ডাক্তারবাবু একলাফে পিছিয়ে গিয়ে, পন্টুর দিকে ঝুঁকে পড়ে, ব্যান্ড মাস্টারের মতো হাত নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন বমি করো, বমি করো, আরও করো, বমিতেই মুক্তি, বমিতেই ধৌত।
পন্টু হঠাৎ তার ঘোরের মধ্যে লাফিয়ে উঠল—তবে রে শালা।
ডাক্তারবাবু আর এক ধাপ পিছিয়ে গেলেন শোনো বসন্ত, আমরা যৌবনকালে খুব খেতুম। আমি অক্ষয় হরিচরণ সব ডাকসাইটে খাইয়ে ছিলুম। বুঝেছ। এক বালতি লেডিকেনি, এক বালতি পোলাও, ষাটখানা মাছ, ওসব আমাদের কাছে নস্যি ছিল, নাথিং। তবে কী হত জানো? মাঝে মাঝে সকালে মানে একেবারে প্রাতঃকালে একটু-আধটু অম্বল হত, অম্বল অম্বল, আর কি? একটু চোঁয়া ঢেকুর ডুকরে উঠল। তখন আমরা এই প্রক্রিয়াটা করতাম, অব্যর্থ, সঙ্গে সঙ্গে ফল। জল খেতুম, এক গেলাস, দু-গেলাস, তিন গেলাস। পারছি না তাও আর এক গেলাস, আকণ্ঠ জল খেয়ে নর্দমার কাছে গিয়ে, সামনে এইভাবে ঝুঁকে, এই যে দেখো, এইভাবে ঝুঁকে গলায় এই। আঙুল, এই যে মধ্যমা আর তর্জনী সাঁদ করিয়ে দিয়ে সুড়সুড়ি দিতুম, একবার দুবার তিনবার, সঙ্গে সঙ্গে বমি, ওয়াক করে ব-ব-ব—
বলতে বলতেই ডাক্তারবাবু হুড় হুড় করে সত্যি সত্যি বমি করে ফেললেন। বমি করেই বসে। পড়লেন—ওরে বাবা রে, আমার মাথা ঘুরছে রে, ওই বমিটা দেখেই আমার গা গুলিয়ে গেল রে, আমার আবার হার্ট আছে রে!
ডাক্তারবাবু আবার বমি করলেন।
বসন্ত! ডাক্তার ডাকো বাবা। অ্যাম্বুলেন্স আনতে দেরি করে, তুমি বরং আমার নাম করে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করো, দমকলই আসুক। আগে হোসপাইপের জল দিয়ে আমাদের পরিষ্কার করে দিক। ওরে বাবা রে আমার ঘেন্না করছে রে।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে বসন্তর চোখ কপালে উঠল। ছিল রসিক, এল পন্টু। যেমনই হোক একজন ডাক্তার এনেছিল, সেই ডাক্তারও কাত! সংক্রামক ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেল। বসন্ত ভাবছে কী করা যায়! বেলা বাড়ছে, সামনে বমিতে মাছি বসছে। রসিকের কী হল কে জানে? হয়তো মরেই গেল।
মরেনি, শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে। তাছাড়া বসন্তই বা কতক্ষণ আটকে থাকতে পারে। সকালে রসিকের দোকানে আড্ডা মারতে এসে, এ কী ফ্যাসাদ!
এমন সময় কুশলা এসে হাজির হল। রসিকের দোকানের সামনে হলুদ রঙের দোতলা বাড়ির ওপরের তলায় কুশলা থাকে। স্কুল ফাইনাল পাস করার পর নার্সিং-এর ট্রেনিং নিচ্ছে। কুশলা দোকানে পা রেখেই বলল—এ কী ব্যাপার?
পন্টু জড়িয়ে জড়িয়ে উত্তর দিল—আমরা মরে গেছি। আমাদের গলা জ্বলছে, বুক জ্বলছে, গলা জ্বলছে, বুক জ্বলছে
কুশলা বসন্তর দিকে তাকাল, ইশারায় প্রশ্ন করল—ব্যাপারটা কী?
