দোতলায় বিকাশের বাবা থাকেন। বিকাশের ছেলে আর মেয়ে তাঁর কাছেই শোয়। মৃতদার বৃদ্ধ একটু সঙ্গ পান। সারারাত ঘুমোতে পারেন না। যতক্ষণ নাতি, নাতনি জেগে থাকে সমানে বকর বকর করেন। যেন সমবয়সি তিন বন্ধু। বিকাশ জানে বৃদ্ধ জেগেই আছেন। মৃদু আলো দরজার তলা দিয়ে একটু আভার মতো লাল মেঝের ওপর ঠিকরে এসেছে। দরজা ভেজানেনা। ভেতর। থেকে ছিটিকানি টানা নেই। বারে বারে বাথরুমে যেতে হয়! শীতকালে একটু বেশিই। বিকাশ দরজা খুলতেই মশারির ভেতর থেকে আপাদমস্তক লেপ মুড়ি একটি বসা মূর্তি প্রশ্ন করলেন, কী চাই? সঙ্গে সঙ্গে বললেন, সব ঠিক আছে। ভেবেছেন ছেলে-মেয়ের খবর নিতে এসেছে। বিকাশ মশারির কাছাকাছি আসতেই লেপের ওপর দিকে একটি দাঁড়ি-গোঁফওয়ালা মুখ বেরোল। সুদূর অতীত থেকে বৃদ্ধ নিজেকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনন্দে মাথার ওপর লেপ টেনে চারিদিকে বেশ একটা গরম অন্ধকার তৈরি করে অনিদ্রার রুগি সারারাত অতীতের মানুষদের কাছে টেনে আনেন। সেই কলেজের দিন। কেমিস্ট্রির প্রফেসার। ফিজিক্সের প্রফেসার দে। হাওড়ার ভাসমান সেতু। ইডেন গার্ডেনের গোরা ব্যান্ড। শিবদাস ভাদুড়ির ফুটবল। আমার দিন তো চলে যায় মা, চলে যায় মা।
কথা না বাড়িয়ে বিকাশ কাজের কথাটা পেড়ে ফেলল—আপনার কার্বোলিক অ্যাসিডের শিশিটা একবার দেবেন?
দাঁত কনকন করে? তোমার?
আজ্ঞে না, আপনার বউমার।
আরতির হাঁটুর ওপর আয়না, পাশে একটা বড় দইয়ের ভাঁড়। অ্যাসিডে তুলো ভিজিয়ে তুলো জড়ানো কাঠিটা বিকাশ সাবধানে আরতির হাতে দিয়ে বলল, কুমিরের মতো একখানি হাঁ করে যে দাঁতের গোড়ায় যন্ত্রণা হচ্ছে, সেই গোড়ায় টুকটুক করে দুবার ঠেকিয়ে দাও। সাবধান, জিভে বা অন্য কোথাও যেন না লাগে, পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তারপর ওই ভাঁড়ে বারে বারে থুতু ফেলো।
প্রথমে আরতি বেশ বড় করে হাঁ করল। দেখার মতো হাঁ, অনেকটা তাড়কা রাক্ষসীর মতো। হাতে ধরা তুলো জড়ানো কাঠিটা মুখের সামনে নিয়েও এল। বিকাশ ফিলম ডিরেক্টারের মতো নির্দেশ দিল, ঠিক হ্যায় ঠিক হ্যায়, লাগাও লাগাও। হাঁ বন্ধ হয়ে গেল। আমার ভয় করছে।
—ভয়ের কী আছে? বাবা দিনে বার সাতেক করে দেন! যে রোগের যে দাওয়াই। পুড়িয়ে না দিলে কমবে না।
—না বাবা দরকার নেই, তুমি অন্য কিছু দাও। —অন্য কিছু দাও! বিকাশ ভেংচি কাটল। অন্য কিছু কী দেব! যেমন কুকুর তেমন মুগুর! তুমি হাঁ করো আমি বরং একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল কায়দায় লাগিয়ে দি।
—তা কখনও হয় নাকি। বত্রিশটা দাঁতের কোন দাঁতটায় হচ্ছে তুমি বুঝবে কী করে? নিজের চুলকানি অপরকে দিয়ে চুলকানো। ঠিক হয়? হচ্ছে ওপর পাটির কশের দাঁতে।
—তাহলে এক কাজ করি, ডিশে খানিকটা গ্লিসারিন ঢেলে আনি। মধুর মতো আগে খানিকটা চেটে নাও। জিভে একটা কোটিং পড়ে যাবে। অ্যাসিড লাগলেও পুড়বে না।
—কী যে তোমার অদ্ভুত পরামর্শ! মরছি আমি দাঁতের জ্বালায়, তার ওপর গ্লিসারিন চেটে পেট খারাপ হয়ে মরি আর কী!
