হইহই ব্যাপার।
মেজোমামা এক ফাঁকে খুব গম্ভীর মুখে আমাকে ডাকলেন, ‘কী সব হচ্ছে হে! ভূতের নৃত্য!’
‘খুব মজা মেজোমামা। কত লোক আসবে। খাবে। দু-হাত তুলে খাবার সময় চিৎকার করে বলবে, জয় রাজা রাজেন মল্লিক।’
‘রাজা রাজেন মল্লিক! তোমার বড়মামা কি নাম পালটে ফেললে নাকি! নাম ভাঁড়িয়ে শেষে এই অসৎ কাজে নেমে পড়ল?’
‘আমি কী বলতে কী বলে ফেলেছি! আসলে বলবে, জয় রাজা সুধাংশু মুকুজ্যে।’
‘রাজা! কোথাকার রাজা? কাম্পুচিয়ার! ওই টাইমটেবিলটা আন তো।’
ড্রয়ারের ওপর থেকে টাইমটেবিলটা এনে মেজোমামার হাতে দিলুম। একটা পাতা খুলে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম, রাত ন’টা চল্লিশ।’
‘কোথায় যাবেন মেজোমামা!’
‘যেদিকে দু-চোখ যায়।’
‘সে কী!’
‘হ্যাঁ, তাই। পাগলামি অনেক সহ্য করেছি। আর নয়।’
‘দরিদ্রসেবা পাগলামি? অসৎ কাজ?
‘পরে বুঝবে। এখন যেমন নাচ্ছ নেচে যাও। সবুরে মেওয়া ফলবে। তখন মেও সামলাতে পুলিশ ডাকতে হবে।’
বড়মামা জিগ্যেস করলেন, ‘প্রফেসার কী বলছিল রে?’
‘বলছিলেন, অসৎ কাজের ঠেলা পরে বুঝবে কাম্পুচিয়ার রাজা।’
‘অসৎ কাজ!’ বড়মামা হইহই করে হেসে উঠলেন, ‘হিংসে, বুঝলি, হিংসে। সারাজীবন ছেলে। ঠেঙিয়ে কিছুই করতে পারল না, আমি এক কথায় ফেমাস হয়ে গেলুম। এখন পরিচয় দিতে গেলে বলতে হবে, সুধাংশু মুকুজ্যের ভাই। কোন সুধাংশু? আরে সেই ডক্টর সুধাংশু, গরিবের মা-বাপ।’
‘মেজোমামা তো রাত নটা চল্লিশের ট্রেনে যে দিকে দু-চোখ যায় সেই দিকে চলে যাচ্ছেন।’
‘তাই নাকি? হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী। ভজা, ভজা।’
বড়মামার পার্শ্বচর ভজা। ‘যাই বড়বাবু।’
‘চাল?’
‘আ গিয়া।’
‘ডাল?
‘ও ভি আ গিয়া।’
‘বহুত আচ্ছা। চা বানাও।‘
ভজা গান গাইতে গাইতে চলে গেল। গোয়ালে গরু তিনটে ফ্যালফ্যাল করে প্রায় খালি ডাবরের দিকে তাকিয়ে আছে। কালোটা হাম্বা করে ডেকে উঠল। মানে, এবার দুধ দেবার চেষ্টা করো, নয়তো মালিক খুব খেপে যাবে। ন্যাজ মলে বিদায় করে দেবে।
মঙ্গলের উষা বুধে পা। সানাইটাই যা বাজল না। তা ছাড়া সবই হল। সকালে মন্ত্র পড়ে উনুন পুজো হল। বাঁশ থেকে ফুলের মালা ঝুলল ঝুলুর ঝুলুর করে। কাগজের রঙিন শিকলি চলে গেল এপাশ থেকে ওপাশে। শ্যামজেঠা বেলতলায় বসে সকাল থেকে চণ্ডীপাঠ করলেন। বড়মামা। মাসিমাকে ডেকে বললেন, ‘কুসী, সকালে আমি আর তোদের বাড়িতে খাব না। সকলের সাথে ভাগ করে নিতে হবে অন্নপান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। আমি হর্ষবর্ধন। সঙ্গমে স্নান করে নিজের পরনের কাপড়টা পর্যন্ত দান করে দোব…।’
‘তারপর নেংটি পরে কুয়োতলায় ধেই ধেই করে নাচব।’ মাসিমা রেগে চলে গেলেন। মেজোমামা দোতলার বারান্দা থেকে মাসিমাকে চিঙ্কার করে বললেন, ‘ভুলে যাসনি, আমার ট্রেন রাত নটা চল্লিশে।’
ওদিকে বেলতলায় শ্যাম জেঠার উদাত্ত গলা, ‘রূপং দেহি, ধনং দেহি যশো দেহি। জোড়া উনুনে আগুন পড়েছে। গলগল করে ধোঁয়া উঠছে আকাশের দিকে গাছের ডালপালা ভেদ করে।
মেজোমামা খুব উত্তেজিত হয়ে বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘সেই সাত সকাল থেকে দেহি দেহি শুরু হয়েছে। যার অত দেহি দেহি সে হবে দাতা কর্ণ!’
