বিকাশকে চাবিটা দিলেন। বাক্সটা খোলা, উত্তরের দেয়ালে টুলের উপর রংচটা লোহার ক্যাশ বাক্স। খুলেছিস? —আজ্ঞে হ্যাঁ। ডানদিকের খোপের খামটা তোল। নীল ফিতে বাঁধা আর একটা চাবি পাবি। পেয়েছিস! আজ্ঞে হ্যাঁ,–নিয়ে আয়।
বিকাশ চাবি হাতে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় রইল। উত্তরের ঘরের তালা খুলে আলমারির মাথায় আর একটা সাদা চাবি পাবে। আলমারিটা খুললেই একেবারে নীচের তাকের বাঁ-দিকে কাচের স্টপার লাগানো একটি শিশি পাবে।
আলমারির মাথায় একসার বই দাঁড় করানো। একটা দাড়ি কামাবার টাকপড়া বুরুশ, গোটাকতক ওষুধ আর সাবানের বাক্স, হরলিকসের শিশিতে চিনি, একটা দূরবিন। যাক চাবিটা পেয়েছে। শিশিটাও সহজে পেল। শোনো, জাস্ট একটু টাচ করে দেবে। জিভে যেন না লাগে, সঙ্গে সঙ্গে ফোসকা হয়ে যাবে। থুতু ফেলে দিতে বলবে। ওঃ। দাঁতের ব্যথা সাংঘাতিক ব্যথা…দন্তশূল পিত্তশূল। সব শূলের ক্যাটিগরি।
বিকাশ শিশি হাতে নেমে এল। বেশ সুন্দর শিশিটা। মেট্রো প্যাটার্নের ছিপি। প্রায় আধশিশির মতো অ্যাসিড। আরতি লেপমুড়ি দিয়ে ডানপাশে কাত হয়ে বাবা রে মা রে করছে।
—ওঠো। দাঁতের যন্ত্রণার যম এনেছি। ওঠো লাগিয়ে দি।
—কী জিনিস?
—ওঠোই না। সরু কাঠিতে একটু তুলো জড়াও।
—তুলো এনেছ?
—নীচে নেই?
—নীচে তুলো কোথায়? তুলো তো ওনার কাছে।।
—আবার যেতে হবে? বেশ মানুষকে বারে বারে বিরক্ত করা।
আরতি উঠে বসেছে। বিকাশ জোর আলোটা জ্বালা। দাঁড়াও তুলো নীচেই আছে। আমার মাথার বালিশে একটা ফুটো আছে। আঙুল ঢোকালেই তুলো আসবে।
—কী যে বলো। শিমুল তুলোয় হয় নাকি? আর ফুটো তোমাকে বড় করতে দিচ্ছে কে?
বিকাশ আবার ওপরে উঠল, একটু তুলো।
আবার সেই এক প্রক্রিয়া। ডানের ড্রয়ারে চাবি। সেই চাবি দিয়ে, উত্তরের ঘরের চাবি, আলমারির মাথা। সব্বার ওপরের তাকে একসার বইয়ের পেছনে একটা ছোট বাক্স। সেই বাক্সে তুলো।
হাতটা জিভের কাছাকাছি নিয়ে গেল। রেডি ওয়ান টুঁ থ্রি লাগাও।
—ভয় করছে। আরতি প্রায় জলভরা চোখে বিকাশের দিকে অসহায়ের মতো তাকাল।
দাঁড়াও। তবে একটা বুদ্ধি এসেছে। আমার কাছে লম্বা একটা খাম আছে প্রায় তোমার জিভের মাপে। মা কালীর মতো জিভটা বার করো, পরিয়ে দি, খানিকটা প্রোটেকশান হবে।
বিকাশ সত্যি একটা সরু লম্বা খাম নিয়ে এল। ছেলের জন্যে ছবি আঁকার তুলি কিনেছে; সেই সময় খামটা এসেছিল। ডগার দিকটা সহজে ঢুকল। আগে গেল জিহ্বামূলে। তা যাক গে।। মানুষের অবাধ্য অবোধ জিভ সাধারণত ডগা খেলিয়েই সব কিছুর স্বাদ-বিস্বাদ পেতে চায়। ডগা দিয়েই ছোবল মারতে চায়। সেইটাকেই যখন খাপে পোরা গেছে, আর ভাবনা কী! নাও লাগাও। টুকটুক করে বারকতক ঠেকিয়ে দাও। ওঁ শান্তি।