—তোমার মতো ভীতু মেয়েমানুষের সংসার করা উচিত হয়নি বুঝলে। ভালো ভালো পুষ্টিকর ওষুধে গ্লিসারিন থাকে জানো। বিয়ারে এই গ্লিসারিন থাকে। বোতল খেয়ে সব ইয়া হুঁড়ি। বাগাচ্ছে।
—কী দরকার বাবা অত অশান্তিতে। তোমার একটা বড়ি দাও না। কোনওরকমে রাতটা কাটাই। তারপর দেখা যাবে কাল সকালে।
বড়ি থাকলে তো দেব। সবসময় কি স্টকে থাকে নাকি? এ কি আলু-পেঁয়াজ চাল-ডাল! অ্যাসিডই এ রোগের একমাত্র দাওয়াই। না পোড়ালে তোমার ঘুমের বারোটা আমারও ঘুমের বারোটা। আরতি আবার হাঁ করে লেপটা মাথা থেকে ঘাড়ের ওপর নেমে এল। একটা হাতও বেরোল। হাতটা তুলে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের টেবিলের দিকে প্রসারিত করে বলল, সোজা চলে যাও, ড্রয়ারটা খোলো, একটা সাদা চাবি পাবে। বিকাশ নির্দেশ পালনের জন্যে এগিয়ে গেল। প্রথমে বাঁ দিকের ড্রয়ারটা খুলল। খুলতেই একগাদা গোল করা ফুলো শিরিষ কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
উঁহু, উঁহু, ওটা নয়, ও ড্রয়ারটা নয়, ডান দিকেরটা খোলো।
বিকাশ নীচু হয়ে শিরিষ কাগজগুলো আবার গোল করে যথাস্থানে ঢোকাল। মাঝে মাঝে সারারাত বৃদ্ধ শিরিষ কাগজ দিয়ে দরজা ঘষেন। চার বছর ধরে চলেছে। ঘুমোতে যখন পারি না তখন ব্যর্থ চেষ্টা নিয়ে বিছানায় না পড়ে থেকে সংসারের খরচ বাঁচাই। চার বছরেও কাঠের গ্রেন তেমন মসৃণ হয়নি। রং লাগবে কি? লাগালেই হল? রং তো এক সেকেন্ডের ব্যাপার। ঘষাটাই আসল। আজ্ঞে কয়েক টিন রং সব শুকিয়ে যাবে কোথায়? সল্টভেন্ট দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
ডান দিনের ড্রয়ারে ছুরি, কাঁচি, গজাল, পেরেক, বাটালি, প্লায়ার।
—পেয়েছিস না যাব? আরে সামনেই তো আছে, একেবারে ওপরে, না পেলে বল।
এই ড্রয়ারেই আছে যখন পাব নিশ্চয়ই। আশাবাদী বিকাশ হতাশ না হয়ে হাতের আঙুল বাঁচিয়ে চাবি খুঁজতে লাগল। বাবার রাখা তো, সহজে কি পাব?
—পেলি না? কী আশ্চর্য! যে জায়গায় আছে অন্ধও খুঁজে পাবে। চোখ বুজিয়ে হাত দে তো। বিকাশ গুনগুন করে গান গাওয়ার সুরে বললে, পাচ্ছি না তো, পাচ্ছি না, গেল কোথায়, কোথায় গেল?
বিকাশের বাবা নেমে এলেন, সর দেখি। হাতড়ালেন কিছুক্ষণ। আশ্চর্য! গেল কোথায়? এদের জন্যে আর কিছু রাখা যায় না, গেছে। দূর করে কোথায় ফেলে দিয়েছে। এই গুচোচ্ছি, এই সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। বিকাশের ছেলে আর মেয়ের উদ্দেশ্যে চোখা, চোখা কিছু বিশেষণ প্রয়োগ করতে করতে বৃদ্ধের হঠাৎ কী খেয়াল হল, দাঁড়া দেখি। বিছানায় চলে গেলেন। মাথার বালিশ উলটে বললেন, হিয়ার ইউ আর, আই অ্যাম সরি। মশারির ভেতর থেকে চাবিটা বের করতে করতে নাতিকে আদর হল—হুনোটা। একটু আগের গালাগালিটা আদর দিয়ে পাল্লা সমান করলেন।
