‘আমি একটা লঙ্গরখানা খুলব।’
‘লঙ্গরখানা?
‘কিছুই জানিস না? রোজ হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি তৈরি করে দুপুরবেলা দরিদ্র মানুষদের খাওয়াব। রাজা রাজেন মল্লিকের মতো। দাতব্য চিকিৎসালয় খুলে ফ্রি চিকিৎসা চালাব। একটু একটু করে আমার এই সমাজসেবা এমন চেহারা নেবে—হেঁ হেঁ।’
‘হেঁ হেঁ মানে?’
‘হেঁ হেঁ মানে মাদার টেরেসা! তোর মেজোকে বলে আয় মনের জোর, ইচ্ছাশক্তি, তেজ আর ত্যাগ থাকলে নোবেল পুরস্কার পাওয়াটা এমন কিছু শক্ত কাজ নয়। শুধু পুডিং খেলেই হয় না, পুডিং খাওয়াতেও হয়। আমি আমি করলে নিজের ভুঁড়িটাই বাড়ে। তুমি তুমি করলে আমিটা পেল্লায় বড় হয়ে বিশ্ব-আমি হয়। বিশ্বামি ভবেৎ?’
‘বিশ্বামি?’
‘হ্যাঁ স্বরসন্ধি। আকারের পর আকার থাকিলে উভয় মিলিয়া দীর্ঘাকার হয়। এখুনি জিগ্যেস করবি দীর্ঘাকার কী? দীর্ঘ প্লাস আকার। এও স্বরসন্ধি!’
‘মেজোমামাকে এখুনি বলে আসব?’
শিয়োর! নাকের ডগায় রাসেল নিয়ে বসে আছে, বার্ট্রান্ড বানান জানে না।’ যাক বাবা, বড়মামার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া গেছে। মেজোমামার ঘরে গিয়ে ঘুম লাগাই।।
সকালবেলা বড়মামাকে ঘরে পেলুম না। অথচ এই সময়ে ঘরে থাকারই কথা। লাল টকটকে সিল্কের লুঙ্গি। খোলা গা। পিঠের ওপর ইয়া মোটা সাদা পইতে। তাতে আবার একটা আঙটি বাঁধা। হাতের আঙুলে জায়গা নেই। আঙটি কোমরের কাছে ঝুলছে। চেয়ারে বাবু হয়ে বসা। ছ’টা কুকুর ঘরময় হ্যা হ্যা করছে। এক-একটা পালা করে লাফিয়ে উঠে বড়মামার হাত থেকে বিস্কুট ছিনিয়ে নিচ্ছে। মনে মনে হিসেব করে এক-একটা বদমাইশকে ধরে ফেলেছেন, ‘উঁহু উঁহু, তোর দুটো হয়ে গেছে এইবার ওইটার পালা।’ কে কার কথা শোনে, সবক’টাই ঘাড়ে ঘাড়ে লাফাচ্ছে। মাঝে-মাঝে পইতেতে পা আটকে যাচ্ছে। বড়মামা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘এইবার। সবক’টাকে দূর করে দোব। ইনডিসিপ্লিনড জানোয়ার।’ বলেই পইতের ঝোলা অংশ তুলে কপালে ঠেকাচ্ছেন।
কোথায় সেই পরিচিত দৃশ্য! ঘরময় কুকুরের ছড়াছড়ি! প্রভু বেপাত্তা।
দক্ষিণের জানালায় উঁকি মেরে দেখি বড়মামা বাগানের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখের চেহারায় ভীষণ ভাবনা। কী হল কে জানে? হঠাৎ চোখাচোখি হতেই ইশারায় ডাকলেন। বাগানে নামতেই আমাকে বললেন, ‘বুঝলি এইখানেই হবে।’
‘কী হবে বড়মামা? নারকেল গাছ?’
‘আরে না রে না। তোর কেবল খাবার চিন্তা।’
‘তবে?
‘এইখানে হবে সেই লঙ্গরখানা। একপাশে বিশাল উনুন। আর একপাশে সারি সারি টেবিল আর ফোল্ডিং চেয়ার। ওই কোণে কল আর জল। এইখানটায় একটা পেটা ঘড়ি। ঢ্যাং করে যেই একটা বাজবে, খাওয়া স্টার্ট। দুটোর মধ্যে যারা যারা আসবে তারাই খেতে পাবে। একটা থেকে দুটো। কড়া নিয়ম।
‘টেবিল, চেয়ার?’
