই। মেয়েদের দিকে চোরাগোপ্তা তাকানো। সেটা মনে হয় এমন কিছু পাপ নয়। একটা বদ অভ্যাস। চুরি-জোচ্চুরি করি না। তোক ঠকাইনা। ভেজালের কারবার করি না। রাজনীতি করি না। বায়োস্কোপ করি না। আমার বউ চিত্রাকে আমি ভালোই বাসি। বধূ-নির্য্যাতন করি না। আমার বাবাও নেই, মা-ও নেই। বউয়ের কথায় তাঁদের অসম্মানের পাপ ইচ্ছে। থাকলেও করতে পারব না। তাঁরা আমার পথ পরিষ্কার করে রেখে গেছেন। অকারণে, বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হচ্ছে ভেবে, আমার শালিকে বউয়ের মতো করে আদর করেছিলুম। তা-ও জোর করে নয়। অনেক তেল দিয়ে তার অনুমতি নিয়ে। ‘আসতে পারি’,বলে নিপাট ভদ্রলোক। যেমন অন্যের দরজা ভেজানো ঘরে ঢোকে। তা ছাড়া শালিদের আদর করার অধিকার সব। জামাইবাবুরই আছে। শাস্ত্রসম্মত। এর জন্যে পক্ষাঘাত হবে না, বা হঠাৎ চাকরি চলে যাবে না। গেলে গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ বেকার হয়ে যেত। সবার আগে চাকরি যেত আমার অফিসের বড়কর্তার। তিনি তো সব মেয়েকেই ‘আবার খাবো’ সন্দেশ ভাবেন। কী কাণ্ডই যে করে বেচারা! মনটা সব সময় যেন ফলুই মাছের মতো লাফাচ্ছে তার। ওটা একটা রোগ। এক দাগ পালসেটিলা থারটি খেলেই সেরে যেতে পারে। কিছু অসুখ অনেকে ইচ্ছে করেই ভালো করে না। বেশ মজা লাগে। যেমন অনেকে দাদ পোষে। চুলকোতে ভালো লাগে বলে।
