এক হাতে সুজি অন্য হাতে দুধ নিয়ে বিকাশ ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়ি ঢুকল। এখুনি দৌড়োতে হবে এয়ারপোর্টে। তাহলে তুমি একটু সুজির পায়েস করে ঠোঁট দুটোকে তর্কচঞ্চর মতো করে স্টেনলেস স্টিলের চামচে দিয়ে আস্তে আস্তে টাগরায় ফেলে স্টমাকের দিকে ম্যানেজ করে নিয়ো। মুখ বাঁকালে কেন? তোমার মুখের ওই ছিরি দেখলে গা হিম হয়ে যায়। কী করবে বলো। ক’টাদিন একটু কষ্ট করো। তারপর আবার গরগরে মাছের ঝাল, ঝরঝরে ভাত, ডাঁটাকটাস কটাস সুপুরি। আপাতত দাঁতের হলিডে।
বিকাশ বেরোতে গিয়ে ফিরে এল। সুজির পায়েস করতে জানো তো! তুমি তো এই চোদ্দো বছরে
তিনটে জিনিসই বারে বারে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করে গেলে, ভাত, চেয়ে থাকা ডাল আর মাছের তেল গড়ানো সরষে ঝাল; সেই এক কনসার্ট। শুকনো কড়ায় সুজিটাকে একটু নেড়ে লাল লাল করে। দুধে ঢেলে ফোঁটাবে, পাতলা থাকতেই নামাবে, ঈষদুষ্ণ পেটে চালান করবে। ফিরে আসি তারপর যা হয় ব্যবস্থা করব।
একটু সেঁক দিয়ে দেখতে পারো। মুখে মাফলার জড়াও। ও হ্যাঁ। বিকাশ আবার ফিরে এল। একটা ছোট এলাচ, গোটা দুই তেজপাতা দিয়ে।
বিকাশ একটু বেলাবেলি ফিরে এল। হাতে কাগজে মোড়া ছোট একটা কৌটো। দরজার সামনে এটা আবার কার চটি! গোড়ালিটা খয়ে খয়ে গেছে। স্ট্র্যাপে সোনালি রং লাগানো ছিল যৌবন বয়সে। প্রৌঢ়ত্বে দাঁত বেরিয়ে গেছে। কোন মাল আবার এলেন? বিকাশ ভাবতে ভাবতে দরজা ঠেলল। ঠেলতেই খুলে গেল। ওরে বাবা! শোবার ঘরে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন সেই জাঁদরেল মহিলা। ঘটিহাতা উলিকট ব্লাউজ। ধবধবে সাদা ফিতে পাড় শাড়ি। ঘিয়ে রঙের শালে সুঁচের কাজ করা। শাশুড়ি খুব একটা দূরে থাকেন না। মাঝে মাঝেই মেয়ের খবরদারি করতে। আসেন। জামাই কেমন রেখেছে মেয়েকে দেখতে হবে না! প্রায়ই ভদ্রমহিলা বলেন, তুই যদি না পারিস বল, আমি বলছি জামাইকে। বিকাশের কেল্লা একা কুম্ভ নয়, কুম্ভ আর কুম্ভি দুজনে রক্ষা করছেন।
বিকাশকে দেখে মহিলা মাথায় একটু ঘোমটা টেনে দিলেন। ঘাড়ের কাছে গোল খোঁপায় কাপড়টা আটকে রইল। একটু আগেই বোধহয় মুখে জর্দা পান ঠুসেছিলেন। রোমন্থন চলেছে। ইদানীং একটু মোটা হয়েছেন। বিকাশ লক্ষ করেছে, বিধবারা যেন একটু মোটাই হন। স্বামীদের খপ্পর থেকে বেরোতে পারলেই মুক্তির আনন্দে স্বাস্থ্য ফিরে যায়।
কেমন আছেন? বিকাশ ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল।
ওই এক রকম আছি, কে আর আমার খবর রাখছে বলো! উত্তরে বিকাশ হে হে করে একটু হাসল। সব অভিযোগের উত্তর বিকাশ এইভাবেই সহজ সরল করে নিয়েছে। খাটের বাহুতে পিঠ রেখে আরতি বসে আছে। নীল গরম চাদরের ঘোমটা। মুখটা রূপকথার ডাইনির মতো। ঘটের। ওপর ওলটানো ডাব। তলার দিকটা ফুলো। মাথার দিকটা সরু। কেমন আছে? আছ না বলে। বিকাশ আছে বলল। স্বাভাবিক আরতির হাজার ল্যাঠা। এখন একমাত্র খবর দাঁত। দাঁত কেমন আছেন?