‘তবে না তো কী? দরিদ্র নারায়ণ সেবা। ভেজিটেবল খিচুড়ি আর যে-কোনও একটা ভাজা। সপ্তাহে একদিন চাটনি। চল এইবার চট করে হিসেবটা করে ফেলি।’
বড়মামা ঘরে ঢুকতেই কুকুরগুলো মুখিয়ে ছিল; সকালের বিস্কুট পায়নি। চারপাশ থেকে হেঁকে ধরল। একটা পায়ের কাছে। একটা পেছনের দিকে পিঠের ওপর দুটো পা রেখে দাঁড়িয়ে উঠেছে। একটা সামনের দিকে ক্রমান্বয়ে লাফাচ্ছে। বড়মামা বললেন, ‘উঃ, পাওনাদারদের জ্বালায় জীবন। গেল।’
বিস্কুট পর্ব শেষ হতে না হতেই মাসিমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সবক’টা কুকুরকে একজায়গায় দেখে বললেন, ‘পয়সার কী জ্বালা! কত মানুষ না খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে আর কারুর আধডজন কুকুর রোজ এক কেজি হরলিকস-বিস্কুট দিয়ে ব্রেকফাস্ট করছে। উৎপাতের ধন এই ভাবেই চিৎপাতে যায়!’
‘ঠিক বলেছিস কুসী।’
বড়মামার সমর্থন শুনে মাসিমা ভীষণ অবাক হলেন, ‘অ্যাঁ, ভূতের মুখে রাম নাম!’
বড়মামা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এবারে অন্য রাস্তায় যাত্রা। কমপ্লিট বিবেকানন্দ! জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর! প্রথমে পঁচিশজন দিয়ে শুরু, ধীরে ধীরে একশো, দুশো, তিনশো, পাঁচশো, হাজার।’
মাসিমা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘হাজার কুকুর! অত কুকুর পাবে কোথায়?
‘গবেট! কুকুর নয়, কুকুর নয়, মানুষ। দরিদ্র নারায়ণ সেবা!’
‘সে আবার কী? বারোয়ারি পুজো প্যান্ডেলে ফি-বছর একদিন নারায়ণ সেবা হয়। তুমি তার
প্রেসিডেন্ট হলে নাকি?’
‘আজ্ঞে না স্যার। এ হবে সুধাংশু মুখোপাধ্যায়ের ফ্রিকিচেন, জাস্ট লাইক রাজা রাজেন মল্লিক অফ মার্বেল প্যালেস। আজই নগেনকে ডেকে বাগানে একটা আটচালা তৈরির হুকুম দিচ্ছি। কালই খগেন এসে উনুন করে দেবে। পরশু আসবে চাল, ডাল, আলু, নুন, তেল, মশলা,। তেজপাতা। তরশু বেলা একটা। দেখবি সে কী কাণ্ড! গরমাগরম খিচুড়ি খেয়ে তোক দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করতে করতে চলেছে–লং লিভ রাজা, সরি, ডাক্তার সুধাংশু মুকুজ্যে।’
‘সর্বনাশ!’
‘সর্বনাশকী রে! বিবেকানন্দ বলে গেছেন, জন্মেছিস যখন দেয়ালের গায়ে একটা আঁচড় রেখে যা। তুই হবি এই নারায়ণ যজ্ঞের সুপারভাইজার। এক সেকেন্ড বোস তো। তোর পরামর্শে হিসেবটা সেরে নিই। ধর পঁচিশজন।’
মাসিমা ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন।
‘তুমি দেউলে হয়ে যাবে বড়দা! তুমি নিজে মরবে, আমাদেরও মারবে।’
‘আমি মরি মরব। জন্মিলে মরিতে হবে। তোরা মরবি কেন! বালাই ষাট। নে, বল, পঁচিশজনে ডেলি কত চাল খেতে পারে? পেট ভরে খাবে, হাফভরা নয়, ফুলভরা।’
