দুটো হাঁটুর মাঝখান থেকে আরতির মুখটা উঠে এল। ওরে বাবারে! এর কার মুখ! বিকাশের স্ত্রীর! না রাবণের! তেবাঁকা শাঁকালু। ডানপাশটা ফুলে ডিমের মতো মুরগি বা হাঁস নয়, একেবারে রাজহাঁসের ডিম যে গো! কী করে করলে? একরাতেই এতটা বড়! যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে।
আরতির চোখের কোল বেয়ে বেশ বড় সাইজের মুক্তোর দানার মতো এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এল! এখন কী হবে? উত্তরে আরতি একটা হাত ওপরে তুলল। ঈশ্বর জানেন কী হবে! মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। সমগ্র মুখগহ্বরে বিশাল একটি আন্ডা।
এ বস্তুকে সামলানো বিকাশের জ্ঞানবুদ্ধির বাইরে। সেলফ মেডিকেশান আর চলবে না। চা করতে করতে বিকাশের মনে পড়ল, কোথায় যেন পড়েছিল, জামগাছের ছাল পুড়িয়ে দাঁতের গোড়ায় লাগালে উপকার হয়। এ-ও পড়েছিল, একবার ঠান্ডা জল একবার গরম জল পালা করে কুলি। করলে কিছু একটা হয়। কিন্তু যেরকম ফুলেছে তাতে তো কোনও টোটকাই চলবে না! সারাদিন বেচারা খাবেই বা কী! মহা মুশকিল। ওই শরীর নিয়ে রাঁধবেই বা কী করে! অদ্য হরিবাসর। আমাকে তো এখুনি বেরোতে হবে।
আরতির সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে বিকাশ জিগ্যেস করল, রান্নাবান্নার কী হবে? আড়চোখে চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে আরতি ঠোঁট ফাঁক না করে যা বলল তা অনেকটা এইরকম শোনাল, ‘উমা ববে। বো বকমে। বো বকমে।’
বাবা! এ আবার কী ভাষা! বিকাশ তাড়াতাড়ি একটা স্লিপল্যাড আর পেনসিল এগিয়ে দিল। প্লিজ বাংলা অথবা ইংরেজিতে লিখে দাও।
আরতি খুব বিরক্ত মুখে লিখল, কোনওরকমে হবে।
তুমি কী খাবে?
আরতি লিখল, জল পর্যন্ত সহ্য হচ্ছেনা, গরমও নয় ঠান্ডাও নয়। অতএব উপোস।
যাঃ, তা কখনও হয়! কিছু একটা খেতেই হবে। সারাদিন উপবাস করে থাকবে কি?
আরতি একটু হাসল। বিকাশ অবাক হয়ে দেখল, মুখটা ঠিক যেন ন্যাকড়ায় জড়ানো একতাল ডালভাতে।
আচ্ছা! বেশ পাতলা করে খিচুড়ি খেলে কেমন হয়?
উত্তরে আরতি এমনভাবে মাথা নাড়ল বিকাশ যেন বিষ খেতে বলছে!
তাহলে দুধ দিয়ে সুজি ফুটিয়ে খেলে কেমন হয়?