বসন্ত কুশলাকে প্রথম থেকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। কুশলা বলল—তাহলে তো এখুনি কিছু করতে হয়। আমি এইমাত্র হাসপাতাল থেকে আসছি। চলুন সেখানেই নিয়ে যাই তাহলে। বসন্ত বলল—সবই তো হবে কিন্তু এই ডাক্তারের ডাক্তারি কে করবে?
ও কিছু নয়। চলুন ওঁকে পৌঁছে দিই আগে বাড়িতে। ওই তো ডিসপেন্সারির ওপরেই থাকেন। একটু শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।
দোকানের এককোণে একটা ছেঁড়া কাগজের বাক্স পড়েছিল, বসন্ত তাইতে মোটামোটা করে লিখল—বিক্রয় বন্ধ।
কুশলা বলল—ওসব করার কোনও প্রয়োজন ছিল না। কে আসবে এ দোকানে। একমাত্র ধারের খদ্দের ছাড়া। আর একটা সুবিধে ক্যাশেও কোনও টাকা নেই কারণ এ দোকানে লেখাই আছে— নগদে জিনিস কিনিয়া লজ্জা দেবেন না। কুশলার সুনিপুণ ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্স এল, দমকল নয়। পন্টু আর রসিক হাসপাতালে গেল। কুশলা নিজের হাতে কাউন্টার সাফ করে, ফিনাইল দিয়ে দোকান পরিষ্কার করে বন্ধ করে আবার চলে গেল হাসপাতালে। বসন্তও রইল সঙ্গে সঙ্গে।
হাসপাতালে পুলিশ এল। পয়জনিং কেস। মারাত্মক কিছু একটা বিস্কুটে ঢুকেছে। বিস্কুটের স্যাম্পল সিজ করা হল।
সন্ধের দিকে জানা গেল রসিকের নামে ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে। রসিক নিজেকেই নিজে বিষাক্ত বিস্কুট খাইয়েছে। ওই হাসপাতালে অন্তত আরও তেরোটা ওই একই জাতীয় কেস এসেছে।
রসিক তখন একটু সামলেছে। কুশলাকে বলল—আমাকে এখানেই রাখার ব্যবস্থা করো। ছেড়ে দিলেই পুলিশে ধরবে।
পুলিশে না ধরুক, জনসাধারণ যার অন্য নাম পাবলিক তারাই পিটিয়ে মারবে। এখন আর ও নিয়ে মাথা ঘামিও না, আপাতত ঘুমোবার চেষ্টা করো। আমরা কাল সকালে আবার আসব। মাথার বালিশটা ঠিক করে দিয়ে কুশলা চলে গেল।
থানার বড়বাবু বললেন—রসিকবাবু, আপনি কী বলে জেনেশুনে ওই বিস্কুট বিক্রি করলেন? আপনি জানেন এই এলাকায় একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার খুব পাবলিসিটি হয়ে গেছে।
আরও হবে, যখন আপনি জেলে যাবেন। কিন্তু আমি জেলে যাবার আগে স্যার ওই প্রহ্লাদ যাবে। বিস্কুট আমি প্রহ্লাদের বেকারি থেকে কিনেছিলুম।
প্রহ্লাদবাবু কিছু বলার আছে?
প্রহ্লাদের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, ঢোঁক গিলে বলল—স্যার আমি নাবালক। গোঁফটাই বেরিয়েছে, বুদ্ধি পাকেনি।
তার মানে?
মানে স্যার পৃথিবীতে যত বড় বড় মূখ জন্মেছে আমি তাদের মধ্যে একজন।
এই হল আপনার কনফেশান?
ইয়েস স্যার।
একটু ব্যাখ্যা করুন।
যেমন ধরুন আমি একটা বেকারি করেছি। তৈরি করি রুটি আর সস্তার বিস্কুট। আমার তৈরি রুটি স্যার চলে বেড়ায়। যেমন ধরুন টেবিলের এইখানে রাখলুম কিছুক্ষণ পরেই দেখবেন ওই ওইখানে হেঁটে হেঁটে চলে গেছে।
