বড়মামা নেচে নেচে মোটরসাইকেল স্টার্ট করলেন। ভু, ভটভট শব্দে আকাশ ফেটে গেল। গাছের ডালপালা থেকে পাখি উড়ে পালাল ভয়ে। গঙ্গার দিকে রাস্তাটা যতই এগোচ্ছে ততই ঢালু হচ্ছে। ইটের গোলা, খড়ের গোলা, বাঁশের গোলা, খড়কাটা কল চলছে ঘসঘস করে।
মোচ্ছবতলাতেই আমাদের প্রথম বউনি হল। একটি লোক উদাস মুখে বসে আছে। যেন জীবনের সব কাজ শেষ। হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। মুখে অল্প অল্প কাঁচাপাকা দাড়ি। কোটরে বসা ঘোলাটে চোখ। শীর্ণ শীর্ণ হাত-পা। ভাঙা গাল। বকের মতো গলা!
‘বড়মামা-আ।’
‘দেখেছি।’
‘সব মিলছে। তবে নাকে তিলক সেবা করেছে।’
‘তা করুক। বৈষ্ণব, বুঝেছিস।’ বড়মামা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে নেমে পড়লেন। এইবার কথাটা পাড়বেন। লোকটির কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। কে না কে। জগতে কোনও কিছুর পরোয়া করে না। এইরকম একটা ভাব। বড়মামা প্রথমে গঙ্গাদর্শন করলেন। তারপর মোচ্ছবতলায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। এইবার কী করেন দেখি।
লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নমস্কার হই।’
লোকটি বললে, ‘জয় নেতাই।’ বড়মামা বললেন, ‘জয় নিতাই।’
লোকটি বললে, ‘দেশলাই আছে?
‘দেশলাই তো নেই।’
সিগারেট আছে?
‘সিগারেট তো খাই না।’ বড়মামা যেন খুব লজ্জা পেলেন।
‘জয় নেতাই। পঞ্চাশটা পয়সা হবে?’
বড়মামার মুখের দিকে চেয়ে মনে হল আশার আলো ফুটেছে। এতক্ষণে লোকটি এমন একটা জিনিস চেয়েছে যা বড়মামার কাছে আছে। পকেট থেকে একটা গোল টাকা বের করে লোকটির হাতে হাসি হাসি মুখে দিলেন।
‘জয় নেতাই। পঞ্চাশটা পয়সা আবার ফেরত দিতে হবে না কি?’
‘না না, পুরোটাই আপনার। এইবার একটা কথা বলব?’
‘কী? কেউ মরেচে নাকি?’
বড়মামা চমকে উঠলেন, ‘কেউ মরবে কেন? ‘আমার সঙ্গে লোকের কথা মানেই তো, কেউ মরেছে, দুখী বোস্ট্রম চললা হে কেত্তন গাইতে হবে।’
‘না না ওসব নয়, ওসব নয়। অন্য কথা। আপনি খেতে পারবেন!
‘খেতে? কী খেতে? শ্রাদ্ধ!’
‘না নাশ্ৰাদ্ধট্রাদ্ধ নয়। এমনি খাওয়া। রোজের খাওয়া। ভোগ আর কি।’
‘কোন আশ্রম! আমি চরণদাস বাবাজির চেলা। অন্য ঘরে নাম লেখাতে পারব না। ধম্মে সইবে না।’
‘আশ্রম নয়। আমার বাড়িতে।’
‘কার পাচিত্তির! কী অসুখ?’
‘পাচিত্তির মানে? ও বুঝেছি। প্রায়শ্চিত্ত। নানা প্রায়শ্চিত্ত নয়। জাস্ট এমনি খাওয়া।’
‘বদলে কী করে দিতে হবে? বেড়া বাঁধা, ছুঁটে দেওয়া, চেলা কাঠ কাটা, খড় কাটা!
‘কিছু না, কিছু না, ওসব কিছুনা। রোজ একটা নাগাদ যাবেন, খাবেন-দাবেন, চলে আসবেন।’
‘কী খাওয়া!’
‘খিচুড়ি, ভাজাটাজা এই আর কী।’
‘কী ডাল? মুসুর ডাল চলবে না। মুগ হওয়া চাই।’
‘তাই হবে।’
‘কী চাল? আলো না সেদ্ধ।’
‘ধরুন সেদ্ধ।’
‘হ্যাঁ, সেদ্ধই ভালো। আলোতে পেট ছেড়ে দেবে। ও বেধবাদেরই চলে। রেশনের কাঁইবিচি চাল, না বাজারের চাল?’
