আমি চা করি তুমি বরং মাকে সুজিটা দাও। তুমিও একটু নাও! আজ রাতে অন্য কিছু নেই। সব সুজি। হোল ফ্যামিলি সুজি।
ভালোই হয়েছে—সুজি নাইট। সকলেরই দাঁতের গোঁড়া ফুলেছে বলে ধরে নেওয়া যাক।
বিশাল ডেকচিতে সুজির পায়েস। রতনের খাঁটি দুধ ওপরে লোভনীয় সরের আঁচল বিছিয়ে রেখেছে। একটি তেজপাতা মুখ থুবড়ে পেছন উলটে পড়ে আছে। ‘আরকটিক’ সাগরে পেঙ্গুইন যেন মাছ খুঁজতে গিয়ে যেই ডুব মারতে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে জল জমে বরফ! পাশ থেকে এক চামচ কেটে তুলে নিয়ে বিকাশ আলগোছে মুখে ফেলল। বাপস কী মিষ্টি! মহিলা গত জন্মে বোধহয় ডেয়ো পিঁপড়ে ছিলেন, এ জন্মে কাঠপিঁপড়ে? আরতির মা চা খেতে খেতে মেয়েকে বললেন, আমিও যাব নাকি তোর সঙ্গে?
জামাইকে যেন বিশ্বাস নেই। কোথায় কোন হাতুড়ে-টাতুড়ের কাছে নিয়ে যাবে। নিজের চোখে। চেম্বার আর ‘ফি’-র অঙ্কটা দেখতে পেলে তবু একটু স্বস্তি। না, জামাইয়ের বেশ কিছু খসল। মেয়ে তাড়াতাড়ি বললে, না তার আর দরকার নেই! এতটা রাস্তা তোমাকে আবার যেতে হবে।
সাধে তোমাকে বলি বিকাশ, চায়ে চুমুক দিয়ে ভদ্রমহিলা বিকাশকে বললেন, সাধে তোমাকে বলি, মেয়ের আমার অনেক ফাঁড়া। সেই ছেলেবেলায় কী করেছিল জানো? লুকোচুরি খেলছে। মেয়ে। ভীষণ আদুরে ছিল তো! ওই মেয়ে আসতেই তো কত্তার বরাত ফিরল। বাড়িতেই খেলছে। অত বড় বাড়ি! কে আর খেয়ালে রেখেছে। রাতে খেতে বসে কত্তার খেয়াল হয়েছে। মেয়ে কোথায়? মাছের ডিম খাবে। পার্শে মাছের এক জোড়া ডিম পাতের পাশে আলাদা করা আছে। খোঁজ খোঁজ। কোথায় মেয়ে, কোথায় মেয়ে? কোথাও নেই। ওমা সে কী রে! কী সব্বনেশে ব্যাপার! দ্যাখ কোথা গেল। কত্তার খাওয়া মাথায় উঠল। তুমি থামো তো বাপু। আরতি বোধ হয়। মার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকাল। মেয়েকে ধমক দিয়ে ভদ্রমহিলা আবার শুরু করলেন।
বাড়ি তোলপাড়। কত্তা বললেন, পুলিশ ডাক। জেলে এনে সবকটা পুকুরে জাল ফেল। এদিকে ন গিন্নির প্যানপ্যান মেয়েটা সন্ধে থেকে কচ্ছে কী, দেখে যাও মা এই সিন্দুকে কী আছে। তুই থাম
তো বাপু, খালি একটা কতকালের সিন্দুক তার মধ্যে আবার কী থাকবে? গুচ্ছের আরশোলা। কেবলই বলে, দ্যাখো না খুলে, দিদি আছে। শেষে কত্তা বিরক্ত হয়ে বললেন, খুলে একবার দেখিয়ে দে তো মেয়েটাকে। অন্তত একটা শান্তি হোক। ঠাকুরপো সিন্দুকটা খুলতে খুলতে বললে, দ্যাখো। দেখে যাও কী আছে। ডালাটা খুলেই চিঙ্কার। ওমা! এই তো মেয়ে। কত্তা সাবধান করছেন, হাত দিয়ো না, আর এগিয়ো না। এ মার্ডার কেস। আঙুলের ছাপ পড়বে। জ্ঞাত শত্রুর কাজ। আগে পুলিশ আসুক। রাখো তোমার পুলিশ। আমার কম সাহস! সোজা গিয়ে মেয়ের নাকের কাছে হাত। দিব্যি নিঃশ্বাস পড়ছে। আরতি, এই আরতি। মেয়ে ঘুমোচ্ছে। ভোঁস ভোঁস
