পরিবেশনকারী দু-খণ্ড মাছ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। ছুঁচোলো গোঁফ পাকিয়ে বরপক্ষের আমন্ত্রিত ব্যঙ্গের সুরে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ ছোকরা পুরোটাই নামিয়ে রেখে যাও। ছেলেখেলা কোরো না। খেতে এসেছি, ইয়ার্কি মারতে আসিনি। মাছ পেরিয়ে দইয়ে এসে আবার হুলুস্থূল, এটা কী জোলো মাল, কচি খোকার দুধ তোলার মতো ছিড়িক ছিড়িক ছেড়ে যাচ্ছে! মাথা আনো, মাথা। যত না খেলেন তার চেয়ে নষ্ট করলেন বেশি। লাটঘাট মাল কলাপাতাসমেত রাস্তায় গিয়ে পড়ল। ভিখিরিতে আর পাল পাল কুকুরে সারারাত ছেঁড়াছিড়ি। প্রতিবেশীর ঘুম মাথায় উঠল। তিন দিন সকলের নাকে রুমাল! চিংড়ি মাছের খোলাপচা গন্ধে প্রাণ যায়।
মানুষ ঠেকে শেখে। পরিবেশন একটা আর্ট। অরগানাইজড ব্যাপার। পাড়ায় পাড়ায় প্রোফেশনাল পরিবেশনকারী তৈরি হয়ে গেল। যে-কোনও কাজেই এঁদের ডাক পড়ে। সমাজসেবীর মতো। পরিবেশন এক্সপার্ট। কোনটা কখন কী ডোজে ছাড়তে হবে কুঁচকি-কণ্ঠা ঠেসে আহারকারীর মুখ কীভাবে মেরে দিতে হবে—সব এঁদের জানা। যেমনি ম্যানেজমেন্ট, তেমনি স্পিড! কাউকে নাভিশ্বাস ফেলতে দেবেন না। খেলে খেলে কেঁকে বেঁকে খাবে ওটি হচ্ছে না। ধপাধপ ফেলো আর সরে পড়ো। একবারের বেশিদু-বার নয়। খুব ঝুলোঝুলি করলে আর একবার ঘুরিয়ে দাও। কথায় আছে জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ। জন্মের ব্যাপারে ডাক্তার। কিন্তু বিবাহ আর মৃত্যুতে এইসব পরহিব্রতীর তুলনা নেই। পোড়ানোর দল আর পরিবেশনকারীর দল সব পাড়াতেই আছেন। দাবি সামান্য। শ্মশানে যাবার সময় নতুন গামছা, পরিবেশনের জন্যে একটি তোয়ালে, পরে। একদিন খাওয়া।
আগে খাওয়ানো হত পাতা পেড়ে। সে একটা লন্ডভন্ড ব্যাপার। শ্যাওলা-পিছল উঠোনের ওপর দিয়ে স্কেট করতে করতে রকে গিয়ে ওঠো। সেখান থেকে ডাইনে বাঁক নিয়ে খাড়া সিঁড়ি। সিঁড়িটা ওপরে উঠেছে। অপ্রশস্ত। সরু। একদল খেয়ে নামছে, আর একদল খেতে উঠছেন। দেয়ালে কনুই লেগে ঘেঁচে নুনছাল উঠে যাচ্ছে।
এরই মাঝে দমকা নেমে আসছেন খোঁপায় ফুল গোঁজা কোনও উত্তাল তরুণী। তাঁর আর চোখে কানে দেখার মতো অবস্থা নেই। পুষ্পিতা, পুষ্পিতা! পা বাড়িয়ে, আঁচলের ঝাপটা মেরে চশমা সরিয়ে, টালমাটাল খাইয়ে তিনি নেমে চলেছেন, দুটো মানব বাচ্চা গুতোতে তোতে উপরে উঠছে। লাল সিঁড়িতে জল আর রসগোল্লার রস মাখামাখি। পিছন পথে এই অভিসার। শেষ হবে। ছাদে গিয়ে। সিঁড়ির দরজাটা নীচু হওয়াই স্বাভাবিক। ধাঁই করে প্রথম ব্যক্তিটির কপাল ঠুকে গেলে আলু হওয়া মাত্রই গৃহস্বামীর তরফের কেউ একজন ওপরে উচ্চারণ করবেন, মাথা নীচু করে, মাথা থেকে, আহ, আহা, করে সাবধানবাণী, নীচু করে। ছাদের একপাশে ডাঁই করে জুতো জমবে। জুতোর ওপর জুতো, তার ওপর জুতো।