ছ’টা কুকুর বাড়ি একেবারে মাথায় করে রেখেছে। যত অচেনা অচেনা লোক দেখছে ততই ঘেউ ঘেউ করছে। মাসিমা গ্লিসারিনে তুলো ভিজিয়ে কানে খুঁজে রেখেছেন। কোনও কথাই শুনতে পাচ্ছেন না। সে এক জ্বালা! জল চাইলে তেল এনে দিচ্ছেন।
পেয়ারা গাছের ডালে কাঁসার ঘড়ি বাঁধা হয়েছে। সাবেক কালের জিনিস। বেলা একটার সময় ঠ্যাং করে বাজিয়ে ঘোষণা করা হবে—শুরু হল। সবাই বসে পড়ো।
দেখতে দেখতে একটা বেজে গেল। ভজুয়া দাঁত-মুখ খিচিয়ে, চোখ বন্ধ করে, দু-হাতে একটা। লোহার রড ধরে ঘড়িতে ঘা মারল। সারা এলাকা কেঁপে উঠল ঠ্যাং শব্দে। আওয়াজ বটে। কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।
সবার আগে এল জয় নিতাইয়ের দল। সপরিবারে, হইহই করে। সকলেরই নাকে নিখুঁত রসকলি। বোষ্টুম, বোস্টমি, গেঁড়ি পেঁড়ি ছেলেমেয়ে। এটা লাফায়, ওটা ছোটে। বড়টা ছোটটার মাথায় গাঁট্টা মারে। ছোটটা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। মা সবক’টাকে ধরে পাইকারি পিটিয়ে দেয়। ‘ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি’, শ্যাম জেঠার আর্তনাদ।
‘বসে পড়ো সব, বসে পড়ো সব।’
ফোল্ডিং চেয়ার উলটে চার বছরের ছেলেটা মাটিতে চিতপাত হল। বুকের ওপর চেয়ার। পায়ায় ঠ্যাং জড়িয়ে গেছে।
‘জয় নেতাই পড়ে গেছে রে বাপ। খেঁচকে তোল আপদটাকে।’
‘তুলসীগাছ কোন দিকে?’
‘তুলসীগাছ কী হবে গো?’ ভজুয়া জিগ্যেস করল।
‘দুর বেটা খোট্টা। তুলসীপাতা ছাড়া ভোগ হয়!’ বড়মামার তুলসীঝাড় ফাঁক। ‘পঁচিশ কোথায়? পিল পিল করে লোক আসছে।
বড়মামা আঁতকে উঠলেন, ‘মরেছে, এ যে রাজসূয় যজ্ঞ রে? হাঁড়ি নয়, ড্রাম ড্রাম খিচুড়ি লাগবে। স্টপ দেম। অ্যানাউনস করে দে, পঁচিশ জনের বেশি নয়। গেটটা বন্ধ করে দে রাসকেল ভজুয়া।’
‘গেট বন্ধ করে আটকানো যাবে না ডাগদারবাবু। গেট টপকে চলে আসবে।’
‘ধাক্কা মেরে বের করে দে।’
‘মেরে শেষ করে দেবে বাবু।’
বড়মামা গলা চড়িয়ে বললেন, ‘শুনুন, শুনুন আমাদের এই আয়োজন মাত্র পঁচিশ জনের জন্যে।’
প্রত্যেকেই চিৎকার করে উঠল, ‘আমি সেই পঁচিশ জনের একজন।’