মা যখন রয়েছেন, গর্ভধারিণী, তখন মেয়ে কেন জবাব দেবে! আরতির মা বললেন, তোমার বাবা দোষ আছে। সংসারে কোনও ব্যাপারে তোমার তেমন গা নেই। এসব কি ফেলে রাখার জিনিস?
সেপটিক হয়ে গেছে! গত বছর নন্দা এইভাবেই গেছে। ডাক্তার-বদ্যি কেউ কিছু করতে পারল। মুখ ফুলছে, ক্রমশ ফুলছে, এই এতখানি, বাতাবি লেবু। ব্যস, সেই ফোলাই কাল-ফোলা।
কে নন্দা, কোথাকার নন্দা, গড নোজ! ওনার স্টকে এইরকম বহু মাল আছে। এ বলে আমায় দ্যাখ ও বলে আমায় দ্যাখ। বিকাশ কেবল অনুমান করার চেষ্টা করল নন্দার মুখটা ফুলে তার স্ত্রীর মার মতো হয়ে উঠেছিল, না আরও বেশি। বিকাশ বলল, চলো তাহলে, ডাক্তার মিত্রের কাছে। নাও, রেডি হয়ে নাও। আমি রেডি, জামা-কাপড় আর ছাড়ব না।
বিকাশ হাতের মোড়কটা আয়নার তলায় ছোট ব্র্যাকেটে রাখতে রাখতে বললে, এনেছি মোক্ষম জিনিস। দাঁতের যম। দেহ যাবে তবু দাঁত যাবে না। শিকড় পর্যন্ত শক্ত বটের ঝুড়ি নামিয়ে দেবে।
কী জিনিস! আরতির মার কৌতূহল।
গুড়াখু। অভ্যেস করতে পারলে এর চেয়ে ভালো মাজন আর কিছু নেই। আমাদের পঞ্চার প্রেসক্রিপশান। আরতির মানন্দাকে ছেড়েছিলেন, বিকাশ পঞ্চকে ঝেড়ে কিস্তি মাত করে দিলে।
ওঃ বাবা সাংঘাতিক জিনিস! খবরদার তুই যেন ভুলেও ব্যবহার করিসনি! মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়বি আর মরবি; তোর আবার লো-প্রেসার। মা মেয়েকে এমনভাবে শাসন করলেন, জামাই যেন মারবার প্ল্যান করছে।
নিত্য বিষ খেয়ে লোকে বেঁচে আছে, বংশবৃদ্ধি করছে। কৌটো কৌটো জর্দা ফাঁক করে নিজে। তোফা আছেন। সামান্য দোক্তার মাজনে ওনার মেয়ে উলটে পড়বেন! নিজের গর্ভ সম্পর্কে কী ধারণা! কথা না বাড়িয়ে আরতিকে তাড়া লাগাল।
খানকতক গাওয়া ঘিয়ে লুচি ভেজে দি, সুজির পায়েস দিয়ে খাও। এতটা রাস্তা যাবে। আরতি মার তোয়াজের জন্য খাট থেকে নেমে এল। তুমি বরং একটু ময়দা ঠেসে দাও। আমি ঠাসতে গেলে শিরে চাপ পড়ে দাঁতটা হু-হু করে উঠবে।
ওসব করতে গেলে ডাক্তারকে আর ধরতে পারব না। বিকাশ লুচির হাত থেকে বাঁচতে চাইল। না না, আগে ডাক্তার। আরতির মা খুঁতখুঁত করে বললেন, তাহলে একটু সুজি আর চা খাও না।
তাই দে! কিছুনা খেলেও চলে। বেলায় খেয়েচি। শরীরটা ঢিস ঢিস করছে। মহিলা বিশাল একটা হাই তুললেন। বিকাশের বিশ্বরূপ দর্শন হল! গজালের মতো সারি সারি দাঁত। পান-দোক্তার রসে পাকা বাঁশের মতো চেহারা।
