রসিক শিশুর মতো অবাক মুখে বলল—সে কী মেসোমশাই, এমন কেন হল। আগে কখনও কুকুরে কামড়ায়নি তো?
জগদীশ্বরবাবু মুখ ভেঙচে বললেন—আজ্ঞে না, তোমার এই বিস্কুট খেয়ে হয়েছে। আমি বলে রাখছি রসিক, ওই আমার একমাত্র মেয়ে সাত রাজার ধন এক মানিক ওর যদি কিছু হয় রসিক তোমাকে আমি হাজতবাস করাব। রসিক ইতিমধ্যে কাগজের ঠোঙা খুলে বিস্কুটগুলো কাগজের ওপর ঢেলে ফেলেছে। সেই হাতি ঘোড়া বিস্কুট। একটা বিস্কুট হাতে নিয়ে রসিক বলল—কেন কী হয়েছে মেলোমশাই, এই তো কী সুন্দর দেখতে, এই তো দেখুন না একটা খরগোশ, এই দেখুন আমি মাথাটা কামড়ে খাচ্ছি।
রসিক মাথাটা কামড়েই, মুখটা কেমন করল তারপর কোনওরকম ঢোঁক গিলে বলল—এই দেখুন ফাসক্লাস খেতে, এই তো আমি পুরোটাই খাচ্ছি। খরগোশটা তার পেটে চলে গেল। রসিক। এবার একটা হাতি তুলে বলল—এই দেখুন এটাকে আমি পুরো একগালে খাব। বলেই হাতিটা মুখে ফেলে মনে হল বেশ বেকায়দায় পড়েছে। খরগোশ ছিল নিরীহ প্রাণী, হাতি যেন মত্ত মাতঙ্গের মতো তার মুখের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় গুঁতোগুতি করতে করতে অবশেষে গলার গর্ত গলে উদরে চলে গেল। রসিককে তখন যথার্থই কাবু দেখাচ্ছে। তবুও সে ছাড়ার পাত্র নয়। এবার একটা কচ্ছপ হাতে নিয়ে বলল—এই দেখুন এটাকেও, এটাকেও আমি সাবড়ে দিচ্ছি। বিস্কুটটা হাতে নিয়ে বেশ বোঝা গেল সে একটু ইতস্তত করছে, তারপর একেবারে মরিয়া হয়ে সেটাকে মুখে পুরে ট্যাবলেট গেলার মতো গিলে নিল। গিলে নেওয়ার পর সে মুখ তুলে তাকাল, মুখে একটা অদ্ভুত করুণ হাসি, তারপরই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল রসিকের সমস্ত মুখটা কালো হয়ে গেল, দানবের মুখোশের মতো একটা অসাধারণ বিকৃতি ফুটে উঠল, তারপর একটা ওয়া শব্দ করে হুড়হুড় করে বমি করে ফেলল। জগদীশ্বরবাবু একলাফে চাতাল থেকে রাস্তায় পড়লেন, পড়েই বসন্তকে বললেন বসন্ত, ও বোধহয় বেশিক্ষণ বাঁচবে না। যদি মরে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচবে, আর যদি বাঁচে তাহলে ফাঁসিতেই মরবে। আমি এখন চললুম, দেখি আমার বাড়িতে আবার কী হচ্ছে।
বসন্তর পাঞ্জাবিতে বমির ছিটে লেগেছিল। রসিক ইতিমধ্যে টুলে বসে পড়েছে, মাথাটা লটকে পড়েছে কাউন্টারে। সামনে ছড়ানো বিস্কুট বমিতে ভাসছে। বসন্ত দুবার রসিক রসিক বলে ডাকল, কোনও সাড়া পেল না। মহা মুশকিল, রসিকের বাড়িতে খবর দিতে হবে; কিন্তু খোলা দোকানে কাউকে রেখে যাওয়া উচিত, তা না হলে মালপত্র সরে যাবার সম্ভাবনা। এই সময়। রসিক একবার ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। গলা দিয়ে জেট প্লেনের মতো একটা আওয়াজ বেরোল।
বসন্তকে বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হল না। কাপড়ের ওপর গামছার পাক মেরে আদুল গায়ে ভুড়ি ফুলিয়ে ভূষণ গোয়ালা এসে হাজির হল। তারও মারমূর্তি। বসন্ত আসতে আসতে জিগ্যেস করল–কী হয়েছে কী?