করে ঘুমোচ্ছে। শেষে কী ব্যাপার! না মেয়ে লুকিয়েছে, আমাদের পিলে চমকে যায়। কত্তা বললেন, এ মুদিনীর ওপর যায়।
—মুদিনীটা কে? বিকাশ প্রশ্ন না করে পারল না।
—ওই যে, সেই সময় এক যাদুকর বেরিয়েছিল। সিন্দুকের খেলা দেখাত।
—ও হুর্ডুনী।
—ওই হল, হুডিনী না মুদিনী।
বিকাশ আড়চোখে বউকে একবার দেখে নিল। এমন মূল্যবান বস্তু চিরকাল সিন্দুকে থাকলেই তো ভালো হত। কী দরকার ছিল, ধূলার এ ধরণীতে সংসারের পাদানিতে।
ডেন্টিস্ট বললেন, সাংঘাতিক করে এনেছেন। এ তো শুধু দাঁত নয়, সেপটিক হয়ে গেছে। কী করেছিলেন? পিন, সেফটিপিন দিয়ে খোঁচাখুঁচি? আরতি একটু ভেবে বললে, সেফটিপিন।
সর্বনাশ! সবার আগে টিটেনাস টকসয়েড তারপর চড়া ডোজে অ্যান্টিবায়োটিকস। ফুলো সাবসাইড করুক, তারপর একসট্রাকশনের কথা ভাবা যাবে।
আপনি মশাই বাড়ি থেকে আলপিন, সেফটিপিন, মাথার কাঁটা সব বিদেয় করুন। মেয়েদের খোঁচা মারা রোগ জীবনে যাবে না।
যোলো টাকা ডাক্তারের হাতে ঝেড়ে দিয়ে আরও গোটা ষোলো টাকা ওষুধে গচ্চা দিয়ে, খোঁচামারা বউ নিয়ে বিকাশ বাড়ি ফিরে এল। রাতে দুশ্চিন্তায় ভালো ঘুম হল না, এই বয়েসে স্ত্রীবিয়োগ হলে, দ্বিতীয়বার তো আর পিঁড়িতে বসতে পারবে না। তখন একটা ছেলে, একটা মেয়ে নিয়ে করবে কী! মাঝরাতে লেপটা সরিয়ে আরতির মুখটা আবছা আলোয় একবার দেখল। ঘুমন্ত ভিসুভিয়াস। ফুলোটা একটু কমছে কি? দুটো ট্যাবলেট তো পড়েছে। বিকাশ আবার শুয়ে পড়ল। যেমন করেই হোক টাকার জোগাড় করে দাঁতগুলো ঠিক করে দিতে হবে। বাবা তবু সকাল-সন্ধে ব্রাশ করে, কার্বলিক দিয়ে, ছিয়াত্তর বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেন। রক্ত হাই সুগার। সহজে ছানি। সারানো কি দাঁত নড়ানো চলবে না। বউয়েরটাই প্রায়োরিটি। দাঁত তোলার আগে ব্লাড, ইউরিন, দাঁতের এক্স রে সবকিছু করাতে হবে। একগাদা খরচ, তা হোক, তারপর তোলালেই তো হবে না। ফোকলা করে ফেলে রাখা যায় না। বাঁধাতে হবে। সেও এক ঝামেলা।
সকালে মনে হল, ফোলাটা একটু কমেছে। যাক বাবা। এ যাত্রা রক্ষে পেল।
বিকাশ মনে মনে হিসেবটা ঝালিয়ে নিল—এক-একটা দাঁতের পেছনে বত্রিশটাকা করে, বত্রিশ ইনটু বত্রিশ। তারপর বাঁধানো, আরও হাজার। দু-হাজার টাকার ধাক্কা! কে জানত বউয়ের দাঁত এত মূল্যবান? সামনের বার বিয়ে করতে হলে টুথলেস মহিলা বিয়ে করবে। কাবুলের সিডলেস খেজুর কি দক্ষিণের স্টেনলস আঙুরের মতো দন্তহীন স্ত্রী। একমাত্র সেঁতো হাতির কথা চিন্তা করা যায়। শ্বশুর মহাশয়ের সেঁতো মেয়ে মহা জ্বালা। প্রথম জীবনে দাঁত খিচিয়ে। শেষ জীবনে প্রভিডেন্ট ফান্ড ধরে টানাটানি করে।
