যাক, খাওয়া শেষ। মুখে পান। গেলাসে গেলাসে নুন দিয়ে লেবু দিয়ে হাত ধোওয়া ঘোলা ঘোলা জল। প্রচুর অপচয়ের রণক্ষেত্র পেছনে পড়ে রইল। গৃহস্বামী হাত কচলে বলছেন, কিছু অসুবিধে হয়নি তো! হয়ে থাকলে মাপ করবেন। জুতোর জায়গায় এসে চক্ষুস্থির। ওয়াটালুর যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থা। উলটে পালটে চিত হয়ে উপুড় হয়ে রামবাবু, শ্যামবাবু, যদুবাবু একাকার। শেষ পর্যন্ত শুধু পায়ে রাস্তায়। কে মেরে দিয়েছে নতুন চটিজোড়া। গায়ে গরদের পাঞ্জাবি, পরনে চুনোট করা কাঁচি ধুতি, খালি পা—নিমন্ত্রিতরা খাওয়া শেষে বাড়ি ফিরছেন।
এখন আর সেসব সমস্যা নেই। টেবিলে খাওয়ার চলন হয়েছে। সারি সারি ফোল্ডিং চেয়ার। দু পাশে দুটো কাঠের এক্স, ওপরে একটা তক্তা পাতা। তার ওপর নিউজপ্রিন্ট, তার ওপর কলাপাতা। খেয়ে আরাম, খাইয়ে আরাম, তদারকি করে আরাম। হাঁটুর ধাক্কা লেগে খাট খুলে। মাঝেমধ্যে টেবিল খুলে কোলের ওপর পড়তে পারে। তবে কথায় আছে, নো রিস্ক নো গেন। ফোল্ডিং চেয়ার উলটে অবোধ শিশু হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে। তা পড়ুক। তেমন সব বেপরোয়া খাইয়েও আর নেই যাঁরা প্রাণের মায়া ছেড়ে এক-একটা আইটেম ফাঁক করে সারারাত বাড়ির ছাদে মাদুর পেতে খুঁড়িতে ভিজে গামছাটা চাপিয়ে শুয়ে থাকবেন। পাশে এক ঘড়া খাবার জলে রবারের নল। চুকচুক করে চুষে চুষে জল খাচ্ছেন। ভোরেই সব হজম। এখনকার পেটে সামান্য কিছু ঢুকলেই শেয়ারহোল্ডারদের মিটিং শুরু হয়ে যায়। কত রকমের প্রিকশান? প্রথমে অ্যান্টিঅ্যামিবিক ওষুধ বিছিয়ে তার ওপর কালিয়া পোলাও ফেলো! তার ওপর আর এক পরত অ্যান্টিঅ্যামিবিক, তার ওপর ঝুরো ঝুরো অ্যান্টাসিড।
খাইয়েদের একটা নতুন শাস্ত্র গড়ে উঠেছে। পাতের আজেবাজে মাল ঠুকরে যাও। অপেক্ষায়। থাকো। এক চামচে ফ্রায়েড রাইস মেরেই খানচারেক পাকা পোনার দাগা উড়িয়ে দাও। ঝোল টাচ করবে না। মাংস না ছোঁয়াই ভালো। দই পেট ভার করবে। একটু প্লাস্টিক চাটনি। গোটাকতক মিষ্টি। ভিজে লেবুর টাকনা। জল স্পর্শ করবে না। হাতে নুন মেখে গেলাসে ডুবিয়ে দাও। খানিকটা নিউজপ্রিন্ট ছিঁড়ে হাত মুছে ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে বেরিয়ে এসো। প্রেজেন্টেশান আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে কেটারিং সার্ভিস চালু হয়ে আমন্ত্রণকারীদের ঝঞ্জাট অনেক কমে গেছে। ভোর-রাতে শেয়ালদা ছুটতে হবে না মাছ কিনতে, নতুনবাজারে ছানা, বউবাজারে মাংস। সারাদিন। হালুইকরদের চোখে চোখে রাখতে হবে না, হুঁকোর মধ্যে তেল ভরল কী পেটকাপড়ে মশলা। মেজোকত্তাকে চেয়ার পেতে ভাঁড়ারে বসতে হবে না পাহারা দিতে। সন্ধে হয়ে গেল এখনও দই এল না বলে বড়গিন্নি বাড়ি মাথায় করবেন না। উর্দিপরা পরিবেশনকারী কাচের প্লেটে ছাঁকা ছাঁকা চোখা চোখা জিনিস সামনে ধরে দেবেন। শেষ পাতে একটি আইসক্রিম। গলায় মাফলার জড়িয়ে খাও। কাশতে কাশতে বাড়ি যাও। এদিকে অর্কেস্ট্রায় ঝমক ঝমক করে হিন্দি গানের সুর বাজছে, কুরবানি, কুরবানি, কুরবানি হো।
কার কোরবানি?