–কী হয়েছে? এখন কটা বাজে?
—প্রায় নটা।
—আমি সেই সকাল থেকে, ভোর পাঁচটা থেকে চেষ্টা করছি, এখনও পারলুম না।
—কী পারলে না?
—দুধ গুলতে পারলুম না। কাল রসিকের কাছ থেকে পাঁচশো মিল্ক পাউডার কিনেছিলুম, কার বাবার সাধ্য তাকে জলে গোলে! শালা, সমস্ত গুড়ো ভুসির মতো জলে ভেসে বেড়াচ্ছে আমরা বাপ-বেটায় মিলে চেপে ধরেও শালাদের ডোবাতে পারছি না, ফসফস করে পালাচ্ছে, আর ভেসে উঠছে। এটা কি দুধ? চালাকি পেয়েছ, আমরা চারটে দামড়া ঝাড়া চার ঘণ্টা হিমসিম খেয়ে। গেলুম; খদ্দের গেল, ইজ্জত গেল। এতক্ষণ রাগের চোটে কথা বলছিল। রসিকের দিকে নজর পড়েনি। হঠাৎ সামনে গড়ানো বমি আর তার পেছনে রসিকের লটকানো মুণ্ড দেখে ভূষণ লাফিয়ে উঠল—ছিঃ ছিঃ একি কাণ্ড! রাম রাম, সকালেই মাল খেয়ে, লুটোপুটি খাচ্ছে।
বসন্ত বললে—না না মাল খাবে কেন? হঠাৎ গা গুলিয়ে বমি করে ফেলেছে।
গা গুলিয়ে, তার মানে দোক্তা খেয়েছে?
না না দোক্তা নয়, গোটাকতক বিস্কুট খেয়েছিল, তাই খেয়ে!
বিস্কুট, ওই বিস্কুট, কী সর্বনাশ আমিও যে ওই বিস্কুট নিয়ে গেছি। কী মুশকিল। দেখি বাড়ি গিয়ে কেউ খেয়ে মরেছে কি না!
ভূষণ উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োল বাড়ির দিকে।
বসন্ত ভাবল ফাঁড়া কেটেছে। রসিকের সেই এক হাল, মাঝে মাঝে ধনুকের মতো বেঁকে উঠছে, আর গর্জন করছে। বসন্তর একবার মনে হল, কী এমন বিস্কুট, একটা খেয়ে দেখলে হয়। তারপর ভাবল দরকার নেই, রসিকের মতো হলেই মুশকিল। রসিককে দেখে মনে হল তার পেটের মধ্যে প্যাটন ট্যাঙ্ক চলেছে।
এর মধ্যে কখন রাখালবাবু এসে দাঁড়িয়েছেন বসন্ত লক্ষ করেনি।
এই যে বাবা বসন্ত, ব্যাটাকে শেষ করে দিয়েছ দেখছি। জানতুম ওইভাবেই একদিন অপঘাতে মরবে। পাড়াঘরে দোকান, বলি অ্যাাঁ, লোকঠকানো কারবার আর ক-দিন চলবে!
কী বলছেন আপনি? শেষ করব কেন, রসিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
অসুস্থ, ও সুস্থ ছিল কবে? রাখালবাবু একটা জলে ভেজা সাবান বের করে বললেন—বাবা বসন্ত, এটা কী?
সাবান জ্যাঠামশাই।
কোথা থেকে কিনেছি? এই দোকান থেকে।
কী হয়েছে কী আপনার সাবানে?
আমার সাবান? রসিকের, রসিকের সাবান বাবা। জলে দিতেই শালা কেবল হলদে রং ছাড়ছে, সাবান ছাড়ছে কই?
হঠাৎ রাখালবাবু প্রচণ্ড রেগে চিৎকার করে বললেন—ভেবেছে কী রাসকেল? আমি ওর বাপের চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়, আমার পাঞ্জাবি গেল, গেঞ্জি গেল, আন্ডারওয়্যার গেল, শালা যেন জন্ডিসের রুগি, সব হলদে। চোখে সরষে ফুল দেখিয়ে দিলে!
