মাসিমা বললেন, ‘পঁচিশ কেজি!’
বড়মামা অবাক হয়ে বললেন, ‘নার্ভাস করে দিচ্ছিস। বল, পঁচিশ পো, মিন্স ওই ছ’সের। মিনস ব্ল্যাকে কিনলে আঠারো টাকা। এইবার ডাল। ছ’সের চালে কত ডাল লাগে রে? ফর্মুলাটা কী?
‘চালের ডবল ডাল।’
‘ভাগ ভাঙচি দিচ্ছিস, হাফ ডাল। হাফ মিনস তিন কেজি, পনেরো টাকা। আঠারো প্লাস পনেরো ইজিকলটু তেত্রিশ। ইত্যাদি আরও সাত মানে চল্লিশ। কয়লা, রান্না ইত্যাদি দশ। রোজ পঞ্চাশ টাকা, নাথিং, নাথিং। চল ভাগনে লেগে পড়ি।’
বড়মামার সে কী উৎসাহ! তড়াং করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। মাসিমা বললেন, ‘ভাগনে কীভাবে লেগে পড়বে?’
‘যে ভাবে লাগাব সেইভাবে লাগবে। ওর মতো ছেলে লাখে একটা মেলে কিনা সন্দেহ!’
‘সে তো বুঝলুম; কিন্তু তোমার এই রাজসূয় যজ্ঞে ও কি ঘোড়া ধরতে বেরোবে!’
‘আমাদের এখন কত কাজ জানিস? আটচালা তৈরি। রাঁধবার লোক ঠিক করা। উনুন বসানো। চাল-ডাল কেনা। তারপর প্রচার।’
‘প্রচার মানে?’
‘প্রচার মানে?’ বড়মামা রেগে গেলেন। ‘প্রচার মানে প্রচার। লোকে জানবে কী করে? না জানতে পারলে তোক আসবে কী করে!’
‘অ। তা সেটা কীভাবে হবে, কাগজে বিজ্ঞাপন, বিবিধভারতী, দেওয়ালে পোস্টার, মাইক নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা, সিনেমায় স্লাইড। কোনটা?
‘ভ্যাক, ওর কোনওটাতেই কাজ হবে না। দুস্থ মানুষ যারা পড়তে জানে না, যাদের পয়সা নেই সিনেমা দেখে না, তাদের অন্যভাবে জানাতে হবে। ভোটের লিস্ট তৈরির মতো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে প্রকৃত গরিব মানুষ খুঁজে বের করে হাত জোড় করে সবিনয়ে বৈষ্ণবদের মতো বলতে হবে, দয়া করে এই অধমের গরিবখানায় প্রসাদ গ্রহণ করবেন।’
মাসিমা বললেন, ‘ডাক্তারি তা হলে মাথায় উঠল!’
‘যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না, ইডিয়েট। যা আর এক কাপ চা করে আন। বেরিয়ে পড়ি। তোদের মতো আলস্যযোগে জীবন ম্যাসাকার হতে দেব না। কর্মযোগ। কর্মযোগ। যোগ কর্মসু কৌশলম। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিল। গীতা পড়েছিস গবেট?’ মাসিমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বড়মামা প্যান্ট-জামা পরে তৈরি হওয়ার জন্যে পরদার আড়ালে অদৃশ্য হলেন।
মাসিমা ঠক করে চায়ের কাপ টেবিলে রাখলেন। বড়মামা চমকে মুখ তুলে তাকালেন। কাগজে দক্ষিণ পাড়ার ম্যাপ আঁকছিলেন। যে যে রাস্তা ধরে আমরা যাব তারই পরিকল্পনা।
‘খুব রেগে গেছিস মনে হচ্ছে!’
‘রাগলে তোমার আর কী? তুমি কারও পরোয়া করো? তবে তোমার এই সব ব্যাপার মেজদা জানে?’
