বসন্ত ভয়ে ভয়ে সাবানটা হাতে তুলে নিল, জিনিসটা কী ভালো করে দেখার জন্যে। রাখালবাবু বললেন—ও মাল তোমার বোঝার ক্ষমতা নেই। তুমি কি কেমিষ্ট? এ হল রসিকের কারখানায় তৈরি।
বসন্ত রাখালবাবুকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করল—জ্যাঠামশাই, এটা রেখে আপনি বাড়ি যান। রসিক একটু সুস্থ হলেই আপনাকে সব জানাব। এখন আর ওকে গালাগাল দেবেন না।
মানে? সাবান রেখে বাড়ি যাব। তুমি ভেবেছ অত বোকা লোক আমি! আমি এই মাল নিয়ে থানায় যাব, আর তোমাকেও আমি ফাঁসাব। এডিং এন্ড এবেটিং এ ক্রাইম।
বসন্ত এতক্ষণ মেজাজ ঠিক রেখেছিল, আর পারল না, তেরিয়া হয়ে বলল—যান যান যা পারেন করে নিন। নিজেও তো একেবারে ধোঁয়া তুলসীপাতা। রেশনের দোকানের মাল পাচার করে দু পয়সা করেছেন, ভেবেছেন সব কিনে নিয়েছেন।
কী বললি!
বললি নয় বললেন।
তাই নাকি ছোকরা?
পন্টু কোথায় যাচ্ছিল সাইকেলে করে, ঝগড়া দেখে নেমে পড়ল।
কী হয়েছে রে বসন্ত। রাখাল শালা কী পিড়িক মারছে?
রাখালবাবু পন্টুকে দেখে ফ্যাকাশে মেরে গেলেন। পন্টু পাড়ার উঠতি মস্তান। রাখালবাবু কোনওমতে পালাতে পারলে বাঁচেন। রাখালের নাড়িনক্ষত্র পন্টুর জানা। পন্টু মুখের কাছে ডান হাতটা গোল করে লাগিয়ে পলাতক রাখাল সাধুখাঁকে একটা পুঁক দিল। এইবার চোখ পড়ল। রসিকের দিকে—এ কী রে, শালার এ কী অবস্থা? অ্যাঁ! উলটি কিয়া হায়। রসিকের মাথায় একটা গাট্টা মারল। মাথাটা ডান দিক থেকে বাঁ দিকে কাত হয়ে গেল।
কী করে এরকম হল রে? শালার যা অবস্থা যমেও ছোঁবে না।
বিস্কুট খেয়ে।
বিস্কুট! না খেলেই পারত। পেটে যখন সহ্য হল না।
খাব বলে খায়নি। খাবার ডেমনসট্রেশান দিচ্ছিল।
এখন যা হয় কিছু কর। চল চ্যাংদোলা করে পুকুরে চুবিয়ে আনি।
কী দরকার। মরে গেলে হাতে দড়ি। ও শালার বিস্কুটে নির্ঘাত কিছু আছে মাইরি। বোধহয় ডগ বিস্কুট।
—কী বিস্কুট দেখি? পন্টু হাত বাড়িয়ে কাচের জার খুলে একটা বিস্কুট তুলে নিল। বসন্ত হাঁ হাঁ করে উঠল—খাসনে পন্টু। একসঙ্গে জোড়া খাট আমি সামলাতে পারব না।
—দাঁড়ানা, কী মাল একবার মুখে দিয়ে দেখি। কী আর হবে। আমরা শালা যমেরও অরুচি। বসন্তর হাঁ-করা দৃষ্টির সামনে পন্টু টকাস করে একটা ক্যাঙ্গারু বিস্কুট মুখে ফেলে দিল। বিস্কুটটা এক সেকেন্ড মুখে রইল, তারপর পন্টু থু থু করে ফেলে দিয়ে ধেই ধেই করে নাচতে লাগল— শালা জানে মারা জানে মারা। প্রথমে দুপায়ে নাচছিল, তারপর এক পায়ে। মুখে হিন্দি ছবির গান—দিল মে চাকু মারা, হায় হায় ইয়াহু জনি মেরা নাম, হয় মারো হায় মারো। তারপর ফাটা রেকর্ডের মতো—মারো মারো মারো মারো করতে করতে টুইস্ট নাচতে লাগল আর মুখ-চোখ। জঙ্গলী ছবির শাম্মীকাপুর যেভাবে বিকৃত করেছিল সেইরকম করতে লাগল।
বসন্ত প্রথমে ভেবেছিল পন্টু ইয়ার্কি করছে, কিন্তু পন্টু যখন নাচতে নাচতে তিন ভাঁজ হয়ে পড়ে গেল, বসন্ত বুঝল ব্যাপার সিরিয়াস।
রসিকের দোকান থেকে বিশ গজের মধ্যে একজন ডাক্তার ছিলেন। যাঁর রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ফায়ার বিগ্রেডের কর্মী। বসন্ত হাতে-পায়ে ধরে সেই ভদ্রলোককে নিয়ে এল। বৃদ্ধ মানুষ, খিটখিটে চেহারা। প্রথমে দশ পা দূর থেকে ঝুঁকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন, তারপর পকেট থেকে চশমা বের করে নাকের ডগায় লাগিয়ে বসন্তকে জিগ্যেস করলেন—বমির রংটা কীরকম হে, সরষের তেলের মতো, না মাছের পিত্তির মতো, না সাপের বিষের মতো?
