সরুন আমি নিয়ে যাচ্ছি। আপনি বইছেন কেন! আর কেউ নেই?
না, আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। আমার চেহারা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন না।
আমি খুব খাটতে পারি।
চেয়ারটাকে জানালার পাশে আমাদের দিকে মুখ করে রাখা হল। কিছু পরেই তিনি পাত্রীকে নিয়ে এলেন। সাজগোজের কোনও ঘটা নেই! ফিকে নীল শাড়ি। হাতাওয়ালা সাদা ব্লাউজ। চুলে একটা এলো খোঁপা। কপালের মাঝখানে ছোট্ট একটি টিপ।
মেয়েটি নমস্কার করে চেয়ারে বসল। পুরো ব্যাপারটাই অস্বস্তিকর! বোকা বোকা হৃদয়হীন নির্দয় একটা ব্যাপার। দু-জোড়া চোখ প্রায় অসহায় একটি মেয়েকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে! আমি সেভাবে না দেখলেও বিকাশ অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে দেখছে। মাপজোক করছে। সুন্দরী বউ চাই। ডানাকাটা পরি চাই। লেখাপড়ায়, চাকরিতে বাল্যবন্ধু সোমেন মেরে বেরিয়ে গেছে। হেরে আছে একটা জায়গায় বিয়েতে। পেয়েছে খুব, কিন্তু বউ নিখুঁত সুন্দরী নয়! বিকাশ বউ দিয়ে মেরে বেরিয়ে যাবে।
মেয়েটি মুখ নীচু করে বসে আছে। ভদ্রলোকের মুখের আদলের সঙ্গে মেয়েটির মুখ মেলে— ধারালো অভিজাত মুখ। চাঁপা ফুলের মতো গাত্রবর্ণ। লম্বা ছিপছিপে বেতসলতার মতো চেহারা। ভারি সুন্দর। বেশ একটা মহিমা আছে। অন্তত আমার চোখে। মেয়েটি খুব নম্র। ভীরু মনে হল। বসে আছে অসহায় অপরাধীর মতো।
ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ছেলেবেলায় দিদি আর জামাইবাবু মারা যাবার পর আমার এই ভাগনি আমার কাছেই মানুষ। তখন আমাদের সাংঘাতিক দুরবস্থা। তবু আমি আমার কর্তব্য করে গেছি। পড়িয়েছি। গান শিখিয়েছি। সভ্যতা, ভদ্রতা, সংসারের যাবতীয় কাজ শিখিয়েছি। একটাই আমি পারিনি। তা হল ভালো করে খাওয়াতে পারিনি। তার জন্যে দায়ী আমাদের অভাব। আমার রোজগার করার অক্ষমতা। তবে এই গ্যারান্টি আমি দিতে পারি, এমন মেয়ে সহজে পাবেন না। দুঃখের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বড় হয়েছে। ওদিকে বড় ঘরের সংস্কারও কাজ করেছে। মেয়েটিকে আপনারা গ্রহণ করুন। আমার শরীর ক্রমশই ভেঙে আসছে।
বিকাশ ফট করে উঠে পড়ল। একেবারে আচমকা।
ভদ্রলোক অপদস্থ হয়ে বললেন, কী হল! আমি কি কোনও অন্যায় করে ফেললুম!
বিকাশ একেবারে গুলি ছোড়ার মতো করে বললে, যে মাল বিজ্ঞাপনের জোরে বিকোতে হয় সে মাল ভালো হয় না।
মেয়েটি শিউরে উঠল।
ভদ্রলোক বললেন, এ কী বলছেন আপনি!