‘হু ইজ মেজদা? তার দর্শনে জীবে দয়া নেই, জিভে দয়া আছে। ভগবান একটানা দুটো, না শূন্য,
ভগবান আমি না আমিই ভগবান, তিনি সাকার না নিরাকার, এই গোলকধাঁধাতেই বেচারা সারা জীবন বোকার মতো ঘুরতে ঘুরতে ম্যাড হয়ে গেল। তুই যা তুই যা। আমাদের এখন অনেক। কাজ। মেয়েদের সঙ্গে বকবক করার সময় নেই।’
মাসিমা বেশ বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। আমি বললুম, ‘বড়মামা, হাওয়া খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না।’
‘রাখ রাখ, ঝোড়ো হাওয়াতেই আমাদের নিশান উড়বে পতপত করে।’
মোটরসাইকেলে উঠতে উঠতে বড়মামা বললেন, ‘প্রথমে একবার চক্কর মেরে যাই। তুই শুধু। চোক-কান সজাগ রেখে দেখে যাবি। যেই মনে হবে এই লোক সেই লোক, সঙ্গে সঙ্গে আমার পিঠে খোঁচা। গাড়ি থামিয়ে তাকে যা বলার আমি বলব।’
বড়মামার মোটরসাইকেল। তার যেমন রং তেমন আওয়াজ। কানে তালা লেগে যাবার মতো অবস্থা। শক্ত করে ধরে বসে আছি। পকেটে সেই ম্যাপ। বীরেন শাসমল রোড দিয়ে ঢুকে, রাম ঢ্যাং রোডে পড়ে, শরৎচন্দ্র স্ট্রিট হয়ে, কালু শেখ রোড ধরে বিরাট একটা চক্কর মারা হবে। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই বড়মামার অন্নসত্রে আসতে পারবে। বড় বড় হরফে দমার গায়ে লেখা থাকবে, ‘শক, হ্ন, দল, মোগল পাঠান এক দেহে হল লীন।’
সবে সকাল হয়েছে। রাস্তায় বেশ লোক চলাচল। সকলেই যে যার কাজে চলেছেন। কেউ বাজারে। কেউ স্কুলে ছেলে-মেয়ে পৌঁছোতে। কেউ অফিসে। চারপাশের দোকানপাট খুলে গেছে। জমজমাট ব্যাপার। সাইকেলের সামনে কাগজ ডাঁই করে হকার চলেছেন বাড়ি বাড়ি কাগজ দিতে। চোখে এমন একজনও পড়ছে না যাকে মনে ধরে। বড়মামা বলে দিয়েছিলেন, ‘দেখবি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, জটপাকানো চুল, গর্তে বসা চোখ, শির বের করা হাত, সামনে কুঁজো হয়ে কুঁকতে ধুকতে চলেছে, কিংবা উদাস হয়ে রকে কি গাছতলায় বসে আছে, বিড়বিড় করে আপন মনে বকছে, দেখলেই বুঝবি এই সেই লোক, দি ম্যান।।
অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর বড়মামা একটা বটগাছ তলায় গাড়ি থামিয়ে বললেন, ‘দেশের কীরকম উন্নতি হয়েছে দেখছিস! গরিবি হাটাও তো সত্যিই গরিব হাটাও, সবাই ওয়েল-টু-ডু ম্যান। একটা লোকও চোখে পড়ল না!’
‘বুধবার তা হলে পাল-পাল ভিখিরি আসে কোথা থেকে?’
‘আরে দুর। বুধবার এ তল্লাটের মিল-ফিল বন্ধ থাকে, পালে পালে সব বেরিয়ে পড়ে উপরি রোজগারের ধান্দায়। ওরা কেউ রিয়েল ভিখিরি নয়।’
‘আমার কী মনে হয় জানেন?
‘কী?’
‘আমরা যাদের খুঁজছি তারা কেউ আর উঠে হেঁটে বেড়াতে পারছেনা। কোথাও না কোথাও ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে আছে।’
‘হতে পারে। কিন্তু কোথায় শুয়ে আছে?’
‘মনে হয় গঙ্গার ঘাটে, মোচ্ছবতলায়, শ্মশানে পাকুড়তলার বাঁধানো চাতালে।’
বড়মামা খুব তারিফ করলেন, ‘মন্দ বলিসনি। উঠতেই যদি পারবে তা হলে তো খেটে খাবে। না খেতে পেয়ে সব লটকে পড়ে আছে। ঠিক বলেছিস। বড় হয়ে তুই ব্যারিস্টার হবি। চল তা হলে মোচ্ছবতলাতেই আগে যাই।’