বিকাশ বেশ বুঝল আরতি মুখ বাঁকাল! তবে মুখটা এমনিই তেড়াবেঁকা হয়ে আছে বলে বোঝা গেল না। না, বিকাশের আর কথা বলার সময় নেই। অন্যদিনের চেয়ে অন্তত দু-ঘণ্টা আগে বেরোতে হবে। আজ আবার লোডশেডিং-এর নির্ঘণ্ট। অমনি ফচাত করে পাওয়ার চলে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে কলের মোটা জলের ধারা মূত্রধারা থেকে অশ্রুধারা হয়ে যাবে। দৌড়ে একবার। দোকানে যেতে হবে সুজি, রতনের দুধ, দুটো বড় নরমপাক ব্যবস্থা করে দিয়ে না গেলে, পরে ঝগড়াঝাঁটির সময় খোঁটা খেতে হবে। বউদের ওপর তো বিশ্বাস কি নির্ভরতা কোনওটাই রাখা চলে না। কুকুরের বদমেজাজের মতো। মাথায় হাত বুলোচ্ছে, পটাপট লেজ নাড়ছে। পরক্ষণেই কী হল খ্যাঁক করে কামড়ে দিল। এই গলায় গলায় এই আদায়-কাঁচকলায়।।
রতনের দোকানে দুধের লাইনে দাঁড়িয়ে বিকাশের হঠাৎ মনে পড়ল, আরে রতনের মার কাছে অব্যর্থ দাঁতের মাদুলি আছে বলে শুনেছি। একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না? মোষের মতো মুসঘুসে রতন বড় হাতা উঁচু গলা উলিকট গেঞ্জি পরে বিশাল একটা ব্যারেল থেকে অ্যালুমিনিয়ামের মগ ডুবিয়ে ডুবিয়ে ক্রেতাদের ঘটিতে-বাটিতে-গেলাসে-ক্যানে ছিড়িক ছিড়িক করে দুধ ঢালায় ভীষণ ব্যস্ত। দুধ আবার দুরকমের—গরু, মোষ; এখন কি আর মাদুলির কথা জিগ্যেস করা যাবে? বিকেল! বিকেলেও দুধ। গভীর রাতে; তখন আবার ছানায় জাঁক। দুপুরে! দুপুরে নাক ডাকিয়ে মোষের মতো ঘুম। রতনের গায়ে-গতরে সোনা মোড়া আহুদি বউয়ের। নিশ্চয়ই দাঁতের যন্ত্রণা হয় না। কী করে হবে! দেবতা হাতের মুঠোয়। কী সুখের জীবন! লেখাপড়া শিখলেই মানুষের মনে অশান্তি, যত দুঃখ। লেখাপড়া করিবে মরিবে দুঃখে।
বিকাশের পাত্রে দুধ ঢালছে রতন। রতনের মুখে বিকাশ কখনও হাসি দেখেনি। ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের মুখের মতো। বিকাশ একগাল হাসল। যদি রতন হাসে, তাহলে মাদুলির কথাটা। পাড়বে। সেই মুখই নয়! সবসময় একটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব। পয়সা হলে যা হয়। জল বেচে। পাঁচতলা বাড়ি-গাড়ি। দোকানে ফোন, টিভি! ফ্রিজ। তবু বিকাশ তাক করে কথাটা ছুড়ল—শুনেছি। আপনার মার কাছে দাঁতের মাদুলি পাওয়া যায়?
হ্যাঁ যায়! বিকাশকে হাতের ঝটকায় লাইনচ্যুত করে, পরবর্তী খদ্দেরকে পোজিশনে এনে রতন বলল, এখন পাওয়া যাবে না।
কেন স্যার! বিকাশ স্যার বলে সম্বোধন করে ফেলে নিজেকেই নিজে গালাগাল দিল। ব্যক্তিত্বর অভাব। তেমন ব্যক্তিত্ব থাকলে এক ধমকে বউয়ের দাঁত ব্যথা ভালো করে দেওয়া যায়। আগের যুগের মেয়েদের অসুখ করলে টুঁ শব্দটি করার উপায় ছিল কি? রতন দুধ দিতে দিতেই বললে, মা তীর্থ করতে গেছেন। একমাস পরে ফিরবেন।
হয়ে গেল! এক মাস তো ওই ফোলামুখ ঝুলিয়ে রাখা যায় না। নিজের দাঁত হলে কথা ছিল না। এ বাবা বউয়ের মুখ! ফোলা মুখ যেই চুপসে যাবে অমনি ছুটবে বাক্যবাণ। কোরামিনের বাবা। মরা মানুষ জ্যান্ত হয়ে এক বস্ত্রে গৃহত্যাগ করে হরিমুদির লাটে ওঠা দোকানের রকে গিয়ে বসবে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে বিচিত্র জগৎ-সংসারের দিকে। কী হয়েছে দাদা! দাদা বোবা! গৃহিণী ঝেটিয়ে শুধু কর্তাকেই বের করেননি, মগজটিকেও ধোলাই করে দিয়েছেন। একেবারে ভ্যাকুয়াম।