আরতি যতটা ভীষণ কাণ্ড ভেবেছিল, ততটা হল না। খুব খানিকটা লালা বেরোল। সারা মুখে অদ্ভুত একটা লাইফবয় লাইফবয় গন্ধ। সেই চিড়িক ধরানো মাথা ঝনঝন করা অদ্ভুত মিনমিনে ব্যথাটা সত্যিই যেন একটু কমে গেল।
ঘরে আবার নীল আলো জ্বলে উঠল।
পুবের জানলায় কাচের মাথায় শুকতারা দেখা দিয়েছে। ঘূর্ণায়মান মঞ্চের মতো রাত একটু করে দিনের দিকে ঘুরে চলেছে। একটু পরেই আলমবাজারের চটকলের গম্ভীর ভোঁ বেজে উঠবে। পাশের চায়ের দোকানে কেটলি, চামচে নাড়ার শব্দ উঠবে। সামনের রাস্তায় মানসবাবুর ব্রংকাইটিসের ভীষণ কাশি শোনা যাবে। লেপের তলায় বিকাশের পায়ে নিজের পা কাঁচি করে আরতি বললে, ভোরে আর আমায় ডেকো না, চা-টা তুমিই করে খেয়ে ফেল।
বিকাশ কোনও উত্তর দিল না, সে তখন অন্য জগতে। ফডুত ফডুত করে তার নাক ডাকছে।
অ্যালার্মের শব্দে বিকাশ ধড়মড় করে উঠে বসল। সেকেন্ড খানেকের মধ্যেই ঘুমের ঘোর কেটে গিয়ে মনে পড়ল গতরাতের ঘটনা। ভাগ্যিস অ্যালার্মটা দিয়ে রেখেছিলাম! তাই তো ঘুম ভাঙল। উনি তো পড়ে পড়ে আটটা অব্দি ঘুমোবেন। রাতে ভালো ঘুম হয়নি, দাঁতের যন্ত্রণায়। চায়ের। জলটা তুমি চাপাও প্লিজ। তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে তিনশো দিনই যদি চা করে খেতে হয় তাহলে বিয়ে করেছিলাম কী কারণে! এই তো আমি বিকাশ চন্দ্র–ঝড় হোক, জল হোক, অসুখ হোক, যাই হোক অফিস তো বাবা যেতেই হয়। ফোর্টিন ডেজ ক্যাজুয়াল লিভ, চোদ্দো দিনে একদিন আর্ড লিভ। আর বাজার! শীতে একদিন অন্তর। গ্রীষ্ম-বর্ষা রোজ। আর রোজ মাছ খেতে চাইলে এভরি-ডে। তখন তো নাকি সুরে বলা যাবে না, আমি আঁজ বাঁজার যেতে পারছি না। অ্যাই ওঠো, ওঠো। সরে শুচ্ছ কী! ছটার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। অফিসের। গাড়ি আসবে। আরতির সাড়াশব্দ না পেয়ে লেপের একটা কোণ ধরে জলছবির মতো ওঠাল। যাঃ তেরিকা। এটা তো সেই ম্যাগনাম বালিশটা। বাঃ, বেড়ে কায়দা! ছেলে ঠকানো কারবারে। শিশুকে স্তন্যপান করাতে করাতে একটু ঘুম এলেই মায়েরা এই ভাবে পাশে, পাশবালিশ শুইয়ে কেটে পড়ে। গেল কোথায় সাতসকালে? দাঁতের যন্ত্রণায় সুইসাইড করেনি তো! চটি গলিয়ে। লটরফট করতে করতে বিকাশ ঘরের বাইরে গেল।
দেখেছ এই শীতে শুধু একটা চাদর জড়িয়ে বাইরের সোফায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। সামনে খালি কাপ। চা করে একলা একলা খাওয়া হয়েছে। হায় প্রেম! এইভাবে ড্রাই হয়ে গেলে! বিকাশ সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে পা দুটো গাড় করে আরতি বদনার মতো। বসে আছে! ঘাড়ের কাছে গোল খোঁপা স্লো-বল চন্দ্রমল্লিকার মতো ভাঙচুর হয়ে আছে। কী গো! এখানে এইভাবে বসে! অ্যাই! চিৎকার করেই বিকাশের মনে হল সকালেই দু-ছেলেমেয়ের মার সঙ্গে এতটা জোর গলায় সোহাগ করা চলে না। কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশ করে বলল, অ্যাই।
