রাত নেমেছে। বাইরের দৃশ্য অদৃশ্য। ট্রেনের যা কাজ! চলছে তো চলছেই। ঘরে ঘরে নানা জাতির নানা ভাষার লোক। কামরার আলোর জোর বেড়েছে। সকলেরই চোখ নিদ্রালু। বউদি আর মহিমা যেন দুই বোন। জানলার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। পাশের কুপেতে কে একজন। হেঁড়ে গলায় ভীষণ চেল্লাচ্ছে। কোন কোম্পানির সেলফোন কে জানে! টাওয়ার পাচ্ছেনা।
দাদা বললে, তোর ফোনে ভূপাল ধরা যাবে?
উত্তর আমাকে দিতে হল না। দিলেন রেলকর্মী। জিগ্যেস করতে এসেছিলেন, ভেজ অর নন। ভেজ? হাসি-খুশি, তরতাজা এক যুবক। অপূর্ব গলায় গান গেয়ে উঠলেন, প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে। বিএসএনএল-এর লাইন রেললাইনের মতো দেশ হতে দেশান্তরে জীবন হতে জীবনে সঞ্চারিত। বসুধৈব কুটুম্বকম। এত সুন্দর গলা! গান করেন না কেন? যুবকের উত্তর, চাকার গান শুনি।
এ সুখধরণীতে কেবলই চাহ নিতে, জান না হবে দিতে…।
ছোট্ট যন্ত্রের নীল চোখে আবার বার্তার কম্পন। মিন্টুর গলা, বউদি! তোমরা কত দূরে?
আমরা তোমার হাতের মুঠোয়। বুকপকেটে বিশ্ব ঘোরে। আঙুলে আকাশ। যাঃ, ক্যাশকার্ড ফুরোল। কথা কি ফুরবার উপায় রেখেছেন বিএসএনএল! কণ্ঠ রিফিল সর্বত্র সহজলভ্য। ঘণ্টা দরে দোকানে দোকানে। ভরো আর কও। অফুরন্ত কথা!
বড়মামা ও নরনারায়ণ
বড়মামা খেতে খেতে বললেন, ‘আমি একটা গাধা।’
মেজমামার বাঁ হাতে একটা বই, ডান হাতে ঝোলে ডোবানো রুটির টুকরো। এইটাই তাঁর অভ্যাস। সামান্য সময়ও নষ্ট করা চলবে না। অগাধ জ্ঞানসমুদ্র, আয়ু অল্প, বহুবিঘ্ন। সব সময় পড়ে যাও, সকালের কাগজ বাথরুমে বসে বসেই পড়েন। এখন যে বইটা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন, সেটা কাক সম্বন্ধে। কাকের স্বভাব, কাকের নিয়মনিষ্ঠা। পড়তে পড়তে বললেন, ‘কী। করে বুঝলে! তোমার কান দুটো অবশ্য একটু বড়ই, ঝোলা ঝোলা, সাধারণ মানুষের কান অত বড় হয় না। প্রকৃতির ব্যাপার। বোঝা শক্ত। কে যে কীভাবে জন্মায়! চিনে মেয়েদের শিং বেরোচ্ছে। কলকাতায় ছেলেদের ন্যাজ বেরোচ্ছে।’
রুটির টুকরোটা মুখে ঢোকালেন। কোলের ওপর এক ফোঁটা ঝোল পড়ল। আগেও দু-এক ফোঁটা পড়েছে। দৃকপাত নেই। জ্ঞানতপস্বী।
বড়মামা বললেন, ‘আমি গাধা, তার প্রমাণ আমার গরু। আমার মতো গাধা না হলে কেউ ওরকম তিনটে গরু পোষে না। তোরাই বল, ওই গরু তিনটে আজ পর্যন্ত ক’ছটাক দুধ দিয়েছে?’