ঠিকই বলছি। আপনার ভাগনির স্ত্রী-রোগ আছে।
আমার পক্ষে সহ্য করা আর সম্ভব হল না। সমস্ত শক্তি এক করে বিকাশের ফোলা ফোলা গালে ঠাস করে এক চড় মারলুম। আর একটা চড় তুলেছিলুম। ভদ্রলোক ছুটে এসে আমার হাত চেপে ধরলেন। উত্তেজনায় কাঁপছেন। বিকাশের নিতম্বে কষে একটা লাথি মারার বাসনা হচ্ছিল।
বিকাশমুখে অহংকারী, শরীরে দুর্বল। হন হন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
আমি ফিরে তাকালুম! ভীরু মেয়েটির ঠোঁট ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। বড় বড় পাতাঘেরা চোখে জল টলটলে! সেই মুহূর্তে ভেতরের বাড়িতে শাঁখ বেজে উঠল। পুজো হচ্ছে গৃহদেবতার। ঘণ্টা বাজছে টিং টিং করে। আমি পিছোতে পিছোতে চৌকিটার ওপরে গিয়ে বসলুম। আমার ভীষণ একটা তৃপ্তি হয়েছে। একটা অসভ্য একটা ইতরকে আমি আঘাত করতে পেরেছি। অসীম সুখে আমার মন ভরে গেছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে যখন শাঁখ আর ঘণ্টা বাজছে পুজোর ঘরে, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সাংঘাতিক একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললুম। ভদ্রলোককে বললুম আপনি দিন দেখুন, আমি বিয়ে করব। আমি বড় চাকরি করি না, তবে মানুষ। বিয়ে এখন বড়লোকের ব্যবসা, তবু আমি এই ঝুঁকি নেব। আমর পিতা এলে পাকা কথা বলে যাবেন। হ্যাঁ তার আগে আপনার ভাগনিকে জিগ্যেস করুন আমাকে পছন্দ কি না?
ভদ্রলোক আমার কাঁধে হাত রাখলেন; তখনও হাত কাঁপছে।
মেয়েটি অস্ফুট বললে, আপনাকে আমি চিনি।
কী করে!
আমি বইয়ে পড়েছি এমন চরিত্রের কথা।
আমি বাস্তব নই!
কাল বোঝা যাবে।
মেয়েটি পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ; তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।
ভদ্রলোক আবেগের গলায় বললেন, তুমি বাস্তব হবে তো!
বিদ্যুতের জাদুঘরে
ওই যে দেখছেন সিলিং থেকে ঝুলছে লম্বা ডান্ডা, চারটে পাখা, ওই বস্তুটির নাম ছিল ফ্যান— ভাতের ফ্যান নয়, এফ এ এন ফ্যান—চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মানুষকে হাওয়া দিত।
তাই নাকি? কে ঘোরাত?
বিদ্যুৎ নামক একটি শক্তির সাহায্যে এই বায়ুচক্রকে ঘোরানো হত। সেই শক্তিও আর নেই। সেই ঘূর্ণনও আর নেই। তবু ঝুলিয়ে রেখেছি স্মৃতি হিসেবে। পরোপকার কিংবা জীবে প্রেমও বলতে পারেন। চড়াই পাখিরা ওড়াউড়িতে ক্লান্ত হয়ে মাঝে মাঝে এই পক্ষবিস্তারে পদস্থাপন করে পশ্চাদ্দেশঈষৎ ঝুলিয়ে সেকালের মুড়ি লজেনচুষের মতো কিছু প্রাকৃতিক বস্তু নীচে নিক্ষেপ করে স্মরণ করিয়ে দেয়—তোমাদের গতি ঊর্ধ্বে নয় অধে, অগ্রে নয় পশ্চাতে। তবে হ্যাঁ, মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে—দেশেদুগ্ধ বিপ্লব শুরু হয়েছে, কল টিপলেই দুধ বেরোবে, জোয়ার খেলে। যাবে, তখন ড্রাম ভর্তি দুধে ওই চক্রবস্তুকে চুবিয়ে, দৈহিক অশ্বশক্তি প্রয়োগ করে মন্থন করতে করতে নবনী প্রস্তুত করে, কুরুক্ষেত্রের সেই কৃষ্ণকে আবাহন করে বলব—প্রভু! আবার ফিরে গেছি সেই যুগে একদিকে পঞ্চপাণ্ডব অন্যদিকে দুঃশাসন, মাঝে ভারতভূমি, সূর্যোদয়ে। দিবালোক, সন্ধ্যায় আঁধার, মনুষ্য-শৃগালের রাজনৈতিক চিৎকার, দুর্যোধনের হুহুঙ্কার, বাতি জ্বেলে যুধিষ্ঠির সাট্টাক্রীড়া, প্রভু! এসো! তোমার বাল্যলীলার জন্যে সঞ্চিত নবনী, আর একটি গীতা শ্রবণের ইচ্ছা রাখি না, তোমার নবলীলা দেখি আঁধারের ঘুঘু হয়ে।
