তা! মন্থন-দণ্ড হিসেবে বস্তুটি মন্দ হবে না। নবনীর পর ঘোলও উৎপন্ন হবে প্রচুর! মস্তকে ঢালা যাবে। আচ্ছা, দেয়ালের গায়ে ঝুলটুল জড়ানো ওই মরালগ্রীব বস্তুগুলি কী?
আজ্ঞে। ওগুলো ছিল আলো। একসময় জ্বলত। আলো বিতরণ করত। এই যে দেখছেন ফানুসের মতো ছোট ছোট কাচের গোলক চঞ্চতে লাগানো, ওকে বলা হত বালব! এই যে দেয়ালের গায়ে। কাঠের বোর্ডে, সারি সারি, কালো কালো গোলাকার বোতামের মতো জিনিস দেখছেন, একে বলা হত সুইচবোর্ড, সুইচ। এটা টিপলেই ওটা জ্বলে উঠত। আলোর তেজ মাপা হত ওয়াট দিয়ে— ষাট, একশো, দেড়শো, দুশো।
দেয়ালের গায়ে ফিট করা এই ডান্ডাগুলো কী ছিল?
ও! ওদের বলা হত ডান্ডা-লাইট। কত নাম ছিল ওর! নিয়ন, ফ্লোরোসেন্ট।
মিস্ত্রিরা বলত রড-লাইট। ডান্ডা এখন ঠান্ডা। রাত্রির তপস্যা সেকি আনিবে না দিন? দিনের তপস্যা, সে কি আনিবে না রাত্রি?
তখন বেশ মজা ছিল তো? সাধনা না করেই আঁধারে আলো নেমে আসত। সুইচ অন আর সুইচ অফ? মধ্যে দৃষ্টি রেখে, কুলকুণ্ডলিনীকে খোঁচাখুঁচি না করেই আলোকের ওই ঝরনাধারা। যিশু নয়, বেদব্যাস নয়, দ্বৈপায়ন নয়, আঙুল আর সুইচ! আলো আর অন্ধকার!
হ্যাঁ, অতুলনীয় মজা! প্রথমে তিনি থাকতেন, না তাড়ালে যেতেন না। জ্বলছে তো জ্বলছেই, পাখা ঘুরছে তো ঘুরছেই, জল পড়ছে তো পড়ছেই। কোনওদিন বলতে হয়নি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো, আমি আছি। আপনিই বিশ্বাস এসে গেছে—হ্যাঁ তুমি আছ। ঈশ্বরের মতো থাকা নয়, তেজ আর দীপ্তি নিয়ে থাকা।
তারপর কী হল?
দিন যায়, দিন আসে, বছরের পর বছর চলে যায়। দেশহুড়হুড় গুড়গুড় করে পরিকল্পনার ধাপ বেয়ে এগিয়ে চলেছে, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর উচ্চতা ছুঁই ছুঁই। খাঁচাখাঁই কল চলছে, সার, সালসা, বয়লার, ইঞ্জিন, পাট, সুতো, মাছ, মাংস, হিমঘর, হাইব্রিড, আলু, পটল, কপি, কুলার, ফ্যান, ফোন, ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক ট্রেন মায় বৈদ্যুতিক চুল্লি। তারপর একদিন! সাজাহাঁ! এ কথা জানিতে তুমি ভারত ঈশ্বর সাজাহান, পেটে যা সয় না তা খেলে হয় ডিসপেপসিয়া। তিনি আসেন, তিনি যান। এই ছিল এই নেই। আসা-যাওয়ার পথের ধারে ল্যাম্পপোস্ট। মেগাওয়াট আছে মেগাওয়াট নেই। অবস্থা—মার্শাল টিটোর শেষদিনের মতো। এই ভালো, এই খারাপ। গেল গেল, রইল রইল। সে কী আতঙ্ক, সে কী উত্তেজনা! রাজবৈদ্য নাড়ি টিপে বললেন—ওদের ঘোড়া ছুটছে যেন। এ নাড়ি খুনির নাড়ি। কীসের এত উত্তেজনা!
আজ্ঞে! এই আছে, এই নেই।
কে আছে। কে নেই!
