—সে আবার কী?
—সে বোঝার ক্ষমতা থাকলে রোজ রাত্তিরে পাশে শুয়ে শুয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে বাঘিনীর হাড় চিবোবার মতো কটাস কটাস করে আস্ত আস্ত সুপুরি চিবিয়ে নিজের বারোটা বাজাতে না। স্লেভ অব হ্যাবিটস। তোমার জন্য আমার এতটুকু করুণা নেই। তোমার বারো মাসে তেরো পার্বণ। আইবুড়ো বেলায় দাঁত মাজতে? আরতি কোনও উত্তর দিল না। দাঁত চেপে পড়ে রইল। বিকাশ মশারির একটা পাশ তুলে তেড়ে কুঁড়ে নেমে পড়ল। ভেবেছিল মেঝেতে পা দিয়েই অভ্যস্ত জায়গায় চটিজোড়া পেয়ে যাবে। পায়ের পাতা ঠান্ডা মেঝেতে ছ্যাঁক করে উঠল। কী হল? মাথা নীচু করে দেখল একপাটি জুতো উলটে আছে আর একপাটি চলে গেছে খাটের তলায়। বাঃবাঃ! লাথি মেরে জুতোটাকে খাটের তলায় পাঠিয়ে দিয়েছ? কোনও একটা সেনস অফ ডিসেনসি নেই? মরো শালা এখন হামাগুড়ি দিয়ে। দাঁতের যন্ত্রণা? বিকাশবিকৃত গলা করল, দাঁতের যন্ত্রণা তো সাত খুন মাপ।
খাটের তলাটা যেন আরও ঠান্ডা। পাশ থেকে আলো গড়িয়ে এসে যেটুকু দেখা যায়। এটা আবার কী? ও উলের গোলা? সোয়েটার হচ্ছে, না গুষ্টির পিণ্ডি হচ্ছে? জুতো উদ্ধার করে বিকাশ ফিরে এল। চটি পায়ে দিয়ে ফটাস ফটাস করে খানিক ঘরময় ঘুরল। তোমার আর কী? কাল সকালে ছ’টার মধ্যে বেরোতে হবে, কে এক শালা আসছে এয়ারপোর্টে। এদিকে সারারাত ঘুম নেই।
—তুমি ঘুমোও না! আমার জন্যে তোমায় জাগতে হবে না। আমার জন্যে যম জাগবে।
—তুমি যমের অরুচি। চোদ্দো বছর দেখছি তো? এইটুকুতেই কাতর। মনে আছে সেবার? ভীষণ ব্যাপার, ভীষণ ব্যাপার, চালাও স্পেশালিস্ট। বত্রিশ টাকা চোট? কী ব্যাপার! না একটু কোলাইটিস মতো হয়েছে। দাও জোলাপ, অল ক্লিয়ার। তোমাকে জানি না, আদরের ননী!
—তুমি শুয়ে পড়োনা, আমি মরছি মরতে দাও।
–দাঁতের ব্যথায় কেউ মরে না। অন্যকে মারে। অত চিৎকার করার কী আছে! মনে আছে আমার। একবার কার্বাঙ্কাল হয়েছিল?