মাসিমা যেন বেশ খুশিই হলেন, ‘ঠিক বলেছ বড়দা! গরু দিয়েই প্রমাণ করা যায় তুমি একটা গাধা।’
মেজমামা সব সময় বাঁকা পথ ধরেন। প্রতিবাদ করার জন্যে মুখিয়ে আছেন। বড়মামা বলেন, প্রোটেস্টান্ট। মেজোমামার উচিত ছিল চুপ করে শুনে যাওয়া। তা আর হল কই! হঠাৎ বলে। বসলেন, ‘কেন? ওয়ান্স আপন এ টাইম তোমার কালো গরুটা হঠাৎ দিন তিনেক দুধ দিয়ে। ফেলেছিল। তুমি সেই দুধ দেখে কলকাতায় রবারের জুতো পায়ে দিয়ে নাচতে নাচতে পিছলে। পড়ে গিয়েছিলে। একদিন গরুর অনারে সত্যনারায়ণ পুজো হয়েছিল। তুমি বলেছিলে সিন্নি খেয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, দুধে এতই নাকি ফ্যাট। একদিন মেজারিং গ্লাসে করে প্রত্যেককে এক আউন্স করে দুধ খাইয়েছিলে। সেই খাঁটি দুধ খেয়ে আমাদের সব পেট খারাপ হয়ে গেল।
গরুর ভাষা নেই। প্রতিবাদ করতে জানে না বলে যা খুশি তাই বলে যাবে?’
‘হ্যাঁ, দিয়েছিল ঠিকই। তারপর? তারপর আর দিয়েছে কি?’
‘কেন দেয়নি?’
‘তোর মতো একগুঁয়ে স্বভাব বলে দেয়নি। দিতে পারি তবু দোব না। কী করতে পারো করো।’
মেজোমামা এবার সশব্দে চেয়ার ঠেলে উঠে পড়লেন, ‘আমি আর তোমার ভুলো কালো গরু এক শ্রেণিতে পড়লুম! অসম্ভব। আর সহ্য করা যায় না।’ মেজোমামা বিদ্যাসাগরী চটির ফটাস ফটাস শব্দ তুলে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। খুব রেগে গেছেন! যাক বাবা পুডিংটা শেষ করে গেছেন।
মাসিমা বললেন, ‘তোমার বড়দার ভীষণ পেছনে লাগা স্বভাব!’
বড়মামা বললেন, ‘গাধার ভাই গরুই হয়। আমাদের ভায়ে ভায়ে হচ্ছে, তুই এর মধ্যে নাক গলাতে আসিসনি।’
‘ঠিক আছে।’
মাসিমাও রাগ করে উঠে গেলেন। বড়মামা আমাকে বললেন, ‘এদের আজ কী হয়েছে বল তো? কথায় কথায় রেগে যাচ্ছে! সব ব্লাডপ্রেসারের রুগি। গরু তিনটেরও প্রেসার। আমার যেমন বরাত!’
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমার চোখ ঘুমে জুড়ে আসে। ধপাস করে শুয়ে পড়তে পারলে আর কিছুই চাইনা। আজও সেই তালেই ছিলুম। পরিষ্কার বিছানা। নরম মাথার বালিশ, কোলবালিশ। মৃদু পাখার বাতাস। জানালার বাইরে সাদা ফুলে ফুটফুটে কামিনী গাছ। থমথম করছে মিষ্টি গন্ধ। কোণের দিকে বড়মামার আরামকেদারার কাছে তে-ঠ্যাঙা বড় টেবিল ল্যাম্পের মাথার ওপর হালকা-সবুজ রঙের শেড স্বপ্নের মতো আলো ছড়িয়ে রেখেছে। ঘুম আয়, ঘুম আয় বলতে হয় না, ঘুম যেন ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
বিছানায় পা দুটো তুলে সবে শুতে যাচ্ছি, বড়মামা, ‘হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘এর মধ্যে শুবি কী রে! একটা ফিউচার প্ল্যান তৈরি করতে হবে না?’
‘কীসের প্ল্যান?’
‘গরু ছেড়ে দিলুম। আর একটা কিছু ধরতে হবে তো।’
‘কেন? কুকুর রয়েছে গোটা ছয়েক, পাখি রয়েছে খাঁচায় খাঁচায়, দুটো বেড়াল।
‘ধ্যার! ওদের কী ধরব! বড় একটা কিছু ধরতে হবে। মহান, মহৎ, অসীম, অনন্ত।’
‘সে আবার কী?’