আলো।
ভুলে যান, বিস্মৃত হন। এই উত্তেজনায় কত হৃদরোগী ফতে হয়ে গেল জানেন? ঘরে ঘরে উন্মাদের চিৎকার—এসেছে। চলে গেছে। রুদ্ধ নিশ্বাসে গোটা পরিবার থম মেরে বসে আছে, এসেছে তবু যাচ্ছে না কেন? পিঠের ওপর আততায়ীর ভোজালি, কখন নেমে আসবে অন্ধকার, কখন আসবে! এই গেল, এই গেল। স্টেট বিল্ডিং-এর কার্নিশ ধরে একটি লোক হেঁটে চলেছে যেন, এই পড়ল, এই পড়ল। অ-বহমান বিদ্যুৎ, এই পালাল।
সেই ক্লেশ থেকে আমরা আজ মুক্ত? ধন্যবাদ? প্রযুক্তিবিদদের নানা স্তরের হাতাহাতি সহযোগিতায় বিদ্যুতের কেল্লা মার দিয়া। ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের যাদুঘরে বসে, সুখের হাতপাখা নাড়ি আর কারবাইডে পাকানো ল্যাংড়া চুষি, নাকের ডগায় ডুমোডুমো মাছি রেখে। দিনের তপস্যায় নেমেছে কালিদাসের রাত্রি।
বিবাহ-মঙ্গল
বিয়ের ব্যাপারটা আগের চেয়ে অনেক ছিমছাম হয়েছে। কোনও সন্দেহ নেই। বরপক্ষের স্টিম রোলার আর আগের মতো কনেপক্ষের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে না। চক্ষুলজ্জা এসেছে। শিক্ষা দীক্ষা বাড়ার ফল। লোকসংখ্যা বেড়েছে। বাসস্থানের সমস্যা বেড়েছে। চাপে পড়ে জীবনীশক্তিও কমে আসছে। অসভ্যতা করার মেজাজটাই নষ্ট হয়ে গেছে। কন্যাপক্ষের সঙ্গে পাত্রের দরদাম নিয়ে একটা রফা হয়ে গেলেই সুড়সুড় করে বিয়ে হয়ে যায়। লাভম্যারেজ হলে তো কথাই নেই। দু-পক্ষই ঠান্ডা। হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা। কাল বউ ছিল না, আজ আছে। গ্রহণ করতে হয় করো, না করতে পারো তো বলো। স্ট্যান্ডবাই ব্যবস্থা আছে। বিয়ে করব আমরা ম্যাও সামলাব আমরা! তাই পাড়া কাঁপানো উলু, ঘন ঘন শাঁখের শব্দ তেমন আর শোনা যায় না। ফুসফুসে আর তেমন বাতাস খেলে না। মেজোবউদি সাবেক আনন্দে এক ভলক উলু ঝেড়ে বিছানায় উলটে পড়ে আছেন। মেজদা পাম্প করে হাওয়া বের করছেন। বড় ছেলের বিয়েতে একটা দরজা খুলে পড়ে গিয়েছিল। দশ বছরের ব্যবধানে ছোট ছেলের বিয়ে হচ্ছে। কত্তা সকলকে সাবধান করেছেন—সেবারের মতো গায়েহলুদ কোরো না। কাঠের দাম এখন মানুষের দামের চেয়েও বেশি। সেবার গৌরী ছিল। এবার আর কে থাবা থাবা হলুদ নিয়ে হুল্লোড় করবে? আমাদের আর সে তেজ নেই। প্রশান্তও ওসব পছন্দ করে না। প্রফেসারের বিয়ে। বাড়াবাড়ি করলে বাড়ি ছেড়ে পালাবে।
কন্যাপক্ষের সঙ্গে বরপক্ষের এখন জেন্টলম্যানস এগ্রিমেন্ট হয়। ফ্রিজ চেয়েছিলেন দিয়েছি। টিভি দিয়েছি। এক বছর শীতের তত্ব, ষষ্ঠী, পুজোর প্রণামী, গ্রীষ্মের ল্যাংচা, লিচু, খরমুজ, তরমুজ করার মুচলেকা দিচ্ছি। বিয়েতে বত্রিশটা শাড়ি প্রণামী দিয়েছি। একটা অনুরোধ, তিরিশ জনের বেশি বরযাত্রী দয়া করে আনবেন না। আমরাও এদিক থেকে পনেরো জনের বেশি যাব না। আমার বাড়ি ছোট, আপ্যায়ন করতে পারব না। কোঁচা দুলিয়ে পাম শু পরে বর এলেন। সঙ্গে পুঁদে পিতাঠাকুর। কন্যাপক্ষ তটস্থ। পান থেকে চুন খসলেই নন্দী-ভৃঙ্গির দল আটচালা উপড়ে দেবে। দয়া করে মেয়েটিকে নিতে এসেছেন, মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্টের মতো মেয়ের বাবা। বেয়াইয়ের পায়ে পায়ে ঘুরছেন। এমন ঘটনাও শোনা গেছে, পাত থেকে কমলাভোগ তুলে তুলে ছাদের তেরপল ফাঁক করে নীচে ফেলে দিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে চিৎকার তুলেছে, কই হে, নিয়ে এসো, নিয়ে এসো, সব ফুরিয়ে গেল নাকি হে! বদমাইশিটা বুঝতে পেরে বিব্রত পাত্রীপক্ষ নীচে দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিলেন চাদর ধরে। কমলাভোগ পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে পাতে। শঠে শাঠ্যং।