আরতি চুপ করে রইল।
—তার মধ্যেই তোমার সিনেমা চলছে, যাত্রা চলছে, বোনের বাড়ি চলছে। ছ-ছটা মুখ! যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। মুখে টুঁ টু শব্দটি নেই। মনে মনে বলছি, কা তব কান্তা! পিসিমা এসে ড্রেস করে দিয়ে যাচ্ছেন। বিবেকানন্দ টেকনিক চালাচ্ছি। ব্যথার জায়গা থেকে মনটা উইথড্র করার চেষ্টা করছি।
আরতি চুপ করে থাকতে পারল না।না, তোমার জন্যে তো আমি কিছুই করি না, সব করেন তোমার পিসিমা।
—যাক, তোমার সঙ্গে আমি মাঝরাতে তর্ক করতে চাই না। তুমি করেছ, কি করোনি সে বিচার ওপরে গিয়ে হবে। এখন তোমার জন্যে আমাকে কিছু করতেই হয়। বিয়ে যখন করেছি।
বিকাশ দরজা খুলে বাইরে বেরুল। দরজার ডান পাশে সুইচ বোর্ড। আগের মতো চোখ চলে না। ঠান্ডা, থইথই অন্ধকারে কোমর ভাঙা জলে যেভাবে হাঁটে সেইভাবে বিকাশ এগিয়ে আলোর। সুইচ টিপল। খিরকি খিড়িংশব্দ করে বসার জায়গায় মাথার ওপর ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ্বলে উঠল। মাঝরাতে আলোর যেন চোখ ফোটে। চারিদিক ঝলসে গেল। এখন! এখন আমাকে কী করতে হবে? দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা চেপে ধরে বসার জায়গায় সোফাটোফার দিকে বিকাশ এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন অশরীরী কোনও ডেন্টিস্ট সেখানে বসে আছে। বিকাশের গায়ে শ্যান্ডো গেঞ্জি। গরম বিছানা লেপের তলা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে বেশশীত করছে। এই গরম ঠান্ডায় হঠাৎ জ্বর হয়ে গেলে বেশ কিছু টাকার ধাক্কা। সোফার ওপর দলা পাকানো আরতির চাদর। শোবার আগে গা থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। চাদরটা তুলে বার দুয়েক ঝেড়ে বিকাশ চাদরটা গায়ে ছড়াল। উ, হিঙের গন্ধ বেরোচ্ছে। ভদ্রমহিলার কী যে অভ্যেস! পরদা, চাদর, বিছানার উদবৃত্ত বেড কভারের অংশ, বালিশের ঝালর, শাড়ির পশ্চাদ্দেশে সুযোগ পেলেই খুচুং করে হাত মুছে দেবে। কড়াইশুটি হিং দিয়ে আলুর দম খাওয়া হয়েছে রাতে। হাত ধোবার পর স্মৃতিটুকু রেখে গেছে চাদরে।
না, একটু ভাবা দরকার। বারণ করা সত্বেও চামচে চামচে চিনি আর কটমটর সুপুরি খাওয়া! ঠিক সাজাই হয়েছে! মরুক যন্ত্রণায়! কিন্তু সারারাত ঘুমোতে দেবে না যে? অনবরত উঁ আঁ করবে। যখন হাঁচি হয় তখন ননস্টপ পঞ্চাশটার কমে থামে না। ডেঙ্গুজ্বর হলে চিৎকারে লোক জড়ো করে ফেলে। এর উপর একাদশী অমাবস্যায় পায়ের গোছে বাতে-কামড় আছে। তুমি আর কী বুঝবে বলো। গদামগুম থেকে থেকে খাটে পা ছুড়বে—ওপর একটু দাঁড়াবে গো? দাঁড়ালে পায়ের কিছু থাকবে? পাঁকাটির মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। গদামগুম কী হচ্ছে কী? ওঃ চিবোচ্ছে। অগত্যা। দাও একটু হাত দিয়ে টিপে দাও! চোদ্দো বছরের পুরোনো বউ মাতৃসমা? ভুজঙ্গ ডাক্তারের কম্পাউন্ডারকে ধরে ইনঞ্জাকশান দেওয়াটা শিখতেই হবে দেখছি। তারপর। গোটকতক মরফিয়ার অ্যাম্পুল জোগাড় করে রাখতে হবে। বিয়ের ছ’মাস বড়জোড় এক বছর পর্যন্ত বউয়ের ভিরকুটি সহ্য করা যয়, মন্দ লাগে না। তারপর যতক্ষণ ঘুমোয় ততক্ষণই শান্তি। দাঁতের এখন কী করা যায়? মারো এক ঘুষি। ঝরঝর করে যে-ক’টা ঝরে যায়! চুল ঝরে টাক হয়ে গেছিল, পাতা ঝরে গাছ কঙ্কাল হয়ে গেল, বয়েস ঝরে বুড়ো মেরে গেল, মেদ ঝরে মেরুদাঁড়া। বেরিয়ে গেল, গোটা কতক দাঁত ঝরে গেলে কী হয়? ঝরলে যে গেরস্তর কল্যাণ হয়। দাঁড়াও। দিচ্ছি তোমার দাওয়াই। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব কিছু না জানলে সংসার করা উচিত নয়। শুধু ডাক্তারে রক্ষে নেই, থেরাপি, সার্জারি, গাইনি, ই এন টি, দারা সিং ক্যাসিয়াস ক্লে, পি সি সরকার, রকফেলার সব গলিয়ে অ্যালয় করে স্বামী ঢালাই করলে তবে যদি এ যুগে বাঁচা। যায়।