‘বাজারের, খোলা বাজারের ভালো চাল।’
‘ঘি পড়বে, না খসখসে খেসকুটে? খিচুড়িতে ঘিনা পড়লে টেস্ট হয় না।’
‘হ্যাঁ, তা পড়বে।’
‘শালপাতায়, না কলাপাতায়, না চটা ওঠা এনামেলের থালায়!’
‘না না, ধরুন শালপাতায়।’
‘হ্যাঁ, এনামেল হলে খাব না। তা শেষ পাতে একটু মিষ্টি না থাকলে জল খাব কী করে? বোস্টম মানুষ। একটু পায়েস হলেই ভালো হয়।’
‘সপ্তাহে তিন দিন।’
‘রোজ হলেই ভালো হয়। যাক যাক মন্দের ভালো। হ্যাঁ একটা কথা, বোস্টমিকে নিয়ে আমরা সাতটি প্রাণী। সপরিবারে না আমি একলা?’
বড়মামার মুখ দেখে মনে হল আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছেন, ‘সাত জন? বলেন কী? এ দেখছি। মেঘ না চাইতে জল। না না, একা নয়, একা নয়। সপরিবারে।’
‘জয় নেতাই। তা হলে কবে থেকে?’
‘আজ হল গিয়ে রোববার। সোম, মঙ্গল, বুধ। হ্যাঁ বুধ ভালো বার।’
‘প্রভুর নিবাস?’
বাব্বা, বড়মামা প্রভু হয়ে গেলেন। মেজোমামা একবার শুনলে হয়। জ্বলে যাবেন। বড়মামা বাড়ির নির্দেশ দিতেই লোকটি বললে, ‘অ, আমাদের কেদারবাবুর বড় ছেলে। সেই ছিটেল ডাক্তার।’বড়মামার মুখটা কেমন হয়ে গেল, ‘ছিটেল বললেন!’
‘ছিটেলকে ছিটেল বলব না! সবাই জানে ডাক্তারটা খেয়ালি।’
আমিই সেই ডাক্তার।’
‘সে আগেই বুঝেছি। হক কথা বলব ভয়টা কীসের! উকিল আর ডাক্তার শেষ জীবনে পারের কড়ি কুড়োতে চায় ধম্মকম্ম করে। সারা জীবনের অধম্মের পয়সা। একজন মারে মক্কেল, আর। একজন মারে রুগি। দেখেন না, আজকাল মন্দিরে, আশ্রমে কত ভিড়! সব ওই ভেজালদার, কালোবাজারি, ডাক্তার, উকিল, এমএলএ, মন্ত্রী।’
ভটভট করে মোটরবাইকে আসতে আসতে বড়মামা বললেন, ‘কী রকম ট্যাঁকট্যাঁকে কথা শুনেছিস! এই জন্যে লোকের ভালো করতে নেই। নেহাত সেদিন বইয়ে পড়লুম, লিভ, লাভ। অ্যান্ড লাফ; তা না অ্যায়সা রাগ ধরেছিল। যাক বরাতটা খুব ভালো। এই বাজারে সাত-সাতটা লোক পাওয়া! বাকি রইল আঠারোটা।’
‘ভাববেন না বড়মামা। ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে। একবার খবরটা ছড়াতে দিন।’
আরও টহল মারা হল। এবার আর চারে মাছ পড়ল না, যাক সাতটা পড়েছে। ভালো ক্যাচ। বড়মামার বৃদ্ধ কম্পাউন্ডারের নাম সতুবাবু। ভার দেওয়া হল আরও আঠারোজন সংগ্রহ করার। ‘পারবেন তো!’
‘হ্যাঁ’ সতুবাবু অবজ্ঞার হাসি হাসলেন, ‘আঠারো কেন, আঠারোশো ধরে এনে দিতে পারি।’ বেলা বারোটা নাগাদ লোকলশকর নিয়ে বড়মামা নেপোলিয়নের মতো মার্চ করে বাড়ি ঢুকলেন। একজন বাগানের আগাছা পরিষ্কার করবে, বাঁশ বাঁধবে। একজন উনুন পাতবে। একজন দরমা ঘিরবে। মাসিমা সেই পল্টন দেখে হাঁ হয়ে গেলেন। এখনই হুকুম হবে, চা দে কুসী, চাল নে, সব ভাত খাবে।