বিস্কুট
রসিক বললে—দেখিস বাংলায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পরেই রসিক রায়ের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। রঞ্জন এইমাত্র হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট মুখে লাগিয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললে—লিখে রাখ আমার নামে, মাসকাবারে সব দিয়ে দেব। এক বান্ডিল লাল সুতোর বিড়ি দিয়ে দে, কেটে পড়ি, আজ আবার অগর যেতে হবে বালি আনতে। রঞ্জন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বেরিয়ে গেল। রসিক খেরোর খাতার তেরোর পাতায় রঞ্জনের একাউন্টে সব লিখে নিল। বসন্ত এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, একবার খাতার পাতায় উঁকি মেরে দেখল রঞ্জনের কাছে রসিকের পাওনা, এরই মধ্যে কুড়ির অংক ছাড়িয়েছে।
খাতা বন্ধ করে রসিক একটু মুচকি হাসল—দোকানটা সাতদিনেই বেশ জমেছে মাইরি। ঝটাপট মাল কাটছে। এইভাবে যদি চলে ভাবতে পারিস, বছর খানেকের মধ্যেই আর একটা নতুন কারবার ফেঁদে ফেলব। তারপর আর একটা, তারপর আরও একটা। বড় কিছুর শুরু কিন্তু ছোটতেই।
গজেন এক গ্লাস চা আর একটা কাপ দিয়ে গেল। চা-টা দুই ভাগ করে একভাগ বসন্তকে দিল, তারপর কাচের জারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো হাতি ঘোড়া বিস্কুট বের করে সেদিনের খবরের কাগজের ওপর ছড়িয়ে দিল।
বসন্ত এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। রসিকের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এক চুমুক চা খেয়ে এইবার সে মুখ খুলল—প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নাম তো রাখবি বেশ বুঝলাম, কিন্তু তোর এই দোকানদারির সাতদিনে আমদানি কটাকা হয়েছে?
কেন পুরোটাই তো আমদানি। আজ না পাই কাল তো পাব। মাসের শেষে আর কে টাকা দেবে বল। মাসের প্রথমে দেখবি শালা তহবিল উপছে পড়ছে।
বসন্তকী একটা বলতে যাচ্ছিল, বলা হল না, নিমেষে একটা লন্ডভন্ড কাণ্ড ঘটে গেল।
জগদীশ্বরবাবু একটা লাল লুঙ্গি পরে, গায়ে একটা হলদে গামছা ফেলে উগ্রমূর্তিতে দোকানের রকে এসে উঠলেন। একটা কাগজের মোড়ক দুম করে কাউন্টারের ওপর ছুড়ে ফেলে বললেন— ভেবেছ কী রসিক, রসিকতা পেয়েছ? আমি চাইলুম মানুষে খাবার বিস্কুট তুমি আমায় দিলে ডগ বিস্কুট। আমার বাচচা মেয়েটা রোজ সকালে বিস্কুট দিয়ে চা না খেলে সারাদিন সকলকে কামড়ে বেড়ায় আর আজ তোমার এই বিস্কুটের একটা খেয়েই সকাল থেকে কেঁউ কেঁউ করছে।