ছাদের কড়কড়ে কালো বালির ওপর সরাসরি ছেঁড়া, ফাটা কলাপাতা। একপাশে নেতিয়ে পড়ে আছে বেগুনভাজা, ছোলা দিয়ে শাকভাজা। কড়কড়ে নুন, লেবুর টুকরো। ম্যাগনাম সাইজের একটা ঠান্ডা লুচি। দখিনা বাতাস ছাদে হালকা আঁচল ছড়িয়ে দিয়েছে। সারি সারি চেটাইয়ের আসন। বালিমাখা মাটির গেলাস, দই খাবার খুরি একটি। কম জায়গায় অনেককে বসাতে হবে। এর পশ্চাদ্দেশ ওর পশ্চাদ্দেশে ধাক্কা মারছে। পাশের ভদ্রলোকের হাঁটুর ওপর হাঁটু উঠে পড়েছে। পাতের সামনে দিয়ে অনবরতই ব্যস্ত পায়ের আনাগোনা। জল আর নুন দেওয়ার দায়িত্ব ছোটদের। জলের জাগ নিয়ে পঙক্তির সামনের দুজনে ধুম কাড়াকাড়ি। এ বলে আমি দোব, ও বলে আমি। ফ্যাচাক করে জল ছিটকে সব ভিজে গেল। জলের গেলাসে গোটাকতক ফুটো থাকবেই। জল ঢালার সঙ্গে সঙ্গে শুষে নেওয়ার চিনচিন শব্দ উঠবে। কিছু গেলাসের তলা থেকে ফোঁস করে জলের ধারা বেরিয়ে আসবে। ওরে, ফুটো, ওরে ফুটো বলতে বলতেই লয়াবয়া জলের ধারা ঢাল বেয়ে বিপরীত দিকের পাতা ছুঁড়ে আসন ভেদ করে কাছাকোঁচা ভিজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। আহা গেল গেল বলে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে বিপর্যয় আরও বেড়ে বেল। দু-চারটে গেলাস আবার উলটে গেল। বেশ থই থই ব্যাপার। থিতোবার আগেই পাতে দমাদ্দম পড়তে লাগল ছ্যাঁচড়া, কুমড়োর ছক্কা, মাছের মুড়ো ঘাঁটা আসল ডাল। চিঙ্কার উঠল, গরম লুচি আনো, গরম লুচি আনন। পরিবেশনকারীরা সামনে মত্ত হাতির মতো ছোটাছুটি করছেন। মাথার ওপর। দিয়ে লুচির ঝুড়ি টপকে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় পাঞ্জাবিতে ফোঁটা ফোঁটা তেলের স্মৃতিচিহ্ন ফেলে যাচ্ছে। নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ডালের বালতি, পোলাও, ছ্যাঁচড়া। অনবরতই কানের কাছে নামতার মতো শুনছি, আপনাকে, আপনাকে। লাজুক লাজুক গলায় যেই বললেন, একটু। নাগরদোলার মতো বালতি ঝপ করে ওপর দিয়ে উঠে গেল। ঘটাং করে হাতার শব্দ হল। গোল করে পাতে পড়ল কিছু। পড়েই গড়াতে আরম্ভ করল কোলের দিকে। না-খাওয়া জিনিস পাতার মাথার দিকে ঠেলতে ঠেলতে চিনের প্রাচীর তৈরি হয়েছে। কলাপাতার ফাটা অংশ দিয়ে বালি উঠে এসেছে। মাঝখানের ছিটে উঠোনে সর্বধর্মসমন্বয়ের খেলা চলছে। ডালেতে, ছ্যাঁচড়াতে, মাছের ঝোলেতে, মাংসের হাড়েতে ধাপার মাঠের চেহারা। সেই রসে যুক্ত হল আর এক রস। ছ্যাৎ করে একঝলক চাটনি এসে পড়ল। তখন প্ল্যাস্টিক-স্ল্যাস্টিক চালু হয়নি। আমড়ার আঁটি তেলতেলে রসে চুর হয়ে আছে। আঁটিটা হাত দিয়ে চেপে ধরতে গিয়ে স্লিপ করে বুলেটের মতো পাতা থেকে বেরিয়ে তার স্বাচ্ছন্দ্য বিহারের উলটো দিকের জ্যাঠামশাইয়ের পাতে দইয়ের ওপর ল্যান্ড করল।