বসন্ত বলল—হলদে হলদে।
পন্টু এদিকে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে, কাউন্টারে ঠেসান দিয়ে চোখ বুজিয়ে ক্রমান্বয়ে বলে চলেছে—ওরে বাবা মর গিয়া, ওরে বাবা মর গিয়া।
ডাক্তারবাবু পন্টুর দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচে বললেন—এটা আবার কে? কেত্তন গাইছে না কি? দোহার দিচ্ছে। মূল গায়েন ওপরে মূৰ্ছা গেছে দোহারি ভাবের ঘোরে নীচে গড়াগড়ি; অ্যাাঁ। একেবারে নদের লীলা। তা, কী করে হল?
বসন্ত বলল—বিস্কুট খেয়ে।
সর্বনাশ, বিস্কুট খেয়ে? বলো কী হে? পয়েজনিং। দেখো তো মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে কি না?
বসন্ত বলল—আমিই যদি সব দেখব তা আপনাকে ডাকব কেন?
দেখবে না মানে? রোগী আমার না তোমার? আমার ই.এস.আই. আছে আমি পরোয়া করি না
কারওর।
আহা রাগছেন কেন? এই কি রাগ করবার সময়। বসন্ত সেই বুড়ো ডাক্তারকে একটু তোয়াজ করার চেষ্টা করল।
—শোনো, কী নাম তোমার? ও হ্যাঁ বসন্ত। শোনোবসন্ত, কেস খুব সিরিয়াস। আমার চিকিৎসার বাইরে। এ পেনিসিলিন-মেনিসিলিনে কিছু হবে না। কাফ মিক্সচার দিলেও যে হবে না সেটুকু জ্ঞান আছে। ক্রিমি থেকে বমি হলে আমি হেলমাসিড কি এন্টিপার দিতে পারতুম। মেয়েরা পোয়াতি হলে অনেক সময় বমি করে, এ সে কেসও নয়। বুঝেছ? ব্যাপারটা আসলে খুব জটিল। জলে ডোবা কেস হলেও কিছু করতে পারতুম, কারণ সে ট্রেনিং আমার আছে। পুড়ে গেলেও একটা যা হোক ব্যবস্থা হত—
বসন্ত বলল—সব বুঝেছি, এখন কী হবে তাই বলুন?
আরও বমি করতে হবে। হুড়মুড় করে বমি করতে হবে। বমি করে সব ভাসিয়ে দিতে হবে। বুঝেছ? তবেই পেট থেকে সব বিষ বেরিয়ে যাবে। শোনো তাহলে বলি, একটা ছোট্ট যৌগিক প্রক্রিয়া। তুমি শিখে রাখতে পারো, কাজে দেবে। আমরা করতুম যৌবনকালে।
পন্টু হঠাৎ দুম করে একটা লাথি ছুড়ে বলল—শালাকে হাটা। আর সহ্য হচ্ছেনা-আ-আন— বাবারে মর গিয়া।
